ভেজাল কৃষি উপকরণ: নীরব জাতীয় সংকট

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হলো কৃষি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাতের একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক সংকট হলো, ভেজাল, নকল, অবৈধ ও নিম্নমানের সার, বালাইনাশক ও বীজের অবাধ বিস্তার। এই সংকট সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে, ফলন কমাচ্ছে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করছে এবং সর্বোপরি কৃষকের আস্থা ভেঙে দিচ্ছে।

ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের সার, বালাইনাশক ও বীজের বিস্তার আজ আর শুধু কৃষকের ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও জীবনের ওপর এক গভীর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত বীজ, সঠিক মাত্রার সার ও কার্যকর বালাইনাশক। কিন্তু বাজারে অবাধে ভেজাল ও অননুমোদিত কৃষি উপকরণ প্রবেশের ফলে ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে, উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং কৃষক ক্রমেই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে, নিম্নমানের ও ক্ষতিকর বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে খাদ্যশস্যে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ থেকে মানবস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ভেজাল বীজ ব্যবহারে কৃষক প্রতারণার শিকার হলেও এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর, যা ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতার আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে।

এই প্রেক্ষাপটে ভেজাল ও নকল কৃষি উপকরণের বিরুদ্ধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহিমূলক বাজার ব্যবস্থা এবং কৃষকের সচেতনতা বৃদ্ধি আজ সময়ের দাবি। কারণ কৃষিকে নিরাপদ ও টেকসই করা মানেই দেশের মানুষ, পরিবেশ এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা।

সমস্যার গভীরতা ও বাস্তবতা:

বর্তমানে দেশের অনেক কৃষকই জানেন না, তাঁরা যে সার, বীজ বা বালাইনাশক ব্যবহার করছেন, সেটি আসল না নকল। বাজারে একই পণ্যের নামে একাধিক ব্র্যান্ড, একই রকম মোড়ক, বিভ্রান্তিকর লেবেল এবং অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন কৃষকদের বিভ্রান্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিম্নমানের বা নিষিদ্ধ উপাদানযুক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করে ফসলের রোগ তো দূরের কথা, বরং জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, উপকারী পোকা মারা যাচ্ছে এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, এত বড় একটি সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কেন ভেজাল, নকল ও অবৈধ কৃষি উপকরণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয় ?

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) : দায়িত্ব ও বাস্তব সীমাবদ্ধতা:

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) মূলত একটি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও কৃষক সহায়তামূলক প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রধান দায়িত্বগুলো হলো; কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও ভালো চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান। ফসলের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শ প্রদান। সরকার ঘোষিত কৃষি নীতিমালা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে সহায়তা করা। কৃষক–কেন্দ্রিক তথ্য, উপাত্ত ও সচেতনতা বৃদ্ধি। কিন্তু বাস্তবতা হলো; ভেজাল, নকল ও অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে সরাসরি আইন প্রয়োগ (law enforcement) করা DAE-এর মূল ম্যান্ডেট নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের কাছে নেই,  পর্যাপ্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা। আধুনিক পরীক্ষাগার ও দ্রুত মান যাচাই সুবিধা। নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জনবল। শক্তিশালী শাস্তিমূলক ক্ষমতা। ফলে তারা অনেক সময় তথ্য সংগ্রহ বা সতর্কবার্তা প্রদান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না। 

নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা:

ভেজাল কৃষি উপকরণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন থাকলেও বাস্তবায়নে একাধিক দুর্বলতা রয়েছে। একাধিক সংস্থার জটিলতা। কৃষি উপকরণ নিয়ন্ত্রণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সবারই আংশিক ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সমন্বয়ের অভাব বড় সমস্যা। দুর্বল শাস্তি ব্যবস্থা: অনেক ক্ষেত্রে জরিমানা কম, মামলা নিষ্পত্তি ধীর, ফলে অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হয় না। ডিলার ও কোম্পানি নিবন্ধন ব্যবস্থার দুর্বলতা। অনেক অবৈধ বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান সহজেই বাজারে প্রবেশ করছে। কৃষকের অজ্ঞতা ও নির্ভরশীলতা: অধিকাংশ কৃষক ডিলারের কথার ওপর নির্ভরশীল। লেবেল পড়া, উপাদান বোঝা বা অনুমোদন যাচাই করার সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই নেই।

সমাধান ও মুক্তি পথ:

এই সংকট থেকে মুক্তির জন্য কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি সমন্বিত ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জোরদার: নিয়মিত যৌথ অভিযান (DAE + জেলা প্রশাসন + ভোক্তা অধিকার) ভ্রাম্যমাণ আদালতের সংখ্যা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি। অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে লাইসেন্স বাতিল ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও প্রযুক্তির ব্যবহার: প্রতিটি অনুমোদিত সার, বালাইনাশক ও বীজে QR কোড/ডিজিটাল আইডিকৃষক মোবাইল অ্যাপে স্ক্যান করে পণ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারবে। ব্লকচেইন বা কেন্দ্রীয় ডাটাবেসভিত্তিক সরবরাহ চেইন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি: DAE-কে সীমিত আইন প্রয়োগের ক্ষমতা প্রদান। মাঠপর্যায়ে আধুনিক পরীক্ষণ কিট ও প্রশিক্ষণ। জনবল বৃদ্ধি ও প্রণোদনা।

কৃষক সচেতনতা ও ক্ষমতায়ন: কৃষক মাঠ স্কুল, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সচেতনতামূলক প্রচার। “জেনে কিনুন” কর্মসূচি। কৃষক সংগঠন ও সমবায়ের মাধ্যমে যৌথ ক্রয় ব্যবস্থা।

সৎ ও মানসম্পন্ন কোম্পানিকে উৎসাহ: মান বজায় রাখা কোম্পানিকে প্রণোদনা ও স্বীকৃতি। নিম্নমানের পণ্য উৎপাদনকারীদের কালো তালিকাভুক্তি।

ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের সার, বালাইনাশক ও বীজ শুধু কৃষকের সমস্যা নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর একা এই সংকট সমাধান করতে পারবে না, আবার তাদের দায়িত্ব এড়িয়েও যাওয়া যায় না। প্রয়োজন শক্তিশালী নীতি, কার্যকর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সচেতন কৃষক সমাজ। ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের সার, বালাইনাশক ও বীজ থেকে দেশের আপামর কৃষকের মুক্তির পথ, গুরুতর হুমকিতে। কৃষক যদি নিরাপদ না হন, কৃষি টেকসই হবে না। আর কৃষি টেকসই না হলে, দেশের উন্নয়নও টেকসই হবে না। তাই ভেজালমুক্ত কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়।

লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।