মাছচাষের নীরব নিয়ন্ত্রক: লিভারের কথা কী আমরা ভুলে যাচ্ছি. ....!!!!!

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

কৃষিবিদ গোলাম সারোয়ারঃ মাছচাষে সমস্যা দেখা দিলেই আমরা সাধারণত রোগজীবাণু, ওষুধ কিংবা ফিডের দিকে আঙুল তুলতে অভ্যস্ত। অথচ এমন একটি অঙ্গ আছে, যা নিরবে কাজ করেও একটি চাষ ব্যবস্থার সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে দেয় আর সেটি হলো মাছের লিভার (যকৃত)। মাছের স্বাস্থ্য হঠাৎ করে ভেঙে পড়ে না। ধীরে, নীরবে ভাঙে। আর সেই ভাঙনের শুরুটা হয় শরীরের বিপাকীয় অঙ্গগুলো থেকে বিশেষ করে লিভার থেকে। বিশ্বখ্যাত Fish Pathology গ্রন্থে রবার্টস এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

লিভার হলো মাছের শরীরের কেন্দ্রীয় বিপাক ও সুরক্ষা অঙ্গ। পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা অ্যামোনিয়া, নাইট্রাইট, পরিবেশগত দূষক কিংবা ওষুধের অবশিষ্টাংশ সবচেয়ে আগে এসে জমা হয় লিভারে। এখানেই সেগুলো নিষ্ক্রিয় বা রূপান্তরিত হয়। একই সঙ্গে খাবারের কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট ও প্রোটিনকে শক্তিতে রূপান্তর করা এবং প্রয়োজনে সংরক্ষণ করার দায়িত্বও এই লিভারের।

লিভার শুধু বিপাকের কাজই করে না, মাছের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গেও এটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মাছের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধী প্রোটিন ও এনজাইম লিভারেই তৈরি হয়। পাশাপাশি চর্বি হজমের জন্য অপরিহার্য বাইল নিঃসরণও পুরোপুরি লিভার নির্ভর।

সমস্যা শুরু হয় যখন পুকুরের পানির গুণগত মান সামান্য হলেও বিঘ্নিত হয়। পানিতে অক্সিজেন কমে গেলে মাছের শরীরে চাপ তৈরি হয়। তখন লিভার স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে বিকল্প পথে কাজ করতে বাধ্য হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে গিয়ে কার্যক্ষমতা কমে যায় যা মাছচাষের জন্য এক ধরনের নীরব বিপর্যয়।

একইভাবে পানিতে অ্যামোনিয়া বা নাইট্রাইটের মাত্রা বেড়ে গেলে তা সরাসরি লিভারের উপর চাপ সৃষ্টি করে। লিভার কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ মৃত্যুঝুঁকি দেখা দেয়। পানির পিএইচের অস্বাভাবিক ওঠানামাও লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে, ফলে খাবার ঠিকমতো হজম হয় না।

নিম্ন কোয়ালিটির ফিড এবং চাষির দূর্বল ব্যবস্থাপনাও লিভার সমস্যার একটি বড় কারণ। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট বা ফ্যাটযুক্ত ফিড যেমন লিভারে অস্বাভাবিক জমাট তৈরি করে, তেমনি ছত্রাক বা আফ্লাটক্সিনে দূষিত ফিড সরাসরি লিভার কোষকে বিষাক্ত করে তোলে। এর ফল হয় ধীরগতির বৃদ্ধি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি।

লিভার দুর্বল হলে মাছের ইমিউন সিস্টেম ভেঙে পড়ে। তখন স্বল্পমাত্রার ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকও মারাত্মক রোগে পরিণত হয়। বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে রোগের মূল কারণ জীবাণু নয়, বরং লিভারের অক্ষমতা এ বিষয়টি আধুনিক ফিশ হেলথ গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে। একটি সুস্থ মাছের লিভার সাধারণত গাঢ় লালচে-বাদামি রঙের, মসৃণ ও দৃঢ় হয়। লিভার সুস্থ রাখতে হলে পানির গুণগত মান বজায় রাখা, সুষম ও ছাঁচমুক্ত ফিড ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও স্ট্রেস এড়িয়ে চলা জরুরি।

শেষ কথা খুবই স্পষ্ট—
পানি খারাপ হলে লিভার নষ্ট হয়,
লিভার নষ্ট হলে ইমিউনিটি ভেঙে পড়ে,
আর তখন ক্ষতি অনিবার্য।
লিভারের যত্ন মানেই কম ওষুধে বেশি উৎপাদন।
এটাই টেকসই মাছচাষের সবচেয়ে নীরব, কিন্তু সবচেয়ে কার্যকর সূত্র।
Healthy Liver = Fewer Drugs + Better Growth + Sustainable Profit

লেখক: এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (একুয়া)
আস্থা ফিড ইন্ডাষ্ট্রিজ লিঃ