মানবতায় পাখির সুরক্ষা

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

সমীরণ বিশ্বাস:পাখি ও মানুষের মৈত্রী: হারিয়ে যেতে বসা এক সহাবস্থানের গল্প। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষের সঙ্গে পাখির সম্পর্ক শুধু সৌন্দর্য বা গানেই সীমাবদ্ধ নয়, এ সম্পর্ক হাজার বছরের সহাবস্থানের, নির্ভরতার এবং মানবিকতার। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজ সেই সম্পর্ক ভেঙে পড়ার মুখে। নানাবিধ প্রতিকূলতা, মানুষের অবিবেচক আচরণ এবং পরিবেশ ধ্বংসের কারণে পাখির জীবন আজ গভীর সংকটে। উল্লেখযোগ্য হারে কমছে পাখির সংখ্যা। বক, পানকৌড়ীসহ বহু জলচর ও স্থলচর পাখি ইতিমধ্যেই বিপন্ন বন্যপ্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই সংকটময় সময়ে প্রশ্ন উঠে, পাখি রক্ষায় আমাদের দায়িত্ব কী? উত্তর একটাই, মানবতা। মানবতাই পারে মানুষ ও পাখির হারিয়ে যেতে বসা মৈত্রীকে আবার জাগিয়ে তুলতে।

পাখি ও মানুষের মৈত্রীর নজির

গ্রামবাংলার প্রতিটি সকাল শুরু হতো পাখির ডাক দিয়ে। কৃষকের ফসলের মাঠে পাখি ছিল প্রাকৃতিক বন্ধু, ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করত। শিশুদের গল্পে, কবিতায়, লোকসংগীতে পাখি ছিল আবেগের অংশ। কখনো বার্তাবাহক, কখনো শুভ লক্ষণ, আবার কখনো নিছক আনন্দের উৎস। এক সময় মানুষ পাখির জন্য গাছ লাগাত, জলাশয় সংরক্ষণ করত, ছায়াঘেরা পরিবেশ তৈরি করত। আজ সেই মানবিক সম্পর্কের জায়গা দখল করেছে লোভ, অবহেলা ও অসচেতনতা।

নানাবিধ প্রতিকূলতায় বিপন্ন পাখির জীবন:

বর্তমানে পাখিদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত মানুষ সৃষ্ট কারণই দায়ী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানুষের কর্মকাণ্ড পাখিদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফসলের মাঠে বিষ প্রয়োগ:ফসল রক্ষার নামে নির্বিচারে কীটনাশক ও বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এসব বিষ শুধু ক্ষতিকর পোকাই নয়, উপকারী পাখিকেও হত্যা করছে। বিষাক্ত পোকা খেয়ে পাখি মারা যাচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিষ মেশানো খাবার রেখে পাখি নিধন করা হচ্ছে।

জলাশয়ে মরণ ফাঁদ: জলাশয়ে অবৈধ জাল, ফাঁদ ও বিষ প্রয়োগের ফলে পানকৌড়ী, বকসহ বহু জলচর পাখি মারা পড়ছে। মাছ ধরার নামে তৈরি এই মরণ ফাঁদে আটকে পাখির করুণ মৃত্যু আজ নিত্য ঘটনা।

খাদ্য ও বাসস্থানের তীব্র সংকট: গাছ কাটা, বন উজাড়, জলাশয় ভরাট ও নগরায়নের ফলে পাখির স্বাভাবিক আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। পাখিরা পাচ্ছে না নিরাপদ বাসা বাঁধার জায়গা, পাচ্ছে না পর্যাপ্ত খাবার। ফলে তারা বাধ্য হচ্ছে এলাকা ছাড়তে কিংবা মারা যেতে।

মানুষ সৃষ্ট কারণে আবাসস্থল ধ্বংস: রাস্তা, শিল্পকারখানা, আবাসন প্রকল্প, সবকিছুতেই প্রকৃতি উপেক্ষিত। পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের ফলে পাখির চিরচেনা আবাসস্থল তছনছ হয়ে যাচ্ছে। শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ ও আলোক দূষণও পাখির স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত করছে।

পাখিদের অভয়ারণ্য:

পাখিদের অভয়ারণ্য হলো এমন একটি নির্দিষ্ট এলাকা, যেখানে পাখিরা নিরাপদে বসবাস, প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে, মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই। এখানে শিকার, গাছ কাটা, বিষ প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। কেন পাখিদের অভয়ারণ্য জরুরি? বিপন্ন প্রজাতির পাখি সংরক্ষণে, প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করতে,  প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে,  ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে, একটি অভয়ারণ্য শুধু পাখিকেই নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থাকেই সুরক্ষা দেয়।

পাখিদের বর্তমান চ্যালেঞ্জ:

আজ পাখিরা বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি:  ফসলের মাঠে বিষ, জলাশয়ে মরণ ফাঁদ, খাদ্য ও বাসস্থানের সংকট,  মানুষ সৃষ্ট আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, শিকার ও অবৈধ পাচার। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু আইন যথেষ্ট নয়, দরকার সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

আমাদের করণীয় ও সিদ্ধান্ত :

মানবতা থেকেই শুরু হোক পাখি রক্ষা। বিষমুক্ত কৃষি চর্চা : জৈব কৃষি ও সমন্বিত পোকা ব্যবস্থাপনা (IPM) চালু করতে হবে। জলাশয় ও গাছ সংরক্ষণ: প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষা ও দেশীয় গাছ লাগানো জরুরি। পাখি শিকার বন্ধে সামাজিক আন্দোলন। আইনের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাখি অভয়ারণ্য ও নিরাপদ এলাকা তৈরি, স্থানীয় উদ্যোগে:  ছোট ছোট পাখি সুরক্ষা এলাকা গড়ে তোলা সম্ভব। শিক্ষা ও সচেতনতা: শিশুদের মধ্যে পাখি ও প্রকৃতি প্রেম জাগিয়ে তুলতে হবে।

পাখি রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়, এটি প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানবসভ্যতাকে বাঁচানোর লড়াই। পাখি ছাড়া প্রকৃতি যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি মানবতাও অসম্পূর্ণ। পাখি ও মানুষের মৈত্রী টিকে থাকবে তখনই, যখন আমরা মানবিক হবো, সচেতন হবো। মানবতাই পাখি রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আজ সিদ্ধান্ত আমাদের, আমরা কি নীরব দর্শক হবো, নাকি পাখিদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির পক্ষে কথা বলবো ?

লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।