সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশের কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণকর্মী এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কৃষির বহুমুখীকরণে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেই কৃষকের লাভ বাড়বে কিংবা ভোক্তার কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উৎপাদিত ফসলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সংগ্রহের পর থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হচ্ছে, মান হারাচ্ছে কিংবা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। এখানেই বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা উৎপাদন বাড়ানোর ওপর যতটা গুরুত্ব দিচ্ছি, উৎপাদিত পণ্যের সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কি ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে ? সংরক্ষণ, পরিবহন নাকি বাজারজাতকরণ, কোথায় মূল সমস্যা ? বাস্তবতা হলো, এই তিনটি ক্ষেত্র পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত উৎপাদন, বাজারের তথ্যের ঘাটতি, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা এবং কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। ফলে একদিকে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন, অন্যদিকে ভোক্তাকে অনেক সময় একই পণ্যের জন্য তুলনামূলক বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু কৃষকের লাভ কোথায়: প্রতিবছর বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষককে বীজ, সার, সেচ, শ্রম, কীটনাশক ও যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করতে হয়। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং উৎপাদন উপকরণের ব্যয় কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। এত কিছুর পর ফসল ঘরে তোলার সময় যদি উপযুক্ত দাম না মেলে, তাহলে উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। বিশেষ করে মৌসুমি সবজি, ফল ও দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সমস্যাটি প্রকট। কোনো এলাকায় একই সময়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য বাজারে এলে সরবরাহ বেড়ে দাম কমে যেতে পারে। অথচ অন্য সময়ে বা অন্য অঞ্চলে একই পণ্যের দাম অনেক বেশি থাকে। কৃষকের হাতে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় তিনি কম দামেও পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। কখনো পরিবহন ব্যয় ও শ্রমের খরচ বাদ দিলে বিক্রয়মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় খুব সামান্য থাকে। অন্যদিকে, উৎপাদকের কাছ থেকে কম দামে কেনা পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পরিবহন, বাছাই, সংরক্ষণ, আড়ত ও খুচরা বিক্রিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় যুক্ত হয়। এসব ব্যয়ের পাশাপাশি অদক্ষতা, অপচয় এবং বাজারের দুর্বল প্রতিযোগিতাও চূড়ান্ত মূল্য বাড়াতে পারে। ফলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। মাঝখানের সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর না হলে উৎপাদকের কম দাম এবং ভোক্তার বেশি দাম একই সঙ্গে দেখা দিতে পারে।
পোস্ট-হারভেস্ট লস: উৎপাদনের পর আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ: ফসল সংগ্রহের পর থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত যে পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়, পরিমাণে কমে যায় কিংবা ব্যবস্থাপনার ত্রুটিতে ব্যবহারযোগ্যতা হারায়, তাকে পোস্ট-হারভেস্ট লস বা ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি বলা হয়। এই ক্ষতি শুধু পচে যাওয়া পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভুলভাবে সংগ্রহ, আঘাত লাগা, অতিরিক্ত তাপ, আর্দ্রতা, অনুপযুক্ত প্যাকেজিং এবং দীর্ঘ সময় পরিবহনের কারণে পণ্যের গুণগত মান ও বাজারমূল্য কমে যাওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উচ্চ হারের কথা বলা হয়েছে। কিছু আলোচনায় ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির অনুমানও উল্লেখ করা হয়। তবে সব ফসল, অঞ্চল ও সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রে একই হার প্রযোজ্য নয়। নির্ভরযোগ্য ফসলভিত্তিক, অঞ্চলভিত্তিক ও পর্যায়ভিত্তিক তথ্য ছাড়া এই হারকে সমগ্র কৃষিব্যবস্থার জন্য নির্দিষ্ট সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে কোন পর্যায়ে কতটা ক্ষতি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি। একটি বিষয় স্পষ্ট, উৎপাদিত খাদ্যের একটি অংশ যদি সংগ্রহ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় নষ্ট হয়, তাহলে সেই খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, সার, শ্রম, জ্বালানি ও অর্থেরও অপচয় হয়। অর্থাৎ পোস্ট-হারভেস্ট লস শুধু কৃষকের আর্থিক ক্ষতি নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদের অপচয়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পণ্যের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত অবকাঠামো দরকার। ধান, গম বা অন্যান্য শস্যের জন্য শুষ্ক ও নিরাপদ গুদাম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আলু, ফল, সবজি ও অন্যান্য পচনশীল পণ্যের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। কিন্তু সব এলাকায়, সব পণ্যের জন্য এবং কৃষকের নাগালের মধ্যে এ ধরনের সুবিধা সমানভাবে রয়েছে, এমনটি বলা যায় না। শুধু কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোথায় কত উৎপাদন হয়, কোন মৌসুমে কী পরিমাণ পণ্য আসে, স্থানীয় চাহিদা কত এবং সংরক্ষণের পর পণ্য কোথায় বিক্রি হবে, এসব বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। বিদ্যুৎ, পরিচালন ব্যয়, দক্ষ জনবল এবং ক্ষুদ্র কৃষকের সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না হলে অনেক সংরক্ষণকেন্দ্র প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারবে না। একইভাবে পরিবহনব্যবস্থায় দুর্বলতা, সময়মতো যানবাহন না পাওয়া, রাস্তার অবস্থা, উপযুক্ত প্যাকেজিংয়ের অভাব এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণহীন পরিবহন পণ্যের ক্ষতি বাড়ায়। কৃষিপণ্য পরিবহনে দ্রুততা ও পরিচর্যা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফল ও সবজির ক্ষেত্রে পণ্য তোলার পর ছায়ায় রাখা, সঠিকভাবে বাছাই, উপযুক্ত ক্রেট ব্যবহার এবং দ্রুত বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
গ্রেডিং ও বাজারজাতকরণে আধুনিকায়ন জরুরি: কৃষিপণ্যের মান অনুযায়ী বাছাই বা গ্রেডিং বাজারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে। একই পণ্যের আকার, পরিপক্বতা, গুণগত মান ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে পৃথক শ্রেণি নির্ধারণ করা হলে ক্রেতা নিজের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বেছে নিতে পারবেন। এতে ভালো মানের পণ্য উপযুক্ত দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং তুলনামূলক কম মানের পণ্যও বিকল্প বাজার বা প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। কিন্তু গ্রেডিং, মান নির্ধারণ, প্যাকেজিং ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়। ফলে বাজারে মানভেদে দাম নির্ধারণ কঠিন হয়, পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষকের মানসম্মত উৎপাদনের প্রণোদনা কমে যায়। এ সমস্যা সমাধানে কৃষক পর্যায়ে সংগ্রহকেন্দ্র, বাছাই ও প্যাকেজিং সুবিধা, ডিজিটাল বাজারতথ্য এবং উৎপাদক সংগঠনের ভূমিকা বাড়াতে হবে। কৃষক কোন বাজারে কী দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, কোথায় চাহিদা রয়েছে এবং কোন পণ্য কতটা উৎপাদন করা যুক্তিযুক্ত, এসব তথ্য সহজে পেলে তিনি ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
উৎপাদন পরিকল্পনা ও আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়: কৃষিতে উৎপাদন পরিকল্পনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চাহিদা, উৎপাদন, সংরক্ষণক্ষমতা ও বাজারজাতকরণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে কোনো মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং অন্য সময়ে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। কৃষককে শুধু বেশি উৎপাদনের পরামর্শ দিলেই হবে না; কী উৎপাদন করবেন, কতটা উৎপাদন করবেন, কোথায় বিক্রি করবেন এবং কীভাবে সংরক্ষণ করবেন, এসব প্রশ্নেরও বাস্তবসম্মত উত্তর দিতে হবে। এ জন্য কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্য, সড়ক পরিবহন, স্থানীয় সরকার, শিল্প এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উৎপাদন ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সংরক্ষণ অবকাঠামো, পরিবহন, বাজার তদারকি কিংবা প্রক্রিয়াজাতকরণের সব দায়িত্ব এককভাবে তাদের পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৃষিপণ্য সরবরাহব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদনের পূর্বাভাস, বাজারের চাহিদা, সংরক্ষণক্ষমতা, পরিবহন পরিকল্পনা ও মূল্যতথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে। কৃষক সংগঠন, বেসরকারি উদ্যোক্তা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনকেও এই ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকের কাছে প্রযুক্তি, পরামর্শ ও নতুন চাষপদ্ধতি পৌঁছে দিতে কাজ করছে। তবে জনবলের সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত লজিস্টিক সুবিধার অভাব, মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘাটতি এবং কৃষকের সঙ্গে পরামর্শদাতার পারস্পরিক আস্থার সংকট কার্যক্রমের কার্যকারিতা কমাতে পারে। প্রযুক্তি হস্তান্তর শুধু ওপর থেকে নির্দেশনা দেওয়ার প্রক্রিয়া হওয়া উচিত নয়। কৃষকের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পরিবেশ, জমির বৈশিষ্ট্য ও আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ দিতে হবে। কৃষককে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার করতে হবে এবং নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা মাঠপর্যায়ে যাচাই করে তারপর সম্প্রসারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষিত ও তরুণ কৃষকদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। স্মার্টফোন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারদর ও আধুনিক সংরক্ষণপ্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল এজেন্ট হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। তাঁরা কৃষককে বাজারতথ্য, প্রযুক্তিগত পরামর্শ, সংগ্রহ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করতে পারবেন।
করণীয়: উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ: প্রথমত, প্রধান কৃষিপণ্যের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি নিয়ে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী কমিউনিটিভিত্তিক শীতল সংরক্ষণকেন্দ্র, শুষ্ক গুদাম, সংগ্রহকেন্দ্র ও প্যাকেজিং সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষক সংগঠন ও সমবায়ের মাধ্যমে যৌথভাবে পণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। চতুর্থত, ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে উৎপাদন পূর্বাভাস, বাজারদর, সম্ভাব্য চাহিদা ও সংরক্ষণক্ষমতার তথ্য সমন্বিত করতে হবে। পঞ্চমত, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিকল্প বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের সময়ও পণ্যের ব্যবহার ও মূল্য ধরে রাখা যায়। ষষ্ঠত, কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় প্রতিযোগিতামূলক বাজার, স্বচ্ছ মূল্যতথ্য এবং মধ্যবর্তী সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তা, কৃষক সংগঠন ও উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিচালনব্যবস্থা, কৃষকের প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু কত বেশি খাদ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করবে না; উৎপাদিত খাদ্যের কতটা নিরাপদে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে, কতটা কম ক্ষতিতে বাজারে পৌঁছাচ্ছে এবং উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই কতটা সুফল পাচ্ছেন, তার ওপরও নির্ভর করবে। আমরা যদি পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের অপচয় ১০ শতাংশ কমাতে পারি, তাহলে একই পরিমাণ জমি থেকে কার্যকরভাবে ব্যবহারযোগ্য খাদ্যের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে অতিরিক্ত জমি সম্প্রসারণের চাপ কমবে, উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত পানি ও অন্যান্য উপকরণের অপচয় হ্রাস পাবে এবং খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার হবে। তবে এই সুফল পেতে ফসলভিত্তিক ক্ষতির হার নিরূপণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং অগ্রগতি পরিমাপ জরুরি। কৃষকের উৎপাদন বাড়ানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উৎপাদিত ফসলের প্রতিটি সম্ভাব্য অংশকে সঠিকভাবে ব্যবহার করাও জাতীয় দায়িত্ব। কৃষকের ন্যায্য মূল্য, ভোক্তার সাশ্রয়ী খাদ্য এবং পরিবেশের সুরক্ষা, এই তিনটি লক্ষ্যকে একসঙ্গে সামনে রেখে সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও কৃষি সম্প্রসারণের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উৎপাদনের সাফল্যকে প্রকৃত অর্থে জাতীয় সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে এখনই সংগ্রহ-পরবর্তী অপচয় কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
-লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ