Thursday, October 29, 2026
যেখানে পাহাড় নেমে আসে সমতলে: তেঁতুলিয়া, চার দেশের মোহনা ও কাঞ্চনজঙ্ঘার অপেক্ষায় এক অমর ভ্রমণ
28, Oct 2026 | গবেষণা ও ফিচার

রোটারিয়ান ড. মো. হেমায়েতুল ইসলাম আরিফ:কিছু জায়গা আছে, যেখানে পৌঁছালে মনে হয় সময় থেমে গেছে। কিছু দৃশ্য আছে, যা চোখে নয় হৃদয়ে গেঁথে যায়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের শেষ প্রান্তে অবস্থিত তেঁতুলিয়া তেমনই এক জায়গা যেখানে পাহাড়, নদী আর সমতল এক হয়ে মিশে গেছে প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই ভূখণ্ড একসময় ছিল প্রাচীন পুণ্ড্র, বরেন্দ্র ও কামরূপ রাজ্যের সীমান্তবর্তী জনপদ; পাল, সেন ও মোগল আমলে এখান দিয়ে গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যপথ, আর ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চল হয়ে ওঠে চা ও পাটের ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র। গত ১৯ থেকে ২২ জুলাই, রাজশাহী থেকে পঞ্চগড় হয়ে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আমাদের সেই যাত্রা আজও মনকে আন্দোলিত করে কারণ এই ভ্রমণ কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ নয়, ছিল ইতিহাসের এক নীরব পাঠও।

যাত্রার সূচনা
আমরা তিনটি পরিবার আমার সহধর্মিণী মাহবুবা হাসনিন, বড় ছেলে মুহাম্মাদ আহনাফ হাসান, ছোট ছেলে মুহাম্মদ আরশাদ হাসান; বন্ধু আব্দুল হান্নান টুটুল ও তার বড় মেয়ে হুমায়রা, ছেলে তাসরিফ অর্ক ও তার স্ত্রী নাজনিন আক্তার; এবং মো. বাবুল হোসেন, তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুন ও মেয়ে তাসনিয়া। ভ্রমণের জন্য এ যেন এক পারফেক্ট দল যেখানে শিশুর কৌতূহল, যুবকের উদ্যম আর প্রবীণের অভিজ্ঞতা মিলে এক অদ্ভুত সমন্বয় তৈরি হয়েছিল।

১৯ তারিখ রাত ৯টায় রাজশাহী থেকে বাংলাবান্ধা ট্রেনে চড়ে সকালে পঞ্চগড় পৌঁছালাম। পঞ্চগড়ের সুজন সভাপতি এ কে এম ফজলে নুর বাচ্চু ভাই আগেই মাইক্রোবাস ঠিক করে রেখেছিলেন তার সেই আন্তরিক আতিথেয়তায় ভ্রমণের প্রথম দিনটিই শুরু হয় এক অন্যরকম অনুভূতিতে।

পঞ্চগড়ের ঐতিহ্য: রুহিয়া শাহী মসজিদ ও মহারাজা দিঘি
ফ্রেশ হয়ে প্রথমে গেলাম রুহিয়া মির্জাপুরের শাহী মসজিদে। প্রায় চারশো বছরের পুরনো এই মসজিদ মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন তিনটি গম্বুজ, চার কোণে সরু মিনার, আর দেয়ালে টেরাকোটার লতাপাতার নকশা যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা এক গল্প। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, সময়ের স্রোতে মানুষ বদলায়, কিন্তু এই পাথর আর ইটেরা কী নীরবে সব স্মৃতি বুকে ধরে রাখে।
নাস্তা সেরে গেলাম মহারাজার দিঘিতে। পঞ্চগড়ের ভিতরগড় এলাকায়, ভারত সীমান্তঘেঁষা অমরখানা ইউনিয়নে অবস্থিত এই দিঘি প্রায় ৫৪ একর জুড়ে বিস্তৃত। ভিতরগড় ছিল প্রাচীন একটি দুর্গনগরী, যা একসময় এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। জনশ্রুতি বলে, এই দিঘি ছিল পৃথু রাজার রাজধানী ভিতরগড়ের অংশ। কীচক নামের এক দুর্ধর্ষ জাতির আক্রমণে প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়লে পরিবারের অপমান এড়াতে পৃথু রাজা সপরিবারে এই দিঘিতেই আত্মহত্যা করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ভিতরগড়ের ধ্বংসাবশেষে পাওয়া পোড়ামাটির ফলক ও মুদ্রা সেন ও পাল রাজত্বের সাক্ষ্য বহন করে। জল তখন শান্ত, কিন্তু তার তলায় কত ইতিহাসের ভার!

তেঁতুলিয়ার পথে: চা বাগান ও চার দেশের মোহনা
এরপর সুজন সম্পাদক ও সাংবাদিক মো. আবুল বাসেতের ব্যবস্থাপনায় তেঁতুলিয়ার পুলিশ গেস্ট হাউজে উঠলাম। ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে গেলাম কাজী'র রিসোর্ট ও চা বাগানে। সবুজ চায়ের সারি, তার মাঝে হিমালয়ের ছোঁয়া শিলিগুড়ির চা বাগান দেখার পরও তেঁতুলিয়ার চা বাগান আমাকে মুগ্ধ করেছে। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলে চা চাষের সূচনা হলেও স্বাধীনতার পর তা প্রায় বিস্তৃত হয়নি; অথচ তেঁতুলিয়ার মাটি ও আবহাওয়া চা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানে অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, শুধু প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আর পৃষ্ঠপোষকতা।

বিকেলে গেলাম সেই জায়গায়, যেখানে প্রকৃতি নিজেই আঁকেন তার শ্রেষ্ঠ ছবি চার দেশের মোহনা, বাংলাবান্ধা। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের প্রবেশদ্বার একসঙ্গে যেখানে। ঐতিহাসিকভাবে এই এলাকা ছিল সিল্ক রুটের একটি শাখা যে পথে একসময় তিব্বত ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য চলত। সীমান্তে দুই দেশের পতাকা নামানোর দৃশ্য দেখে অনেকেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। আমি ভেবেছিলাম, মানুষের তৈরি সীমানা কীভাবে প্রকৃতির বিশালতাকে খণ্ডিত করে, অথচ এই মোহনায় দাঁড়িয়ে চার দেশের বাতাস একই সঙ্গে গায়ে লাগে।

রাতে তেঁতুলিয়ার তেঁতুলতলায় ডিনার আর দুধ চা সে এক অদ্ভুত স্বাদ। ভ্রমণের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক কাপ চায়েই ধুয়ে গেল। তেঁতুলিয়া ছোট্ট একটা জায়গা, খাবার হোটেলগুলিয় একটি যায়গায় মূল বাজারে। থানাও ছোট, কিন্তু গোছানো। এসব ছোট ছোট জিনিসই ভ্রমণকে মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য কেবল বিশালতায় নয়, সরলতায়ও থাকে।

রক মিউজিয়াম: এক ব্যক্তির একক প্রয়াস
ফেরার পথে দেখলাম পঞ্চগড়ের একমাত্র রক মিউজিয়াম-একজন ব্যক্তির একক উদ্যোগে গড়া। পাথর, খনিজ আর জীবাশ্মের সংগ্রহ দেখে সত্যিই ভ্রমণের পরিপূর্ণতা পেলাম। এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য অসাধারণ হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় এখানে পাওয়া যায় নানা ধরনের পাথর ও খনিজ। কিন্তু একই সঙ্গে মনে হলো, এমন উদ্যোগের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কতটা প্রয়োজন। ব্যক্তির একক চেষ্টায় যেখানে ইতিহাস ও বিজ্ঞান সংরক্ষিত হচ্ছে, সেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তো আরও বেশি।

কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অপেক্ষা: মহানন্দার পাড়ে
শেষ দিনের সকালটা ছিল সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আশায় গেস্ট হাউজের চা বাগান আর মহানন্দা নদীর পাড় ধরে হেঁটে গেলাম ডাকবাংলা পয়েন্টে। মহানন্দা নদী হিমালয়ের দার্জিলিং থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তারপর আবার ভারতে গিয়ে শেষে পদ্মায় মিশেছে। ঊনবিংশ শতকে এই নদী ছিল তিস্তা-মহানন্দা বাণিজ্যপথের অংশ, যার মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের পাট ও চা কলকাতা বন্দরে পৌঁছাত। নদীর পাড়ে পাথর আর বালু তোলার দৃশ্য একদিকে প্রকৃতির সম্পদ, অন্যদিকে মানুষের জীবিকা। সেখানে শত শত উৎসুক দর্শনার্থীর ভিড়। কেউ অপেক্ষা করছে মেঘ সরলেই হিমালয়ের চূড়া দেখা যাবে বলে। আমরাও অপেক্ষা করেছি, কিন্তু মেঘ তখনও জমে আছে। তবু সেই অপেক্ষার আনন্দ রোজার শেষে ঈদের চাঁদ দেখার মতো। হয়তো দেখা হয়নি, কিন্তু চেষ্টার স্মৃতি তো থেকেই গেল।

মহানন্দা ছাড়াও এই অঞ্চলের আরও দুটি নদীর কথা মনে পড়ে ডাহুক ও করতোয়া। ডাহুক নদী জলপাইগুড়ি থেকে এসে তেঁতুলিয়ার রওশনপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মাত্র ১০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে আবার ভারতে ফিরে যায়। আর করতোয়া, যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হিন্দু পুরাণের কাহিনি-শিব যখন পার্বতীকে বিয়ে করছিলেন, তখন তার হাত থেকে পড়া পানি থেকে এই নদীর জন্ম। এই নদীগুলো শুধু জল নয় ইতিহাস, সংস্কৃতি আর সীমান্তের গল্প বহন করে চলে।

উপসংহার
তিন রাত, চার দিনের এই ভ্রমণে আমরা যা পেয়েছি, তা কোনো পর্যটন স্পটের তালিকায় ধরা যায় না। পেয়েছি পাহাড়ের নীরবতা, নদীর কথা, সীমান্তের রঙ, ইতিহাসের ভার, আর তিন পরিবারের একসঙ্গে হাসতে পারার আনন্দ। তেঁতুলিয়া আমাকে বারবার ডাকে। ছোট্ট এই জায়গাটি যেন বলছে আবার এসো, মেঘ সরলেই কাঞ্চনজঙ্ঘা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।

লেখক: রোটারিয়ান ড. মো. হেমায়েতুল ইসলাম আরিফ, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ লাইভস্টক সোসাইটি (BLS)

Agrilife24 Logo

Agriculturist Md. Shafiul Azam, Editor & CEO
Dhaka Office: 141/4, Lake Circus, Kalabagan, Dhanmondi, Dhaka-1205.
Bogura Office: Hakim Son's House, Seujgari, Bogura-5800.
Email: info@agrilife24.com, editor@agrilife24.com, news@agrilife24.com
Contact: +880 2-48112812, Whatsapp: +880 1912-837-999

Social Share

© Agrilife24 . All Rights Reserved. Developed by Innovative Soft