জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস-২০২৬-নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করি, সুস্থ সবল জীবন গড়ি

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

ড. মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিনঃ খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই খাদ্য যদি নিরাপদ না হয়, তবে তা মানবজীবনের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ প্রেক্ষাপটে "নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করি, সুস্থ সবল জীবন গড়ি” এই আহবানে আজ ০২ ফেব্রুয়ারী দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস-২০২৬।

বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। চাল, সবজি, মাছ ও ফল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়েছে দেশ। কিন্তু উৎপাদনের এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের নিরাপদতা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জও প্রকট হয়ে উঠেছে। খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নীরব হুমকি সৃষ্টি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের কারণে দেশে ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগ বাড়ছে। ফল পাকাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, শাকসবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক, দুধে পানি ও রাসায়নিক মিশ্রণ, মসলায় কৃত্রিম রং-এসব এখন নিত্যদিনের আলোচনার বিষয়। এসব খাদ্য গ্রহণের ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, গর্ভবতী নারীদের ঝুঁকি বাড়ছে এবং বয়স্করা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

খাদ্যজনিত অসুস্থতা কেবল ব্যক্তি বা পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এটি রাষ্ট্রের ওপরও বড় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায়, কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। ফলে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি।

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন ও নীতিমালা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা কাজ করছে বলেও দাবি করা হয়। তবে বাস্তবতা হলো-আইনের প্রয়োগ এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। অভিযান হয়, জরিমানা হয়, কিন্তু তা অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে পারে না।

ভেজালকারীরা নতুন কৌশলে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নগর এলাকায় বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পরীক্ষাগার সুবিধা এবং জনবল সংকট খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলেও কৃষি উৎপাদনে কীটনাশক ও রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিপণন-পুরো শৃঙ্খলে নজরদারি প্রয়োজন। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। অনুমোদিত মাত্রার বাইরে কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং জৈব ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে হবে।

একই সঙ্গে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায্যমূল্য না পেলে তারা দ্রুত লাভের আশায় অনিরাপদ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তুলতে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও বাজার ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রয়োজন।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। এ ক্ষেত্রে কেবল অভিযান বা জরিমানার ওপর নির্ভর না করে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। নিয়মিত বাজার তদারকি, আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তা অপরিহার্য। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভেজালকারীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে এবং অপরাধ প্রবণতা কমবে।

ভোক্তা হিসেবে আমাদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সস্তার লোভে অনিরাপদ খাদ্য কেনা, উৎস না জেনে পণ্য গ্রহণ কিংবা ভেজাল দেখেও প্রতিবাদ না করা সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করে। সচেতন ভোক্তা সমাজ গড়ে উঠলে বাজারে অনিরাপদ খাদ্যের চাহিদা কমে আসবে।

গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সচেতনতামূলক লেখা ও নিয়মিত প্রচারের মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক করা সম্ভব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে। টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ক্ষুধামুক্ত সমাজ গড়া, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য খাদ্যের নিরাপত্তা অপরিহার্য। আজকের অবহেলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে, যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে হবে। তবেই আমরা গড়ে তুলতে পারব একটি সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জাতি। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার-কারণ সুস্থ জীবনই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি।

-লেখক- অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।