
সাইমন ইসলাম:তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম জেলার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২২ জানুয়ারি ২০২৬) সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রামের চাদগাঁও আবাসিক এলাকায় আইএসডিই বাংলাদেশ-এর কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট, ডাব্লবিউবিডি ট্রাস্ট, আইএসডিই ও ইলমার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ শেয়ারিং মিটিং এ ক্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইএসডিই বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজের হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এম নাসিরুল হক, ইলমার নির্বাহী পরিচালক জেসমিন সুলতানা পারু, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের স্থায়ী সদস্য ও বিশিষ্ট নারী নেত্রী ডাঃ লুসি খান, দৈনিক পূর্বদেশের স্টাফ রিপোর্টার এম এ হোসেন, দৈনিক আমার দেশের স্টাফ রিপোর্টার ওসমান জাহাঙ্গীর, জেলা সামাজিক উদ্যোক্তা পরিষদের যুগ্ন সম্পাদক মোহাম্মদ জানে আলম, চান্দগাও ল্যাবরেটরী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ইসমাইল ফারুকী, ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ন সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম জাহাঙ্গীর, ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস, সবুজের যাত্রার নির্বাহী পরিচালক সায়েরা বেগম, ক্যাব পশ্চিশ ষোল শহর ওয়ার্ড এর সভাপতি এবিএম হুমায়ুন কবির, যুব ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আবু হানিফ নোমান, যুব ক্যাব সদস্য সিরাতুল মুনতাহা, এমদাদুল ইসলাম, নাদিম আব্দুল্লাহ প্রমুখ ।
আইএসডিই এর কর্মসুচি কর্মকর্তা রাইসুল ইসলামের সঞ্চালানায় সভায় ধারনা পত্র উপস্থাপন করেন আইএসডিই এর ইন্টার্ন সাইমন ইসলাম।
সভায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন ও লঙ্ঘনের ওপর প্রণীত জেলাভিত্তিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাঠ করেন মোঃ সাইমন ইসলাম, ইন্টার্ন, আইএসডিই বাংলাদেশ। প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রণয়ন করেছে ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা)। এতে ২০২৪ সালে দেশের ২০টি জেলা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম জেলা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে ১০০ নম্বরের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ নম্বর পেয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ জেলায় টাস্কফোর্স কমিটির সভা নিয়মিত না হওয়া, স্বাস্থ্য সতর্কবাণী যথাযথভাবে পরিবর্তন না করা, নো-স্মোকিং সাইনেজের ঘাটতি, মোবাইল কোর্টের অভাব এবং তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।
এছাড়া, জরিপে অন্তর্ভুক্ত ২০টি জেলার কোনোটিতেই তামাক ব্যবহারকারীর নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান না থাকায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ক্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইএসডিই বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন হয়েছে প্রায় দুই দশক আগে। ২০০৫ সালে 'ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন' প্রণয়ন এবং পরবর্তীতে ২০১৩ ও ২০১৫ সালে সংশোধন করা হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, "তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শুধু কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে টাস্কফোর্স কমিটির নিয়মিত সভা, বাজার মনিটরিং, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং জরিমানার মাধ্যমে আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।" বাস্তবে অধিকাংশ জেলায় টাস্কফোর্স সভা নিয়মিত না হওয়া এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার হার অত্যন্ত কম বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তা অহরহ ঘটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ হুমকি। শিশুদের দ্বারা ও শিশুদের কাছে তামাক বিক্রির সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকা আইন প্রয়োগে দুর্বলতার স্পষ্ট প্রমাণ। রাজস্ব ফাঁকির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) লঙ্ঘনের মাধ্যমে সরকারকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে। যথাযথ মনিটরিং ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু হলে একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়বে, অন্যদিকে তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত হবে।
বক্তানরা বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া আইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে আরও শক্তিশালী করা এবং আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সভা থেকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও শক্তিশালী করা, তামাক বিক্রিতে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু, নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, আইন লঙ্ঘনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে একাধিক সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়।