
বাকৃবি প্রতিনিধি:বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) রপ্তানিযোগ্য আলুর আকারভিত্তিক মান নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘অটোমেটেড রিয়েল-টাইম গ্রেডিং সিস্টেম ফর এক্সপোর্ট কোয়ালিটি পটেটো ইউজিং মেশিন ভিশন টেকনিক’ শীর্ষক এই কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার (বাউরিক)।
আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ও বাউরিকের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আওয়ালের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাউরিকের সভাপতি অধ্যাপক ড. খন্দকার মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মজিদ।এছাড়াও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও গবেষকবৃন্দ কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বয়ংক্রিয় আলু বাছাইকরণ যন্ত্র উদ্ভাবন গবেষণার প্রধান গবেষক ও কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান। এসময় তিনি অটোমেটেড পটেটো গ্রেডার প্রযুক্তির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা প্রতিবছর বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোল্ড স্টোরেজ পরিদর্শনে যাই। সেখানে দেখি ম্যানুয়ালি অর্থাৎ হাতে করে আলু বাচাই করা হয়। তারা মূলত আকার, আকৃতি, রং দেখে যাচাই বাচাই করেন। এটি সময়সাপেক্ষ, শ্রমনির্ভর এবং মান নির্ধারণে ভিন্নতা তৈরি করে। এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতেই উদ্ভাবন করা হয়েছে অটোমেটেড পটেটো গ্রেডার।
এখন আমরা স্বয়ংক্রিয় আলু বাছাইকরণ যন্ত্রের ৩য় ভার্সন নিয়ে কাজ করছি। এই যন্ত্রটি দিয়ে আলু বাছাই করলে প্রতি কেজিতে মাত্র ১২ পয়সা খরচ হয়। সনাতন পদ্ধতির তুলনায় এটি ৭০ গুন সাশ্রয়ী। এর আগের ভার্সনগুলোতে গ্রেডিং স্পিড ছিলো খুবই কম কারণ সেগুলো ছিলো পিক্সেল ভিত্তিক। ক্যামেরায় ধারণকৃত আলুর পিক্সেলের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে গ্রেডিং করা হতো। পূর্বে ব্যবহৃত ক্যামেরাটি মিনিটে মাত্র ১৪ টি ছবি বিশ্লেষণ করতে পারত। এখন আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিসিডি ক্যামেরা ব্যবহার করছি। এটি সেকেন্ডে ৫৩৯ টি ছবি নিতে পারে। পূর্বে ঘন্টায় ২০০ কেজি আলু বাছাই করা যেতো, এখন ঘন্টায় ৫০০ কেজির বেশি আলু বাছাই করা সম্ভব। যন্ত্রটির বর্তমান কার্যকারীতা প্রায় ৮০ শতাংশ।
তিনি জানান, মেশিন ভিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই যন্ত্রটি আলুর আকার ও আকৃতি বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রেণিবিন্যাস করতে পারে। এতে হপার সিস্টেম, কনভেয়ার বেল্ট, ইমেজিং অ্যাকুইজিশন সিস্টেম, নিউমেটিক ইজেকশন সিস্টেম, ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিট এবং কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবস্থা সংযুক্ত রয়েছে। হপার থেকে আলু কনভেয়ার বেল্টে এসে ক্যামেরার নিচ দিয়ে অতিক্রম করার সময় উচ্চক্ষমতার ক্যামেরা ছবি ধারণ করে। পরে সফটওয়্যার বিশ্লেষণের মাধ্যমে আলুগুলোকে বড়, মাঝারি ও ছোট এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এরপর নিউমেটিক ইজেকশন সিস্টেম নির্ধারিত গ্রুপ অনুযায়ী আলুগুলো আলাদা করে দেয়।
মাঠ পর্যায়ে যন্ত্রটির উপযোগীতা নিয়ে প্রধান গবেষক জানান, দেশীর উপকরণ ব্যবহার করে, দেশীয় কারখানায় তৈরি করা হয়েছে। পুরুষ এবং নারী উভয়ের জন্য ব্যবহার উপযোগী। এখনও পর্যন্ত কেবল গবেষণার পর্যায়ে পরীক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। খুব শীঘ্রই মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা শুরু হবে।
এর আগে কর্মশালার স্বাগত বক্তব্য দেন কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ও স্বয়ংক্রিয় আলু বাছাইকরণ যন্ত্র উদ্ভাবনের গবেষণার সহযোগী প্রধান গবেষক ড. মো. রোস্তম আলী। তিনি বলেন, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়িয়ে রপ্তানিমুখী উৎপাদন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী গতবছর দেশে আলুর উৎপাদন ছিলো প্রায় ১ কোটি ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন, যেখানে মোট চাহিদা ছিলো ৯০ লক্ষ মেট্রিক টন। অর্থাৎ ২৫ লক্ষ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি করার সম্ভাবনা আছে। স্বয়ংক্রিয় এই যন্ত্রটির মাধ্যমে আলুর সংরক্ষণকালীন পচন কমিয়ে রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আলুর প্রক্রিয়াজাতকরণ সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে মানসম্পন্ন আলু সরবরাহ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, গ্রেডিংয়ের ভিত্তিতে কৃষক আলুর ন্যায্য মূল্য পাবেন।'
উপস্থাপনা শেষে গবেষক দল ও আমন্ত্রিত অতিথিদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, এটি এক ধরণের রিয়েল-টাইম সর্টিং বা গ্রেডিং মেশিন। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলুর শারীরিক গঠন বা বহিরাবরণ পর্যবেক্ষণ করবে। এটি ছবি ব্যবহার করে আকারের ওপর ভিত্ত করে আলু বাছাই করবে। বাছাই করা আলু পরবর্তীতে নির্দিষ্ট কিছু কাজে ব্যবহার করা যাবে। উন্নত বিশ্বে চিপস বা অন্যান্য যা কিছু তৈরি হয়, তা অবশ্যই মানসম্মত বা বাছাই করা আলু দিয়েই হয়। এই প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই আলু রপ্তানির সুযোগ বাড়াবে।
তিনি আরও বলেন, যন্ত্রটির খরচের বিষয়ে ছবিতে যা দেখলাম, তা স্বাভাবিক। তবে পরবর্তীতে যদি আমরা প্লাস্টিক বা অন্যান্য সাশ্রয়ী উপকরণ ব্যবহার করি এবং সফটওয়্যার ও কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ বাদে বাকি অংশে খরচ কমাতে পারি, তবে এটি আরও ছোট ও সুলভ হবে। আমি গবেষকদের এই দিকটিতেও মনোযোগ দিতে বলব।