
এগ্রিলাইফ প্রতিবেদক: ফিশ ফিড উৎপাদনে তাপ স্থিতিশীলতা এবং প্রক্রিয়াকরণের সময়কাল যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির। তাঁর মতে, আধুনিক ফিশ ফিড তৈরিতে কেবল ভালো কাঁচামাল বা উন্নত মেশিন থাকলেই যথেষ্ট নয়; সঠিক তাপ ও সময় নিয়ন্ত্রণ না হলে ফিডের গুণগতমান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এই বিষয়টি পুষ্টিবিদ ও ফিড ইঞ্জিনিয়ার উভয়ের জন্যই গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির ব্যাখ্যা করেন, তাপ স্থিতিশীলতা এবং ধারণ সময় ভিটামিন, চর্বি ও প্রোটিনের সংরক্ষণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সঠিক তাপে স্টার্চ জেলটিনাইজেশন হয়, যা মাছের হজমযোগ্যতা বাড়ায়। একই সঙ্গে প্রোটিনের নিয়ন্ত্রিত ডিনেচারেশন উপকারী হলেও অতিরিক্ত ডিনেচারেশন হজম ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই তাপ ও সময়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখানে মূল বিষয়।
ফিশ ফিডের মাইক্রোবিয়াল নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির বলেন, টেম্পারিং ও শুকানোর সময় উচ্চ তাপমাত্রা ই. কোলি ও সালমোনেলার মতো ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা বাড়ে এবং শেলফ-লাইফ উন্নত হয়। একই সঙ্গে তাপ সয়াবিনের ট্রিপসিন ইনহিবিটরের মতো অ্যান্টি-নিউট্রিশনাল ফ্যাক্টর (ANFs) ধ্বংস করে ফিডের পুষ্টিমান উন্নত করে।
ভুল প্রক্রিয়াকরণের ঝুঁকি সম্পর্কে পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির সতর্ক করে বলেন, অপর্যাপ্ত তাপ বা সময়ে স্টার্চ জেলটিনাইজেশন সঠিক হয় না, পেলেট দুর্বল হয় এবং মাইক্রোবিয়াল ঝুঁকি থেকে যায়। আবার অতিরিক্ত তাপ বা দীর্ঘ সময় ভিটামিন ধ্বংস, লিপিড অক্সিডেশন, প্রোটিন ক্ষতি (মেইলার্ড প্রতিক্রিয়া) ও অস্বাদ তৈরি করে। এর ফল হিসেবে মাছের লিভার সমস্যা, রক্তশূন্যতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য অবনতি ঘটতে পারে।
পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির জানান, পেলেটিং বা এক্সট্রুশনের সময় স্বল্প সময়ের জন্য তাপমাত্রা ১১০–১৩০°C পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ডাই তাপমাত্রা সাধারণত ৯০–৯২°C এবং এক্সট্রুড পেলেট ১১০–১৩০°C এর কাছাকাছি থাকে। এই তাপ স্টার্চকে জেলটিনাইজ করে এবং পেলেটকে ঘন ও টেকসই করে, তবে একই সঙ্গে তাপ-সংবেদনশীল ভিটামিন ও ফ্যাটি অ্যাসিড ক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই আর্দ্রতা ও সময় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভালো ফিশ ফিডের চূড়ান্ত আর্দ্রতা প্রায় ১১–১২% হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির। উৎপাদনের পর ৫০–৮০°C তাপে ২–৪ ঘণ্টা শুকানো প্রয়োজন অতিরিক্ত আর্দ্রতা অপসারণের জন্য। সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ফিড রাখতে হবে ঠাণ্ডা (২০°C এর নিচে, আদর্শ ৪°C), শুষ্ক ও অন্ধকার স্থানে। সাধারণত ২–৩ মাসের মধ্যে ফিড ব্যবহার করাই সর্বোত্তম। পারক্সাইড মান বৃদ্ধি, দুর্গন্ধ বা বাহ্যিক পরিবর্তন মান নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
শেষে পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির জোর দিয়ে বলেন, ফিশ ফিড এক্সট্রুডার বা পেলেট মিল যাই ব্যবহার করা হোক না কেন, কেবল মেশিনই সবকিছু নয়। নিউট্রিয়েন্টসমৃদ্ধ ফর্মুলা, মেশিনের সক্ষমতা অনুযায়ী অপারেশন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টিবিদ ও ফিড ইঞ্জিনিয়ারের সমন্বয় এই সবকিছু একসঙ্গে না হলে ভালো মানের ফিশ ফিড নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, ফিশ ফিড উৎপাদনে তাপ স্থিতিশীলতা ও প্রক্রিয়াকরণ সময়কাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিন্দু। এই ভারসাম্য বজায় রাখলেই উচ্চমানের, নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ফিশ ফিড তৈরি সম্ভব—যা মাছের সুস্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং পুরো শিল্পের টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।