আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্ম: সাম্রাজ্য, ষড়যন্ত্র ও উপনিবেশের গল্প

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

ডক্টর এএইচএম সাদেকঃবিভক্ত মধ্যপ্রাচ্যের রক্তাক্ত পথচলার একটি ধারাবাহিক আলোচনা। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি—এগুলো হাজার বছরের ইতিহাস, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, উপনিবেশবাদ এবং আধুনিক রাজনীতির ফল।

প্রাচীন সময়ে আরবে একক রাষ্ট্র ছিল না :
মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশ বিশেষ করে আরব উপদ্বীপ প্রাচীনকাল থেকে ছিল গোত্রভিত্তিক সমাজ ছিল। মূলত ছোট ছোট গোত্র (tribe) ছিল প্রধান শক্তি। পরিচয় ছিল “গোত্র” ও “ধর্ম” ভিত্তিক। কোনো নির্দিষ্ট “দেশ” ছিল না। মক্কা ও মদিনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ শহর। প্রাচীন আরব সমাজের বাণিজ্য ও মরুভূমির জীবনই প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ইসলামের উত্থান ও "উম্মাহ” ধারণা প্রতিষ্ঠিত:
সপ্তম শতাব্দীতে (পুরো ইসলামের সূচনা ও প্রতিষ্ঠা ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষ থেকে ৭ম শতাব্দীর প্রথম ভাগে, তবে মূল বিস্তার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে ৭ম শতাব্দীতে) হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের সূচনা করেন। তখন আরব গোত্রগুলো একত্রিত হয়।একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে ওঠে। “উম্মাহ” ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে প্রথমবারের মতো আরবরা একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি হয়ে ওঠে।

সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় আরব সমাজ :
ইসলামের উত্থানের পর আরবরা খিলাফতের মাধ্যমে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। যেমন চার খলিফার যুগ অর্থাৎ খোলাফায়ে রাশেদীনদের যুগ। ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আলী (রাঃ) এর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগের সমাপ্তি ঘটে। চার খলিফার মোট শাসনকাল ছিল ২৯ বছর। এরপরের শাসনব্যবস্থা অর্থাৎ উমাইয়া খেলাফত ৬৬১ সাল থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোট ৮৯ বছর শাসন কায়েম করে। উমাইয়া খিলাফত শেষ হয় ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে। তারপর আব্বাসিয়া শাসন ব্যবস্থা বা আব্বাসীয় খেলাফত ব্যবস্থা ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৫০৮ বছর প্রতিষ্ঠিত থাকে। এই সময় মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, এমনকি স্পেন পর্যন্ত আরব শাসন বিস্তৃত হয়। আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোলিয়রা ১২৫৮ সালে বাগদাদের পতন ঘটায় এবং দখল করে আব্বাসীয় শাসন ব্যবস্থা তথা আব্বাসীয় খেলাফত পতন ঘটে।

হালাকু খানের হাতে ১২৫৮ সালে আব্বাসীয় খিলাফত তথা বাগদাদ পতনের পর আরব ভূখণ্ড একক কারও অধীনে যায়নি বরং বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। ১২৫৮ সালের পর আরব ভূখণ্ড ভাগ হয়ে মোঙ্গলদের হাতে চলে যায় ইরাক ও তার পূর্বাঞ্চল। মামলুক সালতানাতের হাতে চলে যায় সিরিয়া ও মিশরের অংশ। কেবল মিশরের কায়রোতে তখন প্রতীকীভাবে আব্বাসীয় খলিফা টিকে থাকে। মূল ক্ষমতা ছিল সুলতানদের হাতে। আর আরব উপদ্বীপ ছোট ছোট গোত্র ও স্থানীয় শাসকদের দ্বারা শাসন হত। এভাবে প্রায় ২৫০ বছর কোনো একক শাসন ছিল না।

উসমানীয় বা অটোমানদের উত্থান ও সাম্রাজ্যের শাসন (১৫১৭ থেকে ১৯১৮) :
১৩শ শতকের শেষ দিকে আনাতোলিয়ায় উত্থান ঘটে উসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্যের, যার প্রতিষ্ঠাতা ওসমান গাজী। ধীরে ধীরে তারা শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। পুরো আরব বিশ্ব অটোমানদের অধীনে চলে আসে যা এশিয়া ও ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে।

উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল আজকের তুরস্কের ইস্তাম্বুল। তারা আরব অঞ্চলগুলোকে প্রদেশ (province) হিসেবে পরিচালনা করে। স্থানীয় আমির বা গভর্নর হাতে শাসন ছেড়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ওসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলের হাতে রাখে। এভাবে ১৫১৭ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বছর উসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্য ধরে রাখে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও অটোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং মধ্যপ্রাচ্যে আরব ভূখণ্ডে রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস :
এদিকে শুরু হয়ে যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলে। অটোমানরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তি (Central Powers) জার্মানির (জার্মানি, অটোমান সাম্রাজ্য, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া) পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়। ব্রিটেন তথা মিত্রশক্তির (Allied Powers) - (ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান)  নিকট অটোমানরা পরাজিত হয়।

ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪–১৯১৮) শেষে উসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। পুরো আরব অঞ্চল ক্ষমতাহীন ও শাসকশূন্য হয়ে যায়। ইউরোপীয় শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি হয়। তখন পর্যন্ত আরব রাষ্ট্রগুলো আলাদা “দেশ” হিসেবে কোন অস্তিত্ব ছিল না। তখন ইউরোপীয় শক্তি—বিশেষ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্স—আরব অঞ্চল ভাগ করে নেয়। আর আরব ভূখণ্ডে নতুন নতুন রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়।

সাইক্স-পিকো চুক্তি (গোপন ভাগাভাগি ) :
সাইক্স-পিকো থেকে আজ মধ্যপ্রাচ্যের ভাঙার ইতিহাস বড় নির্মম ও করুন। আরবের সাধারণ জনগন চেয়েছিল স্বাধীনতা কিন্তু গোপন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদেরকে গোলামে পরিনত করে।

১৯১৬ সালে সাইক্স-পিকো চুক্তির (Sykes-Picot) মাধ্যমে ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে ঠিক করে কে কোন অঞ্চল পাবে, কিভাবে মধ্যপ্রাচ্য ভাগ হবে। ব্রিটেনের মার্ক সাইক্স আর ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকো এই দুইজন মিলে গোপনে ভাগ করেন যে, ব্রিটেন কোন কোন অংশ পাবে আর ফ্রান্স কোন কোন অংশ পাবে। তাই তাদের নাম অনুসারে এ চুক্তির নাম হয় সাইক্স-পিকো চুক্তি। বাস্তবতা হচ্ছে এই সীমান্তগুলো মানচিত্রে দাগ টেনে বানানো। মধ্যপ্রাচ্য আরব ভূখণ্ডকে কৃত্রিমভাবে ভাগ করা হয় এবং স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়া হয়নি।

মেন্ডেট সিস্টেম (উপনিবেশিক শাসন) :
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর লীগ অব নেশনস (পরে জাতিসংঘ হয়) ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে “ম্যান্ডেট” দেয়। ১৯১৮ সালের পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স "মেন্ডেট" নামে শাসন শুরু করে। কি মেন্ডেট ? ব্রিটেন ভাগে - ইরাক,প্যালেস্টাইন, জর্ডান।

ফ্রান্স ভাগে সিরিয়া, লেবানন। নাম ছিল “ম্যান্ডেট”, কিন্তু বাস্তবে ছিল উপনিবেশ শাসন। তখনো আরবদের স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে আরবদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ (nationalism) বাড়তে থাকে। সেই থেকে ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে আরব ভূখণ্ডে রাষ্ট্র গঠন শুরু হয় ও স্বাধীনতা লাভ করে।

ধাপে ধাপে আরব দেশগুলো স্বাধীন হয়: স্বাধীনতা লাভ (১৯৩০ - ১৯৭০)। যেমন সৌদি আরব (১৯৩২), ইরাক (১৯৩২), জর্ডান (১৯৪৬), সিরিয়া (১৯৪৬), লেবানন (১৯৪৩), কুয়েত (১৯৬১), সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৯৭১)। আর এভাবেই আধুনিক আরব রাষ্ট্রগুলো তথা আধুনিক আরব বিশ্ব গড়ে ওঠে।

বর্তমানে “আরব দেশ” বলতে সাধারণত সেই দেশগুলোকে বোঝায়, যেখানে আরবি ভাষা প্রধান এবং যারা আরব লীগ এর সদস্য। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সব মিলিয়ে মোট ২২টি দেশকে আরব দেশ বলে। গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো আজকের অনেক সীমান্ত “কৃত্রিমভাবে" (colonial drawing) তৈরি। এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে এখনো সংঘাত ও অস্থিরতা দেখা যায়। আরব ভূখণ্ডে কোন দেশ কীভাবে আলাদা হলো—ডিটেইল কেস স্টাডি তুলে ধরলে লেখা বড় হয়ে যাবে বিধায় সংক্ষিপ্ত করা হলো। ভবিষ্যতে লেখা হবে।

বেলফোর ঘোষণা ও ইসরাইল রাষ্ট্র গঠন:
মাঝখানে বেলফোর ঘোষণা ও ইসরাইল রাষ্ট্র গঠন  ইস্যু নিয়ে আসা। প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের জন্য “জাতীয় আবাসভূমি” তৈরি হবে। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা লর্ড রথসচাইল্ড-কে একটি চিঠি দেন। এই চিঠিতেই প্যালেস্টাইনে একটি ইহুদি “জাতীয় আবাসভূমি” (national home) প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। যা বেলফোর ডিক্লেয়ারেশন বা বেলফোর ঘোষণা। তবে এ ঘোষণায় স্থানীয় অ-ইহুদি জনগণের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। অর্থাৎ দুটি পক্ষের স্বার্থ একসাথে বিবেচনার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরিতাপের বিষয় ইহুদিরা এটি মেনে চলে নি।

ব্রিটেন কেন বেলফোর ঘোষণা দিয়েছিল? ব্রিটেনের কিছু কৌশলগত লক্ষ্য ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮) মিত্রশক্তির পক্ষে ইহুদিদের সমর্থন পাওয়া। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মিত্রদের শক্তি বাড়ানো। মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করা। আর তখন প্যালেস্টাইন ছিল উসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্যে অংশ।

যেহেতু অটোমানরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্স মিত্র শক্তির বিপক্ষে ছিল এবং যুদ্ধে পরাজিত হয়। ফলে এই অঞ্চল ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে আসে। সেই সুযোগে ইহুদিদেরকে এ অঞ্চলে একটি আভাস ভূমি প্রতিষ্ঠা করে দেয়। এর ফলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব-সংঘাতের রূপ নেয় এবং ইসরায়েল আজ মধ্যপ্রাচ্যে তথা আরব ভূমির বিষফোঁড়া ।

ব্রিটিশ-ফরাসিরা নিজেদের স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যে কৃত্রিমভাবে নতুন নতুন দেশ বানায়। এরপরে ধীরে ধীরে স্বাধীনতা দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখে। অটোমান পতনের পর ইউরোপীয় শক্তি অঞ্চল দখল করে। সাইক্স-পিকো চুক্তি দিয়ে ভাগ করে কৃত্রিম দেশ তৈরি করে এবং পরে স্বাধীনতা দেয় কিন্তু সমস্যা রেখে যায় যার প্রভাব আজও চলছে। এই অঞ্চলের বর্তমান মানচিত্র ইতিহাসের স্বাভাবিক ফল নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে তৈরি করা।

মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয় এটি ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন। সাইক্স-পিকো চুক্তি আর বেলফোর ঘোষণা-এর মতো সিদ্ধান্তগুলো কাগজে দাগ টেনেছিল, কিন্তু বাস্তবে তা মানুষের জীবন, পরিচয় আর ভবিষ্যৎকে বিভক্ত করেছে।

আজকের সংঘাত হঠাৎ জন্ম নেয়নি এটি ইতিহাসের ধারাবাহিক ফল। মানচিত্র বদলানো গেছে, কিন্তু মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা আর রক্তের স্মৃতি এখনো রয়ে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্য আসলে একটি প্রশ্ন — যার উত্তর এখনো লেখা হচ্ছে…

১৯১৮ সালের পরের ইতিহাস ---- চলবে-----