সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের কৃষিতে শীত মৌসুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় বোরো ধান, গম, আলু, সরিষা, ডাল, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফলের চাষ ব্যাপকভাবে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীত মৌসুমে অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কুয়াশা শুধু দৃষ্টিসীমা কমায় না, বরং এটি ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ফলন ও গুণগত মানের ওপর সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এগ্রিলাইফ প্রতিবেদক:PUFA এর অর্থ হল পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, দুই বা ততোধিক কার্বন-কার্বন ডাবল বন্ড সহ এক ধরনের "ভাল" চর্বি, যা স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য কিন্তু শরীর দ্বারা তৈরি নয়, উদ্ভিজ্জ তেল, বাদাম, বীজ এবং মাছের মতো উত্স থেকে খাদ্য গ্রহণের প্রয়োজন এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা, কোষের ঝিল্লি এবং হৃদরোগ এবং প্রাইমারি হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ওমেগা -3 এবং ওমেগা -6

মেহেদী ইসলামঃ বাংলাদেশের অ্যাকুয়াকালচার খাত বর্তমানে একটি সংবেদনশীল আবহাওয়াজনিত সময় পার করছে, যেখানে রাতের তাপমাত্রা হ্রাস, দিন-রাতের তাপমাত্রার ব্যাপক পার্থক্য, সূর্যালোকের স্বল্পতা এবং কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ পুকুরের সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এ ধরনের আবহাওয়া পানির গুণাগুণ, মাছ ও চিংড়ির শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম, খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা এবং রোগপ্রবণতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। তবে গবেষণাভিত্তিক সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ঝুঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আবহাওয়াজনিত চাপ ও এর জৈবিক প্রভাব

FAO এবং Boyd (2015)-এর গবেষণা অনুযায়ী, পানির তাপমাত্রা মাছের বিপাক ক্রিয়া, অক্সিজেন গ্রহণ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। হঠাৎ তাপমাত্রা কমে গেলে এনজাইমের কার্যকারিতা হ্রাস পায়, হজম প্রক্রিয়া ধীর হয় এবং খাদ্য গ্রহণ কমে যায়—ফলে মাছ ও চিংড়ি স্ট্রেসজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

এর ফলে দেখা যায়:

  • খাদ্য ব্যবহারের দক্ষতা কমে যাওয়া
  • পুকুরে জৈব বর্জ্য জমা হওয়া
  • সুযোগসন্ধানী রোগজীবাণুর আক্রমণ বৃদ্ধি

১. সুনির্দিষ্ট খাদ্য ব্যবস্থাপনা: বিপাক চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য

গবেষণায় দেখা গেছে, শীতল আবহাওয়ায় খাদ্য ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে সমন্বয় না করলে খাদ্য রূপান্তর হার (FCR) উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয় (NRC, 2011)।

বৈজ্ঞানিকভাবে সুপারিশকৃত পদ্ধতি:

  • দিনের উষ্ণ সময়ে (সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৩টা) খাদ্য প্রয়োগ
  • খাদ্যের পরিমাণ কমিয়ে পুষ্টিগুণ বজায় রাখা
  • সহজপাচ্য ও কার্যকরী উপাদানসমৃদ্ধ খাদ্য ব্যবহার
  • এর ফলে অ্যামোনিয়া উৎপাদন কমে, অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং পানির গুণগত মান রক্ষা পায়।

২. পানির গুণগত মানের স্থিতিশীলতা: উৎপাদনের মূল ভিত্তি

ঠান্ডা আবহাওয়ায় জৈব পদার্থের পচন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, ফলে অ্যামোনিয়া (NH₃) ও হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S)-এর মতো বিষাক্ত গ্যাস জমা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে (Boyd & Tucker, 2012)।

বৈজ্ঞানিকভাবে প্রস্তাবিত করণীয়:

  • pH ৭.৫–৮.৫ এবং ক্ষারত্ব (Alkalinity) ৮০ mg/L-এর উপরে রাখা
  • নিয়মিত পুকুর কন্ডিশনার ও মাটি সংশোধক ব্যবহার
  • অধিক জৈব বোঝাযুক্ত পুকুরে তলানি ব্যবস্থাপনা
  • স্থিতিশীল পানির গুণাগুণ স্ট্রেস কমায় এবং বেঁচে থাকার হার বাড়ায়।

৩. অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা: নীরব ক্ষতি প্রতিরোধ

গবেষণায় দেখা যায়, মেঘাচ্ছন্ন ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় ফটোসিনথেসিস কমে যাওয়ায় ভোরবেলায় দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) সবচেয়ে বেশি হ্রাস পায় (Boyd, 2020)।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:

  • গভীর রাত ও ভোরে এয়ারেটর চালু রাখা
  • পুকুরে অক্সিজেনের সমান বণ্টন নিশ্চিত করা
  • অতিরিক্ত ঘনত্বে মাছ মজুদ এড়িয়ে চলা
  • DO সর্বদা ৪.৫ mg/L-এর উপরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

৪. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: আগাম সুরক্ষা কৌশল

Austin & Austin (2016)-এর মতে, শীতকালীন অধিকাংশ রোগ প্রাদুর্ভাব সরাসরি জীবাণুজনিত নয়, বরং স্ট্রেস-প্ররোচিত।

বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত করণীয়:

  • খাদ্যের সাথে ভিটামিন (C, E), ট্রেস মিনারেল (Zn, Se) ও প্রোবায়োটিক ব্যবহার
  • অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে পুষ্টি শোষণ বৃদ্ধি
  • অপ্রয়োজনীয় হ্যান্ডলিং ও পরিবহন এড়িয়ে চলা
  • এর ফলে ওষুধের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

৫. চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

FAO-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা চিকিৎসার তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর।

গুরুত্বপূর্ণ করণীয়:

  • খাদ্য গ্রহণ ও সাঁতারের আচরণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
  • অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা
  • বায়োসিকিউরিটি ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ নিশ্চিত করা---

৬. তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও কারিগরি সহায়তা

আধুনিক অ্যাকুয়াকালচারে সাফল্য আসে অনুমান নয়, পরিমাপের মাধ্যমে।

কৃষকদের জন্য পরামর্শ:

  • নিয়মিত তাপমাত্রা, DO, pH ও অ্যামোনিয়া পরীক্ষা
  • খাদ্য ও পানির তথ্য সংরক্ষণ
  • প্রশিক্ষিত কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সাথে যোগাযোগ

উপসংহার:বর্তমান আবহাওয়াকে হুমকি নয়, বরং ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা উচিত। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, যারা আবহাওয়া-সংবেদনশীল খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পানির গুণগত মান স্থিতিশীলতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কৌশল অনুসরণ করেন—তারা উৎপাদন বজায় রাখতে, মৃত্যুহার কমাতে এবং লাভজনকতা রক্ষা করতে সক্ষম হন।

টেকসই অ্যাকুয়াকালচার মৌসুমি নয় এটি বৈজ্ঞানিক।

তথ্যসূত্র:

FAO (2018): Aquaculture Development and Climate Change
Boyd, C.E. (2015, 2020): Water Quality Management in Aquaculture
Boyd & Tucker (2012): Pond Aquaculture Water Quality Management
NRC (2011): Nutrient Requirements of Fish and Shrimp
Austin & Austin (2016): Bacterial Fish Pathogens

লেখক:অ্যাকুয়াকালচার বিষয়বিশ্লেষক ও স্ট্র্যাটেজিস্ট

ড. মোঃ মাহফুজ আলম: বাংলাদেশে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল যা মসলা ও সবজি উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৭ লক্ষ ৬৯ হাজার মেট্রিক টন।কৃষি প্রধান এ দেশে পেঁয়াজ একটি অতি প্রয়োজনীয় মসলা জাতীয় ফসল হিসেবে বিবেচিত। পেঁয়াজ শুধু খাদ্যের স্বাদ এবং ঘ্রাণ বৃদ্ধি করতেই নয়, এটি পুষ্টিগুণ এবং আর্থিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য তালিকায় পেঁয়াজ একটি অপরিহার্য উপাদান। পেঁয়াজ চাষ করে কৃষকেরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে। পেঁয়াজ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয় এবং প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও, পেঁয়াজ উৎপাদন সঠিকভাবে বৃদ্ধি করা গেলে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশে পেঁয়াজের উচ্চ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এর চাষাবাদ বাড়ানো কৃষি খাতের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নত জাত, সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং আধুনিক কৃষি পদ্ধতি নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। তবে পেঁয়াজ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব ও সময়মতো ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে অনেক চাষি হতাশ হন। এ সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে বাংলাদেশে পেঁয়াজ চাষের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হলো কৃষি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাতের একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক সংকট হলো, ভেজাল, নকল, অবৈধ ও নিম্নমানের সার, বালাইনাশক ও বীজের অবাধ বিস্তার। এই সংকট সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে, ফলন কমাচ্ছে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করছে এবং সর্বোপরি কৃষকের আস্থা ভেঙে দিচ্ছে।

রোটারিয়ান ড. মো. হেমায়েতুল ইসলাম আরিফ, কো-কোঅর্ডিনেটর, রোটারি পাবলিক ইমেজ, রিপসা টিম, ডি-৬৪, বাংলাদেশ

ভূমিকা

বিশ্ব ইতিহাসে সফলতম বৈশ্বিক স্বাস্থ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে রোটারি ইন্টারন্যাশনালের পোলিও নির্মূল কর্মসূচি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই অভিযান বিশ্বকে প্রমাণ করেছে যে সুসংগঠিত বৈশ্বিক সহযোগিতা, স্থানীয় সম্পৃক্ততা, বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি এবং অদম্য মানবিক অঙ্গীকারের সমন্বয়ে যেকোনো জটিল স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ জয় করা সম্ভব। পোলিও নির্মূলে রোটারির ভূমিকা কেবল অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি একটি সামগ্রিক, বহুমুখী এবং টেকসই মডেল প্রতিষ্ঠা করেছে যা সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, জনসচেতনতা, টিকাদান কৌশল, নজরদারি ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে এক সুতোয় গেঁথেছে।