সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও শ্রমিকপ্রতি কৃষি উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকার বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদন বাড়লেই যে কৃষকের শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়বে, এমন নয়। একজন কৃষিশ্রমিক এক দিনে কতটুকু জমিতে কাজ করছেন, কত পরিমাণ ফসল উৎপাদনে অবদান রাখছেন এবং তাঁর শ্রমের বিপরীতে কতটুকু অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে, এসব বিষয়ের ওপর শ্রমিক প্রতি উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে। বাংলাদেশে ধান, সবজি, মাছ ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু জমির স্বল্পতা, কৃষিজমির খণ্ডবিখণ্ডতা, শ্রমনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের কারণে এই অগ্রগতিকে শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে পুরোপুরি রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না।
পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ:
প্রথমত, বাংলাদেশের কৃষিজমি তুলনামূলকভাবে ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত। একই জমিতে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ফসল উৎপাদিত হলেও জমি প্রস্তুত, রোপণ, আগাছা দমন, সেচ ও ফসল সংগ্রহে প্রচুর শ্রম ব্যয় হয়। অন্যদিকে, বড় আকারের জমিতে যন্ত্রের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সহজ ও সাশ্রয়ী।
দ্বিতীয়ত, কৃষিযান্ত্রিকীকরণে অগ্রগতি হলেও সব কৃষক সমানভাবে এর সুবিধা পাচ্ছেন না। জমির আকার, আর্থিক সামর্থ্য, যন্ত্রের প্রাপ্যতা এবং দক্ষ চালকের অভাব অনেক এলাকায় আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে একই কাজ করতে বাংলাদেশের কৃষককে অনেক ক্ষেত্রে বেশি শ্রম ও সময় ব্যয় করতে হয়।
তৃতীয়ত, কৃষিতে দক্ষতা ও জ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। মাটির পুষ্টি পরীক্ষা ছাড়া সার প্রয়োগ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস উপেক্ষা, রোগবালাই শনাক্তে বিলম্ব এবং সেচের অপরিকল্পিত ব্যবহার উৎপাদন খরচ বাড়ায়। কৃষকের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না হলে উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ে না।
চতুর্থত, ফসল সংগ্রহের পর সংরক্ষণ, পরিবহন, বাছাই ও বাজারজাতকরণে অপচয় হয়। ফলে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ নষ্ট হয় বা কম দামে বিক্রি করতে হয়। এখানে মনে রাখা জরুরি, জমিতে উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ এবং শ্রমিকপ্রতি বাজারজাতযোগ্য উৎপাদনের অর্থনৈতিক মূল্য এক বিষয় নয়।
পঞ্চমত, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশের সঙ্গে তুলনার ক্ষেত্রে ফসলের ধরন, জমির আকার, কৃষিশ্রমিকের কর্মঘণ্টা, যন্ত্রের ব্যবহার এবং উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বিবেচনা করা জরুরি। শুধু মোট উৎপাদন দিয়ে শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতার প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না।
উত্তরণের বাস্তবসম্মত কৌশল:
বাংলাদেশের কৃষিতে শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রথমেই কৃষিযান্ত্রিকীকরণকে কৃষকের সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে এককভাবে দামি যন্ত্র কেনা কঠিন। তাই সমবায়ভিত্তিক যন্ত্র ব্যবহার, ভাড়ায় কৃষিযন্ত্র সরবরাহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে যন্ত্রসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার, কৃষি ড্রোন, সয়েল সেন্সর ও আধুনিক সেচযন্ত্রের কার্যকর ব্যবহার শ্রম ও সময় সাশ্রয় করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) এবং ডিজিটাল পরামর্শসেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। মাটির পুষ্টি বিশ্লেষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগবালাই শনাক্তকরণ ও সুষম সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় শ্রম, উপকরণ ও উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। তবে প্রযুক্তির সুপারিশ স্থানীয় মাটি, ফসল ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে যাচাই করতে হবে।
তৃতীয়ত, কৃষিশ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক কৃষিপদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি ফসলের সংরক্ষণাগার, শীতল পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ উন্নত করতে হবে, যাতে উৎপাদিত ফসলের অধিকাংশ বাজারজাত করা যায় এবং কৃষকের আয় বাড়ে।
বাংলাদেশের কৃষির মূল চ্যালেঞ্জ শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়; বরং সীমিত জমি, শ্রম ও সম্পদ ব্যবহার করে অধিক মূল্যবান, নিরাপদ ও বাজারযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদন করা। শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য কৃষিযান্ত্রিকীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, গবেষণা এবং বাজারব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। সরকার, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও কৃষকের সম্মিলিত উদ্যোগে এই পরিবর্তন সম্ভব। কৃষিতে শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করে শ্রমের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলেই বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের ন্যায্য আয় এবং প্রতিযোগিতামূলক কৃষি অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাবে।
লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ