ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বিভ্রান্তি কৃত্রিম

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

সমীরণ বিশ্বাস:ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বিভ্রান্তি: সংকীর্ণতার রাজনীতি, না জ্ঞানের ঘাটতি ? বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ঘিরে যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে, তা কোনো বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; এটি একটি কৃত্রিম নির্মাণ। বাংলা ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম, এই সরল সংজ্ঞা দিয়ে এর গভীরতা ও তাৎপর্যকে ব্যাখ্যা করা যায় না। একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস, চিন্তা-চেতনা ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী ধারক হলো তার ভাষা। সেই অর্থে বাংলা ভাষা বাঙালি জাতিসত্তার মেরুদণ্ড। হাজার বছরের ইতিহাস, বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং নানা ধর্মীয়-সামাজিক প্রভাবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই ভাষা আজও বহন করছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনবোধ, আবেগ ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।

তবুও দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ঘিরে এখনও সমাজের একটি অংশে অস্বস্তি, বিরূপতা এবং বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা বিদ্যমান। “মঙ্গল”, “বৈশাখ”, “বাংলা”, “একুশে”, “জয়” এ ধরনের শব্দগুলো উচ্চারিত হলেই কিছু মানুষের মধ্যে একধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এই প্রতিক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্ত নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা, অপর্যাপ্ত জ্ঞান এবং অনেক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মতাদর্শিক প্রভাবের ফল।

এই প্রবণতার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জোরপূর্বক সংযুক্ত করার চেষ্টা। বাংলা ভাষাকে কখনও “বিদেশি”, কখনও “নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর সংস্কৃতি” হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা শুধু অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি ইতিহাসের সুস্পষ্ট বিকৃতি। বাস্তবতা হলো, বাংলা ভাষার বিকাশ কোনো একক ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র অবদান নয়। এটি গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সময়ের আর্য, দ্রাবিড়, আরব, পারস্য এবং ইউরোপীয় প্রভাবের সম্মিলনে। ফলে এই ভাষাকে সংকীর্ণ কোনো পরিচয়ে আবদ্ধ করার চেষ্টা একেবারেই অবৈজ্ঞানিক।

ইতিহাসের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ভাষা আন্দোলন এই ভূখণ্ডের মানুষের আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বিসর্জনের এমন নজির বিশ্বে বিরল। এই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক, এটি কোনো বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং ঐক্যের প্রতীক। ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করেছে, বাংলা ভাষা কেবল একটি ভাষা নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন।

অন্যদিকে পহেলা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই দিনটি ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকল মানুষের অংশগ্রহণে এক অনন্য সামাজিক বন্ধনের সৃষ্টি করে। অথচ এই উৎসবকেও অনেক সময় “অন্য সংস্কৃতির” বা “নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর” বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা দেখা যায়। এই প্রবণতা মূলত সাংস্কৃতিক অজ্ঞতা এবং ভয়ভিত্তিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। সংস্কৃতি কখনো স্থির নয়; এটি পরিবর্তনশীল এবং বহুমাত্রিক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি নতুন উপাদান গ্রহণ করে, পুরোনোকে পুনর্নির্মাণ করে এবং সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়।

প্রশ্ন হলো, এই বিভ্রান্তির উৎস কোথায় ? এর একটি বড় কারণ হলো ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের অভাব। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই ভাষা ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ অনুপস্থিত। ফলে তরুণ প্রজন্ম সহজেই বিভ্রান্তিকর তথ্যের শিকার হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, যেখানে যাচাই-বাছাই ছাড়া নানা ধরনের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের চিন্তায় প্রভাব ফেলে।

 

এখানে আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ, সংকীর্ণ রাজনৈতিক বা আদর্শিক স্বার্থ। কিছু গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তারা মানুষের আবেগকে উস্কে দিয়ে একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব তৈরি করতে চায়, যেখানে “আমরা” এবং “ওরা”র বিভাজন স্পষ্ট হয়। এই প্রবণতা শুধু সামাজিক সম্প্রীতিই নষ্ট করে না, বরং একটি জাতির সামগ্রিক অগ্রগতির পথকেও বাধাগ্রস্ত করে।

ভাষা ও সংস্কৃতিকে ঘিরে এই ধরনের সংকীর্ণতা একটি বৃহত্তর সংকটের ইঙ্গিত দেয়, সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব। যখন মানুষ তথ্যকে যাচাই না করে গ্রহণ করে, তখন বিভ্রান্তি সহজেই জায়গা করে নেয়। ফলে প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে যুক্তি, তথ্য এবং গবেষণাভিত্তিক আলোচনা গুরুত্ব পাবে। ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং আলোচনার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

সমাধানের পথও তাই একমাত্রিক নয়। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণাভিত্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক চর্চার প্রসার ঘটাতে হবে। সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও লোকজ ঐতিহ্যের মাধ্যমে মানুষকে তার শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভুল তথ্যের বিস্তার কমানো যায়।

তরুণ প্রজন্ম এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা যদি তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হয়, তাহলে বিভ্রান্তির জায়গা অনেকটাই কমে যাবে। একইসঙ্গে, তাদের মধ্যে সহনশীলতা, বহুত্ববাদ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা জরুরি। কারণ একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি হলো ভিন্নতার প্রতি সম্মান।

সবশেষে বলা যায়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ঘিরে যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে, তা কোনো বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; এটি একটি কৃত্রিম নির্মাণ। এই নির্মাণ ভাঙতে হলে প্রয়োজন জ্ঞান, সচেতনতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। ভাষা আমাদের বিভক্ত করে না; বরং আমাদের একত্রিত করে। তাই ভাষা ও সংস্কৃতিকে সংকীর্ণতার গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাই সময়ের দাবি।

লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।