Wednesday, October 14, 2026
উৎপাদন খরচ বনাম বাজারদরের অসম সমীকরণ: প্রান্তিক খামারি ও ফিড শিল্পের সংকট
14, Oct 2026 | গবেষণা ও ফিচার

এন. এন.  এম.  শাহরিয়ার ইসলাম নয়ন:পোল্ট্রি, মৎস্য ও ডেইরি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চারপাশের চাপা অসন্তোষ আমি একজন ফিড শিল্প পেশাজীবী হিসেবে খুব কাছ থেকে অনুভব করছি। বারবার প্রশ্ন ওঠে কেন প্রতিনিয়ত বাড়ছে ফিডের দাম? অথচ এর বিপরীতে মাছ, মুরগি, ডিম বা দুধের দাম তো সেই অনুপাতে বাড়েনি। গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভ বা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তবে এই পুরো সমীকরণের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বাস্তব চিত্রটা একটু গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।

প্রথমত, ফিডের উৎপাদন মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কিছু বৈশ্বিক ও কাঠামোগত বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। ফিড তৈরির মূল উপাদান যেমন ভূট্টা, সয়াবিন মিল এবং প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড ও ভিটামিন আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে লজিস্টিক খরচ, ডলারের বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতার কারণে কাঁচামালের দাম বেড়েই চলেছে। ফলে বাধ্যতামূলকভাবেই ফিডের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত খামারিদের ঘাড়ে গিয়ে চাপে।

দ্বিতীয়ত, খামারিরা যখন চড়া দামে ফিড কিনে খামারে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন, বাজারে বিক্রির সময় তারা কিন্তু সেই ন্যায্য মূল্য (মাছ-গোশত-ডিম বা মুরগি) বা অনুপাত পাচ্ছেন না। ফিডের দাম যেখানে লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী, উৎপাদিত পণ্যের দাম তার সিকিভাগও বাড়ে না। এর ফলে লাভের মুখ তো দূরের কথা, পুঁজি হারিয়ে আজ প্রান্তিক খামারিরা নিঃস্ব হওয়ার পথে।

তাহলে অতিরিক্ত দামের এই টাকাটা আসলে কোথায় যাচ্ছে? সাধারণ মানুষ ও সংবাদমাধ্যমে যে ক্ষোভ দেখা যায়, তার মূল তীরটা উৎপাদনকারীদের দিকে থাকলেও বাস্তবতা হলো, মূল মুনাফার বড় অংশটি চলে যাচ্ছে একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের পকেটে। খামার থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তার থলেতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত পণ্যের এই দীর্ঘ যাত্রায় হাতবদলের দৌরাত্ম্য এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়কেই পকেট কাটা পড়ছে। অথচ দিনশেষে দুর্নামটা পোহাতে হয় ফিড মিল বা খামারিদের।

একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত রাখতে হলে উৎপাদনমুখী খাতগুলোকে সুরক্ষা দিতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশের আনাচে-কানাচে যেভাবে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও সিন্ডিকেট রাজত্ব চলছে, তা চলতে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। খামারি এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য যদি দ্রুত একটি সুষ্ঠু, নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না যায়, তবে তা আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে।

মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের মতো জরুরি আমিষের জোগানদাতা এই খাতগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল অভিযোগ না করে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

  1.  সরবরাহ ব্যবস্থা সংস্কার: মাঠপর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সাপ্লাই চেইন বা ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলকে সরাসরি ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের অযাচিত হস্তক্ষেপ কমানো যায়।
  2.  সহযোগিতা ও নীতি সহায়তা: কাঁচামাল আমদানিতে কর বা শুল্কের বোঝা কমানো এবং প্রকৃত খামারিদের জন্য সহজ শর্তে আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা দরকার
  3.  নিরাপদ বাণিজ্যিক পরিবেশ: চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট মুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ ছাড়া কখনোই উদ্যোক্তারা সামনে এগিয়ে আসতে পারবেন না

কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। এই খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে উৎপাদনকারী ও খামারিদের সুরক্ষা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে সঠিক নীতি নির্ধারণ ও তার কঠোর প্রয়োগই পারে আমাদের এই সংকট থেকে রক্ষা করতে।
লেখক পরিচিতি:সিনিয়র ম্যানেজার সেলস এন্ড মার্কেটিং - একুয়া, খুলনা জোন
আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেড

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft