
সমীরণ বিশ্বাস:খাদ্য নিরাপত্তা আজ বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি সংকোচন, শ্রম সংকট এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সব মিলিয়ে কৃষি এখন এক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি বা স্মার্ট কৃষি শুধু একটি বিকল্প নয়, বরং ভবিষ্যতের অপরিহার্য পথ। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন, (IoT), সেন্সর প্রযুক্তি, মোবাইল অ্যাপ এবং ডিজিটাল সাপ্লাই চেইনের সমন্বিত ব্যবহার কৃষিকে নতুন যুগে প্রবেশ করাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা ভবিষ্যতের কৃষি ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, লাভজনক ও টেকসই করতে সহায়তা করবে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির প্রয়োজনীয়তা:
খাদ্য নিরাপত্তা বলতে শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতা নয়, বরং পুষ্টি, নিরাপত্তা এবং সহজলভ্যতাও বোঝায়। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা Food and Agriculture Organization (FAO) এর মতে, প্রযুক্তি ছাড়া ভবিষ্যতের খাদ্য চাহিদা পূরণ করা কঠিন হবে। বাংলাদেশে কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব,মাটির উর্বরতা হ্রাস,শ্রমিক সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া। এসব সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি একটি কার্যকর পথ।
স্মার্ট কৃষি: ভবিষ্যতের কৃষি ব্যবস্থার রূপ:
স্মার্ট কৃষি (Smart Agriculture) হলো এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা যেখানে তথ্য প্রযুক্তি, AI, IoT (Internet of Things), সেন্সর, ড্রোন ও ডাটা বিশ্লেষণ ব্যবহার করে কৃষি পরিচালনা করা হয়। স্মার্ট কৃষির মূল বৈশিষ্ট্য: তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সুনির্দিষ্ট কৃষি ব্যবস্থাপনা (Precision Agriculture), উৎপাদন বৃদ্ধি, খরচ কমানো, পরিবেশবান্ধব কৃষি। এই পদ্ধতিতে কৃষক অনুমানের উপর নির্ভর না করে তথ্যের উপর ভিত্তি করে কাজ করতে পারেন।
কৃষিতে AI প্রযুক্তির ব্যবহার:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষিতে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। AI প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষক আগাম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। AI এর প্রধান ব্যবহার, রোগ ও পোকা শনাক্তকরণ: মোবাইল ফোনের ছবি ব্যবহার করে AI প্রযুক্তি ফসলের রোগ শনাক্ত করতে পারে। এতে দ্রুত চিকিৎসা সম্ভব হয় এবং ক্ষতি কমে। ফলন পূর্বাভাস: AI ডাটা বিশ্লেষণ করে উৎপাদনের সম্ভাব্য পরিমাণ পূর্বাভাস দিতে পারে। এতে বাজার পরিকল্পনা সহজ হয়। আবহাওয়া বিশ্লেষণ: AI ভিত্তিক আবহাওয়া তথ্য কৃষককে সঠিক সময়ে বপন, সার প্রয়োগ ও সেচ দিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেড ইতোমধ্যে কৃষিতে AI ব্যবহারের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
ড্রোন স্প্রে প্রযুক্তি: আধুনিক কৃষির নতুন বিপ্লব:
ড্রোন প্রযুক্তি কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন। ড্রোন ব্যবহারের সুবিধা: দ্রুত স্প্রে করা যায়, শ্রম কম লাগে, কম সময়ে বেশি জমি কভার করা যায়, কৃষকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমে, সঠিক পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার হয়, বিশেষ করে শ্রম সংকট মোকাবেলায় ড্রোন প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর। ভবিষ্যতে বড় কৃষি খামারে ড্রোন অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
সয়েল সেন্সর ও স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা:
মাটির স্বাস্থ্য কৃষির মূল ভিত্তি। সয়েল সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির আর্দ্রতা, pH, পুষ্টি উপাদান পরিমাপ করা যায়। এর ফলে: সঠিক পরিমাণ সার ব্যবহার সম্ভব, পানির অপচয় কমে, উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, খরচ কমে, স্মার্ট সেচ প্রযুক্তি কৃষিকে আরও পরিবেশবান্ধব করে তুলছে।
মোবাইল অ্যাপভিত্তিক কৃষি সেবা:
বর্তমানে কৃষকের হাতে স্মার্টফোন রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কৃষি সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কৃষক পেতে পারেন: আবহাওয়ার তথ্য, রোগ নির্ণয়, বাজার মূল্য, কৃষি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ভিডিও। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেড সহ কিছু প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিভিন্ন ডিজিটাল কৃষি সেবা চালু করেছে।
ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ও কৃষকের ন্যায্য মূল্য:
বাংলাদেশের কৃষির অন্যতম সমস্যা হলো কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না। উৎপাদন এবং চাহিদার সমন্বয় না থাকা, ও মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন এই সমস্যার সমাধান করতে পারে।এর সুবিধা: কৃষক সরাসরি ক্রেতার সাথে যুক্ত হতে পারে, মূল্য স্বচ্ছতা বাড়ে, বাজার নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়, কৃষকের লাভ বাড়ে, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম কৃষিপণ্য বিপণনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের অর্থনৈতিক প্রভাব:
প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে: উৎপাদন খরচ কমে, ফলন বৃদ্ধি পায়, কৃষকের আয় বাড়ে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়, রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ে, স্মার্ট কৃষি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে, বিশেষ করে কৃষিযন্ত্র পরিচালনা, ডেটা বিশ্লেষণ, অ্যাগ্রি-সার্ভিস খাতে। একই সঙ্গে ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সহায়তা করে, মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমায়। তবে প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হওয়া, প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষতার অভাব এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশ-এর মতো উন্নয়নশীল দেশে। সঠিক নীতি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং সহজ ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে।
চ্যালেঞ্জসমূহ:
যদিও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির সম্ভাবনা অনেক, কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে: প্রযুক্তির উচ্চ খরচ, কৃষকের প্রযুক্তি জ্ঞান সীমিত, প্রশিক্ষণের অভাব, ইন্টারনেট সংযোগ সমস্যা, নীতিগত সমন্বয়ের অভাব, প্রয়োজনীয় ডাটার ঘাটতি। প্রযুক্তিতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা সহ এই সমস্যাগুলো সমাধান না করলে প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছাবে না।
করণীয় ও নীতিগত সুপারিশ:
কৃষি প্রযুক্তিতে ভর্তুকি প্রদান, সরকারি সহায়তা প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দেবে। কৃষক প্রশিক্ষণ, গ্রাম পর্যায়ে প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ জরুরি। পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ প্রযুক্তি দ্রুত বিস্তার করবে। গবেষণা ও উদ্ভাবন বৃদ্ধি, কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, ইন্টারনেট সুবিধা গ্রাম পর্যায়ে নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষি মন্ত্রণালয় এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যতের কৃষি: প্রযুক্তি নির্ভর টেকসই পথ:
ভবিষ্যতের কৃষি হবে: ডাটা নির্ভর, পরিবেশবান্ধব, শ্রম সাশ্রয়ী, লাভজনক, প্রযুক্তি সমন্বিত, AI, ড্রোন, সেন্সর, রোবটিক্স, সব মিলিয়ে কৃষি একটি আধুনিক শিল্পে রূপান্তরিত হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির বিকল্প নেই। স্মার্ট কৃষি শুধু উৎপাদন বাড়াবে না, কৃষকের জীবনমানও উন্নত করবে। বাংলাদেশে কৃষির আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। ড্রোন স্প্রে, সয়েল সেন্সর, AI রোগ শনাক্তকরণ, মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন, এই প্রযুক্তিগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে কৃষি খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। পরামর্শ এখন সত্যিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, কারণ কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচন, সঠিক নীতি এবং সঠিক বাস্তবায়নের উপর।
আগামীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ। আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ডেটা ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, টেকসই ও লাভজনক করে তুলতে পারে। ফলে সীমিত জমি ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হবে। তাই কৃষিতে প্রযুক্তির বিস্তার শুধু উন্নয়ন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন স্মার্ট IoT-সেচ ব্যবস্থা, ড্রোন, AI-ভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ, মেকানাইজেশন, ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস) ব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং কৃষিপণ্যের মান উন্নত হয়। এর ফলে কৃষকের আয় বাড়ে এবং বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকে, যা সামগ্রিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।