ড. মো. মাহমুদুল হাসান খান
খাদ্য নিরাপত্তা এখন কেবল কৃষির বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন
বিশ্বব্যবস্থা বর্তমানে এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র–চীন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা পৃথিবীর অর্থনীতি ও খাদ্য ব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অতীতে যুদ্ধের প্রভাব মূলত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমান বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে একটি অঞ্চলের সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো বিশ্বে। খাদ্য, জ্বালানি, সার, বীজ ও কৃষি উপকরণের বাজার এখন ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের জন্য এ বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। স্বাধীনতার পর খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৪ কোটি টনের কাছাকাছি চাল উৎপাদিত হচ্ছে। সবজি, মাছ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা দেখিয়ে দিয়েছে—শুধু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করলেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। একটি দেশের প্রকৃত খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন উৎপাদন, সরবরাহ, মূল্য স্থিতিশীলতা, পুষ্টি, কৃষকের লাভজনকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের শিক্ষা
বিশ্ব খাদ্য বাজারে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের আগে দেশ দুটি বিশ্বের গম রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করত। ইউক্রেন ছিল ভুট্টা, বার্লি ও সূর্যমুখী তেলের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে কৃষি উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চ মাসে খাদ্য মূল্য সূচক (Food Price Index) ১৫৯.৩ পয়েন্টে পৌঁছায়, যা ১৯৯০ সালে সূচক চালুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়। একই সময়ে গম, উদ্ভিজ্জ তেল ও খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। এই সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও অনুভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গম, তেল ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষি উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
এ ঘটনা প্রমাণ করেছে, বৈশ্বিক খাদ্য বাজারে অস্থিরতা মোকাবিলায় প্রতিটি দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ও কৌশলগত প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
বাংলাদেশের কৃষির সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের কৃষি খাত গত পাঁচ দশকে অসাধারণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি, বর্তমানে তা ১৭ কোটির বেশি। সীমিত কৃষিজমি নিয়েও বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উন্নত জাত, সেচ সম্প্রসারণ, সার ব্যবস্থাপনা, কৃষকের পরিশ্রম এবং কৃষি গবেষণার কারণে চাল উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৩.৮–৪ কোটি টন চাল উৎপাদন করে। তবে খাদ্য নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞায় কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমদানিনির্ভরতা। বিশেষ করে— ভোজ্যতেল; গম; ডাল; পশুখাদ্য; রাসায়নিক সার; কৃষি যন্ত্রপাতি এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে কোনো সংকট সৃষ্টি হলে এসব পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
ভোজ্যতেল নিরাপত্তা: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো ভোজ্যতেল খাত। দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টনের বেশি ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এর বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি দেশের বাজারে প্রভাব ফেলে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময় সূর্যমুখী তেল সরবরাহে সংকট তৈরি হলে বিকল্প তেলের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। অথচ বাংলাদেশে তেলবীজ উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সরিষা, সূর্যমুখী, তিল, চিনাবাদাম ও অন্যান্য তেলবীজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের পতিত জমি; উপকূলীয় এলাকা; চরাঞ্চল; আমন ধান কাটার পরের জমি তেলবীজ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি উন্নত জাত, মানসম্পন্ন বীজ, আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি এবং বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে দেশে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
কৃষি উপকরণ নিরাপত্তা: নতুন উদ্বেগ
আধুনিক কৃষি এখন শুধু জমি ও শ্রমের ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন সার, জ্বালানি, বীজ, কীটনাশক ও কৃষিযন্ত্র। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত কৃষি উপকরণের বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। রাশিয়া ও বেলারুশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান সার রপ্তানিকারক দেশ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সরবরাহ সংকটের কারণে বৈশ্বিক সার বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সারের সুষম ব্যবহার; জৈব সার ব্যবস্থার উন্নয়ন; স্থানীয়ভাবে কৃষি উপকরণ উৎপাদন; আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার।
জলবায়ু পরিবর্তন: বাংলাদেশের কৃষির দ্বিতীয় বড় যুদ্ধ
ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষির জন্য বড় হুমকি। বিশ্বের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি; জলাবদ্ধতা; ঘূর্ণিঝড়; অনিয়মিত বৃষ্টিপাত; তাপমাত্রা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় আমন ধান কাটতে দেরি হওয়ায় রবি মৌসুমের ফসল চাষের সময় কমে যায়। ফলে সরিষা, গম, ডাল ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা।ভবিষ্যতের কৃষিতে গুরুত্ব দিতে হবে জলাবদ্ধতা সহনশীল জাত; লবণাক্ততা সহনশীল জাত; স্বল্পমেয়াদি ফসল; স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি; পানি ব্যবস্থাপনা।
কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তিই ভবিষ্যতের পথ
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগে কৃষি গবেষণার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। আগামী দিনের কৃষিকে হতে হবে উৎপাদনশীল, লাভজনক এবং পরিবেশবান্ধব। গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হওয়া উচিত— ১. জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন বন্যা, জলাবদ্ধতা, খরা ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় নতুন জাত উদ্ভাবন করতে হবে। ২. জিনোম প্রযুক্তির ব্যবহার CRISPR ও আধুনিক জীবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের ফসল উন্নয়ন সম্ভব। ৩. তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি দেশীয় ভোজ্যতেল নিরাপত্তার জন্য সরিষা, সূর্যমুখী ও তিল উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ৪. কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো প্রযুক্তি, যান্ত্রিকীকরণ ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক করতে হবে।
খাদ্য কূটনীতি ও কৌশলগত মজুত: ভবিষ্যতের প্রয়োজন
বর্তমান বিশ্বে খাদ্য একটি কৌশলগত সম্পদ। অনেক দেশ খাদ্য সরবরাহকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন খাদ্য আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ; কৌশলগত খাদ্য মজুত বৃদ্ধি; আঞ্চলিক কৃষি সহযোগিতা বৃদ্ধি; কৃষি বাণিজ্য সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শক্তি
ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা কোনো স্বাভাবিক অর্জন নয়, এটি একটি চলমান কৌশলগত প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে যে সাফল্য অর্জন করেছে, এখন সেই সাফল্যকে তেলবীজ, ডাল, গম, পুষ্টিকর খাদ্য এবং কৃষি উপকরণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করতে হবে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে শুধু সামরিক শক্তি নয়, খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতাই একটি দেশের প্রকৃত শক্তি নির্ধারণ করবে। তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত “উৎপাদনশীল, জলবায়ু সহনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও আমদানিনির্ভরতা কমানো একটি নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা।” কারণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই নিশ্চিত হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব।
লেখক:বিজ্ঞানী ও গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট