
অঞ্জন মজুমদারঃ গত ১০ মাসে দেশের ডিমের বাজারে যে অস্বাভাবিক মূল্যপতন দেখা যাচ্ছে, তা শুধু একটি সাময়িক বাজার সংকট নয়—এটি দেশের পুরো পোল্ট্রি সেক্টরের জন্য গভীর উদ্বেগের সংকেত। আজ (০৩.০৪.২০২৬ ইং) প্রান্তিক খামারিরা প্রতিটি ডিম বিক্রি করছেন গড়ে ৭.২৫ টাকায় (জেলা ভিত্তিক স্থানভেদে একটু কম বেশি হতে পারে), যেখানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী একটি ডিম উৎপাদনে খরচ বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যমে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে, হিসাব করা হয়েছিল ১০.১৯ টাকা অর্থাৎ প্রতি ডিমে খামারিরা এখন সরাসরি লোকসান গুনছে প্রায় ২.৫০ থেকে ৩ টাকা। এই পরিস্থিতি আরো দীর্ঘদিন চলতে থাকলে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিদের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে—যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের মোট ডিম উৎপাদনের প্রায় ৮০–৮২% আসে প্রান্তিক ও মাঝারি খামারিদের কাছ থেকে, এই খামারিরাই মূলত গ্রামভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বাজারে ডিমের সরবরাহ নিশ্চিত করে কিন্তু বর্তমানে যে মূল্যসংকট চলছে, তাতে এই খামারিরা একে একে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই ইতিমধ্যে লেয়ার মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন বা নতুন করে বাচ্চা তুলছেন না। এর ফলে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঘাটতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ডিমের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ফিডের দাম বৃদ্ধি, ওষুধ ও ভ্যাকসিনের উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, এবং শ্রম খরচ বৃদ্ধি, রোগবালাই ও আবহাওয়ার প্রতিকূলতা জনিত ক্ষতি। বিশেষ করে ভুট্টা ও সয়াবিন মিলের মতো প্রধান পোল্ট্রি ফিড উপাদানের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে অথচ খামারিরা তাদের উৎপাদিত ডিম সেই অনুযায়ী ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারছে না। ফলে উৎপাদন খরচ ও বিক্রয় মূল্যের মধ্যে একটি বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
খামারিদে জন্য এমন মারাত্মক সংকটজনক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক খামারিরা, যাদের মূলধন সীমিত এবং ঝুঁকি সহ্য করার ক্ষমতা কম। বড় কর্পোরেট বা ইন্টিগ্রেটেড ফার্মগুলো হয়তো কিছুদিন লোকসান সহ্য করতে পারবেন কিন্তু ছোট খামারিরা দ্রুত বাজার থেকে ছিটকে পড়ছে। এতে বাজারে একধরনের একচেটিয়া প্রবণতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যেখানে অল্প কিছু বড় প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। যার প্রভাবে ভবিষ্যতে ডিমের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আজ যখন ডিমের দাম কম, তখন কি ভোক্তারা সত্যিই লাভবান হচ্ছে? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ভোক্তারা কম দামে ডিম কিনতে পারছে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি ভোক্তাদের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। যদি প্রান্তিক খামারিরা উৎপাদন থেকে সরে যায় ( ঝরে যাওয়ার ধারা অব্যাহত আছে), তাহলে সরবরাহ কমে যাবে এবং বাজারে সংকট তৈরি হবে। তখন ডিমের দাম হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যেতে পারে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
সরকার ইতিমধ্যে ডিমের ফার্ম গেইট মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে একটি সুষম বাজার তৈরির চেষ্টা করেছে কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই মূল্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন স্তরে অসামঞ্জস্যের কারণে খামারিরা নির্ধারিত মূল্য পাচ্ছে না। ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা সীমিত থেকে যাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এই সংকট উত্তরণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য ফিড উপকরণের ওপর ভর্তুকি বা করছাড় দেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরাসরি খামারি থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর জন্য বিকল্প বিপণন ব্যবস্থা (যেমন কো-অপারেটিভ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম) গড়ে তোলা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বাজার মনিটরিং জোরদার করে নিশ্চিত করতে হবে যে খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে। এছাড়া স্বল্প সুদের ঋণ ও প্রণোদনার মাধ্যমে ক্ষুদ্র খামারিদের টিকে থাকার সুযোগ বাড়াতে হবে যা খামারি কার্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।
ডিমের বর্তমান মূল্যপতনের ধারা শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়—এটি একটি সামাজিক ও কাঠামোগত সংকট। প্রান্তিক খামারিরা যদি এই শিল্প থেকে হারিয়ে যায়, তাহলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তাই এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে খামারিরা টিকে থাকতে পারে এবং দেশের মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে ডিম পেতে পারে। বর্তমান সংকটকে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হবে—খামারি, ভোক্তা এবং পুরো জাতিকে।
উৎপাদন খরচের তথ্য সূত্র: কৃষি বিপনন অধিদপ্তর।।
লেখক:সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন (বিপিআইএ)
(পোল্ট্রি প্রোডাকশন এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিষ্ট)