চীনের দুঃখ হোয়াংহো : হাওরবাসীর দুঃখ বাঁধ

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

এস এম মুকুল: হাওরে কাঁচা-পাকা ধানের শিষগুলো কৃষকের একমুঠো সুখে থাকার আশা যখন অসময়ে পাহাড়ি ঢলে পানির নিচে তলিয়ে যায়- তখন কেমন লাগে ভাবতে পারেন। আচ্ছা পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি মন্ত্রণালয়, হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, ‘হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন প্রকল্প’, ‘হাওর এলাকায় বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন প্রকল্প’ কিসের জন্য করা হয়েছে?

চীনের দুঃখ হোয়াংহো আর বাংলাদেশের হাওরবাসীর দুঃখ বাঁধ। উন্নয়ন আর সংস্কারের নামে হাওর এলাকার বাঁধ এখন যেন চোরাবালির ফাঁদ। এ কেমন উন্নয়ন নীতি যে উন্নয়নের নামে বরাদ্ধের বেশিরভাগ অর্ধেক খায় ঠিকাদার, প্রকল্প তদারককারী আর জনপ্রতিনিধিরা আর বাকিটা যায় পানির তলে। বছরের পর বছর চলে আসছে এই অনিয়ম। অভিযোগ উঠেছে বাঁধ নির্মাণের কাজ যথাসময়ে শুরুই হয়না- যথা সময়ে শেষ হবে কিভাবে! তাহলে কি ধরে নিতে হবে বিলম্বিত শুরুটাই ছিলো উদ্দেশ্য প্রণোদিত! সরকারের গৃহিত উন্নয়ন কাজে এত বড় ধৃষ্টতা! নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাজ কি তাহলে চুপ করে বসে থাকা। প্রায় প্রতি বছরই হাওরবাসীদের অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায় পাউবির কর্মকর্তারা বাঁধ তৈরির অর্থ লোপাটের সাথে জড়িত। বাহ্- বিড়াল চৌকিদারের ভুমিকায় পাউবি! আমাদের হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তর তাহলে কি করছে? পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কি করছে? কৃষি মন্ত্রণালয় কি করে? হাওরাঞ্চলের জনপ্রতিনিধিরাই বা করেনটা কি খুব জানতে ইচ্ছা করে।

অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনার হাওরের কৃষকের স্বপ্ন, সাধ, বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন সব শেষ হয়ে যায় অকাল বন্যায়। কিন্তু বাঁধ দেওয়ার অনিয়ম-দুর্নীতি আর অন্যায়ের কোনো সুরাহা হয়না। লাখ টাকা ঋণের ঘানি জমিতে ঢালেন যে কৃষক সেই কৃষকের জমির কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায় সময়মত বাঁধ নির্মাণ না করার কারণে। হাওরে কখন পানি আসে বা আসতে পারে তা কমবেশি সবারই জানা থাকার কথা। মধ্য চৈত্র্য থেকে বৈশাখের শুরুতে অকাল বন্যার ঘটনা ঘটে। ডিসেম্বরে হাওর শুকিয়ে গেলে তখন থেকে যদি বাঁধগুলোর নির্মাণ কাজ শুরু করা হয় তাহলে এই সমস্যা হওয়ার কথা না। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে বাঁধের কারণে প্রতিবছর হাওরের ফসলহানির ঝুঁকি থাকে সে বাঁধগুলো কেন স্থায়ীভাবে নির্মাণ করার চিন্তা করা হচ্ছেনা!

যে কৃষক শরীরের রক্ত পানি করা পরিশ্রমে প্রায় তিন লাখ টন ধান উৎপাদন করে দেশের খাদ্যের মজুদ বাড়ায়। সেই হাওরের কৃষক অকাল বন্যায় ফসলহানির কারণে সারাবছর কেন চাল কিনে খাবেন! তাদের মাথায় যে লাখ টাকা ঋণের বোঝা থাকে তার দায় কে নিবে? প্রায়শই শুনতে পাওয়া যায়- সাংবাদিক সম্মেলন, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করে কৃষকরা অভিযোগ করেন শত কোটি টাকা হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধে সরকার বরাদ্দ দিলেও যথা সময়ে কাজ শুরু হয়না। বাঁধের বরাদ্দ পাউবো ও সংশ্লিষ্টরা মিলে লোপাট করে নেন।

হাওর উন্নয়নে ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো- চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পগুলোই চলছে সবচেয়ে ধীরগতিতে। হাওর এলাকার উন্নয়নে ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি দেড় শতাধিক প্রকল্প সংবলিত ‘হাওর মহাপরিকল্পনা’ গ্রহণ করা হয়েছে। এর প্রতিফলন আমরা কি এই দেখছি ! বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে- প্রকল্প মেয়াদ শেষ হওয়া, কাছাকাছি বা মাত্র বছর দুই সময় বাকী থাকা হাওর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর অধিকাংশের কাজ সমাপনের হার ৫০ ভাগেরও কম! সবমিলিয়ে বলা যায় এযেন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে মহাধীরগতি!

যে হাওরবাসী দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে ভুমিকা রাখেন, মাছ দিয়ে দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটায়- তাদের প্রতি এই অবহেলা অবিচারের সামিল!!' বছরে প্রায় তিন লাখ টন ধান উৎপাদন করে দেশের খাদ্য চাহিদা মেটানো হাওরবাসীর এই দুর্ভোগ নিয়ে তেমন গরজ দেখিনা। শুধু ধান নয়- হাওরাঞ্চলে রয়েছে প্রাকৃতিক মৎস্য ভান্ডার। দেশের আহরিত মাছের শতকরা ২৫ থেকে ৩৫ ভাগ যা বছরে শত কোটি টাকার মাছ পাওয়া যায় হাওরে। জাতীয় অর্থনীতিতে এত অবদান থাকার পরও হাওরবাসীর ফসল রক্ষা বাঁধ প্রায় প্রতি বছর ভেঙে যায় কেন? এ প্রশ্ন আর কত শুনতে হবে? এ বিষয়ে আর কত বলতে হবে? আর কত লিখতে হবে?

কেবল অবহেলঅ আর খামখেয়ালির কারণে হাওরের কাচা-পাকা ধানের শিষগুলো কৃষকের সুখে থাকার আশা যখন অসময়ে পাহাড়ি ঢলে পানির নিচে তলিয়ে যায়- তখন কেমন লাগে ভাবতে পারেন। একটিমাত্র ফসল বোরো হাওরবাসীর জিয়নকাঠি। চোখের সামনে বাঁধ ভেঙে কাঁচা-পাকা ধান যখন পানির নীচে তলিয়ে যায়- হাওরের বাতাসে তখন ফসলহারা মানুষের করুণ আর্তনাদ ছাড়া আর কিচ্ছু থাকেনা। হাওরের কৃষকের জন্মই যেন আজন্ম পাপ। শুধুই নিয়তির উপর ভরসা করা অথবা নিয়তির নিষ্ঠুরতা মেনে বুকে পাথর চেপে ধৈর্য্য ধরে জীবনসংগ্রাম করাই যেন নিয়তি। কখনো ফসলের জন্যে পানি অথবা বৃষ্টির জন্য হাহাকার কখনোবা অকাল বন্যায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসলের জন্য করুন আর্তনাদ। কিন্তু কে শুনবে হাওরবাসীর একমাত্র সোনার ফসলটি পানিতে ডুবে যাওয়া কষ্টের আর্তনাদ-সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নাকি ভাগ্যবিধাতা?

হাওর এলাকার প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকগণ কি করছেন। বলিষ্ঠ কোনো রিপোর্ট চোখে পড়ছে না! টিভি সাংবাদিকরা কোথায়? সেরকম কোনো সংবাদ দেখিনা? ঢাকায় একটা বস্তিতে আগুণ লাগলে টিভিতে লাইভ দেখায়- হাজার হাজার কোটি টাকার ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে- কেন লাইভ নাই? টকশোতে আয়োজন নেই কেন?? হাওরের কৃষকের সর্বনাশ হলে কারো যেন কিছু যায় আসেনা! বছরের একমাত্র ফসল বোরো কাঁচা অবস্থায় অকাল বন্যায় পানির নিচে তলিয়ে যায়। নির্বাক হয়ে দেখা ছাড়া কারো কিছু করার থাকেনা! তখন হাওরাবাসীর কান্নার বিলাপে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠে। হাওর এলাকার জননন্দিত জনপ্রতিনিধিরা, মাননীয় মন্ত্রী পরিষদ, আমাদের কৃষি ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, শহরে নিবাসী হাওরের সন্তানেরা প্রিয় দেশবাসী, বাংলাদেশের বিবেকবান মিডিয়ার পরিচালক ও সাংবাদিক ভাই-বোনেরা - আপনারা কি শুনতে পাচ্ছেন হাওরবাসীর কান্না!

হাওর ভাটি বাংলা হচ্ছে এমনই সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। কৃষিবিদদের মতে, দেশে আবাদযোগ্য পতিত জমিসহ উপকূল ও হাওর অঞ্চলের জলাবদ্ধ এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত করতে পারলে বছরে ৫০ লাখ টন বাড়তি খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব। মতানুযায়ী, দেশের বিস্তীর্ণ জলাবদ্ধ এলাকা চাষের আওতায় আনার পাশাপাশি জলাবদ্ধ সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করা গেলে বছরে আরো ৫ লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। আমার বিশ্বাস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় হাওরবাসীর অকালবন্যায় ফসলহানির অনিশ্চয়তাও ঘোঁচানো সম্ভব হবে।

অকাল বন্যায় হাওরের কৃষকের স্বপ্ন, সাধ, বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। লাখ টাকা ঋণের ঘানি জমিতে ঢেলেছেন যে কৃষক আজ সেই কৃষকের জমির কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে । হাওরের এই দুর্যোগ মোকাবিলায় এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহসীকতা ও ভালবাসার নিদর্শন দেখতে চায় হাওরের জনগণ। আমরা জেনেছি, বিনা-১১, ১২ হচ্ছে জলমগ্ন সহিষ্ণু ধানের জাতটি ২৫ দিন পর্যন্ত পানির নিচে ডুবে থাকলেও টিকতে পারে। প্রতি হেক্টরে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ টন উৎপাদন হবে। অনুরূপ বিনা-১৩ সুগন্ধি জাতের আমন ধান ১৩৮ থেকে ১৪২ দিনে ঘরে তোলা সম্ভব। ফলন হবে হেক্টর প্রতি চার থেকে সোয়া চার টন। আমার বিশ্বাস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার সদিচ্ছায় হাওরবাসীর অকালবন্যায় ফসলহানির অনিশ্চয়তাও ঘোঁচানো সম্ভব হবে। কম সময়ে উচ্চ ফলনশীর ধানও উৎপাদন হবে বাংলার হাওরে।

আমরা জানতে পেরেছি- হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যার কারণে ফসলহানির ঝুঁকি মোকাবিলায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসেড হবিগঞ্জ (ASED HABIGONJ) এর উদ্যোগে জাপানের শেয়ার দ্যা প্ল্যানেট এসোসিয়েশন এবং জাপান ফান্ড ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট (জেএফজিই) এর অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এনরিচ (ENRICH) প্রকল্প-এর আওতায় সুনামগঞ্জ জেলাধীন শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলে উন্নত ধান জাতের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এপ্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসেড হবিগঞ্জ-এর প্রধান নির্বাহী জাফর ইকবাল চৌধুরি জানান- এই প্রকল্পের আওতায় পূর্ব পাগলা ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে মোট ৮ জন কৃষকের ৮টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এসব জমিতে উন্নত মানের বন্যাসহনশীল ও স্বল্প জীবনকালীন ধান জাত যেমন ব্রি ধান-৬৭, ব্রি ধান-৯২ এবং ব্রি ধান-১০৮ চাষ করা হয়েছে। স্বপ্লকালিন

নতুন জাতের ধান চাষের সম্ভাবনা বিষয়ে জানতে চাইলে জাফর ইকবাল চৌধুরি বলেন, ব্রি ধান-৬৭ একটি স্বল্প জীবনকালীন ধান জাত, যা সাধারণত প্রাায় ১৪৫ থেকে ১৫০ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। এই জাতের ধান দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং আগাম বন্যার ঝুঁকি থেকে কৃষকদের অনেকটা নিরাপত্তা দেয়। ফলে কৃষকেরা বন্যা আসার আগেই ধান কাটতে সক্ষম হন।

এখন দরকার এই দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ করা। হাওরের উপযোগি কম সময়ে ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে কৃষিবিজ্ঞানীদের দিকনির্দেনা দেয়া, হাওরের নদী ও খালগুলো খনন করা, দ্রæততার সাথে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তত্বাবধানে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ করা, অগ্রহায়ন-পৌষ মাসে হাওরে বীজ বোনার জন্য বীজ সহায়তা ও কৃষির খরচ মেটাতে ব্যাংকঋণ সহায়তা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, শুকনো মৌসুমে হাওরের পতিত জমিতে হাওরের মাটিতে ফলন উপযোগি সরিষা, মাসকলাই, মশুরকলাই, ভুট্টা, গম, শীতকালীন সবজি উৎপাদনে উৎসাহিত করা, বর্ষায় আখ চাষ-ভাসমান সবজি চাষ, কুটির শিল্প, গরু-ছাগল (বø্যাকবেঙ্গল)-মহিষ পালন, হাস ও মুরগির খামার প্রভৃতি প্রকল্প বাস্তবায়ন উদ্যোগ নিলে হাওরের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব ও টেকসই হবে।

-লেখক: সমাজ-অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক