২০ হাজার কিলোমিটার খাল, ২৫ কোটি গাছ: "এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা"

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

ডক্টর এএইচএম সাদেকঃ খাল থেকে অর্থনীতি শহীদ জিয়াউর রহমানের স্বপ্নে বাংলাদেশের Blue-Green বিপ্লব ও টেকসই উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান-এর “খাল খনন কর্মসূচি” (Canal Excavation Programme) ছিল দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি উন্নয়নের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লবের উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। তারই উত্তরেধিকারী প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় শহীদ জিয়ার সেই অসমাপ্ত খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেন।

দেশে পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ একটি জাতীয় রূপান্তর মূলক কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত। এটি মূলত একটি Blue-Green Infrastructure Program—যা পানি (খাল) ও পরিবেশ (গাছ) একসাথে ব্যবহার করে অর্থনীতি শক্তিশালী করবে।

খাল খনন কর্মসূচি (canal excavation program) শুধু পানি ব্যবস্থাপনা নয়—এটি একটি মাল্টি-ডাইমেনশনাল অর্থনৈতিক বিপ্লব হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে "খাল খনন কর্মসূচি"একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল। এ কর্মসূচির অর্থনৈতিক-পরিবেশগত প্রভাব কী হতে পারে—সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করছি।

খাল কাটা কর্মসূচি দিয়ে অর্থনীতির উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব? :

ক) কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে খাল খননের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থা উন্নত করা। ফলে শুকনো মৌসুমেও পানি পাওয়া যাবে। বছরে ১ ফসলের জায়গায় ২–৩ ফসল উৎপাদন সম্ভব এবং কৃষকের আয় বাড়বে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

খ) কম খরচে পরিবহন ও নৌপথ উন্নয়ন : খাল ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করে সড়কের উপর চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পরিবহন খরচ কমলে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হবে এবং গ্রামীন অর্থনীতি পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপিতে ইতিবাচক সাফল্য বাড়বে।

গ) মৎস্য খাতের উন্নয়ন: একসময় দেশের খাল বিল নদী নালায় মাছের অভয় আশ্রম ছিল, পানির অভাব ও অনুকূল ইকো সিস্টেমের অভাবে খাল বিল নদী নালা গ্রাম বাংলায় মাছ প্রাপ্তির যে সংস্কৃতি ছিল আজ কেবল ইতিহাস। জেনেটিক্যাল মডিফাইড অর্গানিজম (জিএমও) দেশীয় জাতগুলোকে বিলুপ্তের পথে নিয়ে যাচ্ছে। খাল খননের মাধ্যমে দেশীয় মাছের সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা যাবে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী ও মজবুত হবে।

ঘ) কর্মসংস্থান সৃষ্টি:খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় মানুষদের সম্পৃক্ত করে গ্রামীণ বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং পানি নির্ভর শিল্প যেমন খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, মাছ, কৃষির উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে স্থানীয় অর্থনীতি চাকায় গতিশীল হবে।

কিভাবে খাল কাটা কর্মসূচি করা যেতে পারে ?

ক) সঠিক পরিকল্পনা (Master Plan) :

প্রথমত দেশব্যাপী খালগুলোর বাস্তব ও সঠিক মানচিত্র তৈরি করতে হবে। কোথায় খাল পুনঃখনন, কোথায় নতুন খাল দরকার তা নির্ধারণে GIS ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি নির্ভুল ও আধুনিক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা।দেশের সব খাল ডিজিটাল ম্যাপিং (GIS) মাধ্যমে “Dead Canal” ও “Active Canal” তালিকা তৈরি করা। এক্ষেত্রে পানি প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, নদীর সংযোগ বিশ্লেষণ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) করা। এসব বিষয়ে গবেষণা ও ডেটা বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা স্থির করা। জরুরি খালগুলো আগে পুনঃখনন করে পরে নতুন খাল নির্মাণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নদী-খাল নেটওয়ার্ক সংযোগ তৈরি করা। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা।

খ) “কমিউনিটি বেইজড ম্যানেজমেন্ট” চালু করা।  এক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করা। মজার বিষয় হল, এখন বাংলাদেশ জনসংখ্যার বোনাসকাল বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট সময়কাল পার করছে তাই দেশের কর্মক্ষম তরুণদের সক্রিয়ভাবে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। তরুনদের সম্পৃক্ত করলে দেশ গঠনে জাতির মধ্যে দেশপ্রেমের অনুভূতি তীব্রভাবে জেগে উঠবে। কারণ যেই কাজে অর্থ, শ্রম ও সময় ইনভেস্ট করা হয়, সেই কাজে ভালোবাসা জন্ম হয়। দেশের তরুণরা জনসংখ্যার বোনাসকাল বা ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট প্রধান নিয়ামক বা উপকরণ।

ছাত্র সমাজকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ :

দেশের ছাত্র সমাজ বিশেষ করে এইচএসসি থেকে অনার্স মাস্টার্স প্রোগ্রাম পর্যন্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের এই খাল খনন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা। বর্তমানে বাংলাদেশে এইচএসসি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় (অনার্স- মাস্টার্স) পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী প্রায় ৫০ লাখ (±৫–১০ লাখ)। এই শিক্ষার্থীদের জন্য ২০–৩০ নম্বরের একটি বাধ্যতামূলক ব্যবহারিক অংশ চালু করা যেতে পারে, যা সরাসরি “খাল কাটা কর্মসূচি”-র সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করার বাস্তব সুযোগ পাবে—যেখানে শিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি হবে।

একই সঙ্গে দেশের বিপুল তরুণশক্তি গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্ত হয়ে দেশ ও জাতি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অংশগ্রহণ তরুণদের মাঝে একধরনের গর্ববোধ সৃষ্টি করবে—নিজ হাতে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার গর্ব। ফলে তাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা, কর্মস্পৃহা ও ইতিবাচক মানসিকতার বিকাশ ঘটবে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী, সচেতন, কর্মক্ষম ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

খাল খনন কর্মসূচির অর্থায়ন ব্যবস্থা:

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সরকারি বাজেটের পাশাপাশি বহুমুখী অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এডিবি (Asian Development Bank)-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিশ্চিত করে একটি টেকসই ও কার্যকর অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এভাবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

খাল কাটা কর্মসূচির মনিটরিং, মূল্যায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা:

খাল কাটা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে একটি সুসংগঠিত মনিটরিং, মূল্যায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, যাতে কাজের অগ্রগতি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়।

প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে খাল পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং খাল দখল ও দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি জোরদার করতে হবে। এছাড়া, প্রকল্পের অগ্রগতি ধারাবাহিকভাবে মূল্যায়ন করা এবং এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। এর মাধ্যমে কর্মসূচির কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। “এক উপজেলা – এক খাল পুনরুদ্ধার” উদ্যোগ নেওয়া। সর্বাগ্রে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলাভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ খাল চিহ্নিত করা।

"খালভিত্তিক অর্থনীতির" রূপরেখা প্রণয়ন ও নীতি ঘোষণা:

“খালভিত্তিক অর্থনীতি” (Canal-based Economy) একটি সমন্বিত জল-অর্থনৈতিক মডেল হতে পারে যা কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, পরিবহন ও গ্রামীণ শিল্পকে একসাথে যুক্ত করবে। আধুনিক বিশ্ব বাস্তবতা দেখায় যায়—খাল শুধু পানি সরবরাহ করে না, এটি খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান  ও বাজার ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।

ক) খালভিত্তিক কৃষি নীতি :

“Surface Water First Policy”  আগে খালের পানি ব্যবহার, পরে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নীতি গ্রহন করতে হবে। বিশেষ করে খালভিত্তিক ফসল জোনিং ধান, সবজি, ফসল আলাদা অঞ্চল করা।
খালের পাশে “High-value crop belt” যেমন সবজি, ফুল, ফল জোন করা। বাস্তবতায় বাংলাদেশে "কৃষি" এখনো অর্থনীতির বড় অংশ এবং সেচের উপর নির্ভরশীল। খালের মাধ্যমে সেচ দিলে ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমবে। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে ফসল উৎপাদন ও আয় বাড়বে।
চ্যালেঞ্জ হলো খাল বেদখল কঠোরভাবে প্রতিহত করা। আর পানি বণ্টনে বৈষম্য (elite capture) দূর করতে হবে, প্রয়োজনে কৃষকদের সেচযন্ত্র প্রাপ্তিতে সরকারিভাবে সহায়তা প্রদান করা।

খ) খালভিত্তিক মৎস্য নীতি:

টেকসই জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার নতুন সম্ভাবনা
খালভিত্তিক মৎস্য নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে “Open Water Fisheries Management” পদ্ধতি গ্রহণ করা। খালভিত্তিক কমিউনিটি মাছ চাষে স্থানীয় জনগণকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এর ফলে খাল ও জলাশয়গুলোকে পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
একইসাথে খাল-নদীর সংযোগ পুনরুদ্ধার করা হলে মাছের স্বাভাবিক চলাচল (fish migration) নিশ্চিত হবে, যা প্রাকৃতিক প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ি, কাঁকড়া এবং দেশি মাছের উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এভাবে খাল ও অন্যান্য জলাশয়কে মাছ উৎপাদনের প্রধান উৎসে রূপান্তর করা সম্ভব হবে, যার ফলে প্রাকৃতিকভাবেই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আয় বৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে এবং সামগ্রিকভাবে একটি টেকসই মৎস্য অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলবে।

গ) খালভিত্তিক পর্যটন নীতি:

খালভিত্তিক পর্যটন নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলভিত্তিক পর্যটন (eco-tourism) জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। নদী ও খালকেন্দ্রিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নৌকা, গ্রামীণ জীবনধারা ও স্থানীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে একটি অনন্য পর্যটন অভিজ্ঞতা গড়ে উঠবে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে।

খাল, নদী, নৌকা ও গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিভিন্ন উৎসব ও সামাজিক কার্যক্রমকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে, যা আমাদের জাতীয় জীবনের একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া খালপথে নৌভ্রমণ (Canal Tourism Corridor) চালু করা গেলে পর্যটনের নতুন পথ উন্মোচিত হবে। খালের পাশে গ্রামীণ হোমস্টে, স্থানীয় খাবারের ব্যবস্থা, হস্তশিল্প বিক্রয় কেন্দ্র এবং পরিবহন সেবা গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে পর্যটন খাত বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

ঘ) খালভিত্তিক সবুজ বনায়ন নীতি:

খালভিত্তিক সবুজ বনায়ন নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে খালের দুই পাশে পরিকল্পিতভাবে ফলজ, বনজ ও সামাজিক বনায়ন (community forestry) গড়ে তোলা যেতে পারে। এর ফলে একটি সমন্বিত “Green Canal Belt” সৃষ্টি হবে, যা পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই বনায়ন কার্যক্রম কার্বন শোষণ বৃদ্ধি করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাসে সহায়ক হবে। পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য (biodiversity) সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি হবে। ফলজ ও বনজ গাছপালার সমন্বিত চাষাবাদ কৃষি ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে এবং স্থানীয় জনগণের জন্য অতিরিক্ত আয় ও সম্পদের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

ঙ) খালভিত্তিক পরিবেশ নীতি:

বর্তমান সময়ে একদিকে যেমন খাল দখল ও খাল ভরাট ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ, জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকিও উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি সুসংগঠিত ও কঠোর “Zero Encroachment Policy” গ্রহণ করা অপরিহার্য। এর মাধ্যমে খাল দখল ও অবৈধ ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। একইসাথে খালের পরিবেশগত প্রবাহ (environmental flow) বজায় রাখতে হবে, যাতে জলজ বাস্তুতন্ত্র স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে পারে।

এছাড়া খালে বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে খালকে পুনরায় একটি জীবন্ত, পরিষ্কার ও কার্যকর জলসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।খালভিত্তিক পরিবেশ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে।

চ) খালভিত্তিক জলপথ ও বাজার নীতিমালা:

খালপথকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক “Canal Logistics Network” গড়ে তোলার মাধ্যমে কৃষিপণ্য পরিবহনকে সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর করা যেতে পারে। নৌপথ সড়কপথের তুলনায় অধিক সস্তা ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

খালভিত্তিক হাট-বাজার বা floating market প্রতিষ্ঠা করা গেলে পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে, কৃষকের ন্যায্য লাভ নিশ্চিত হবে এবং গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থা আরও সংগঠিত ও গতিশীল হবে।

এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো অপরিহার্য, যেখানে পানি, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কমিউনিটি অংশগ্রহণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, GIS mapping এবং real-time water monitoring ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। এছাড়া খাল দখল ও দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, জিরো টলারেন্স নীতি এবং কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি টেকসই ও শৃঙ্খলাবদ্ধ খালভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

বর্তমান বাস্তবতায় ভূগর্ভস্থ পানির সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা ও খরার প্রেক্ষাপটে খালভিত্তিক অর্থনীতি কেবল একটি বিকল্প (alternative option) নয়, বরং একটি অপরিহার্য জাতীয় কৌশলের অংশ। সঠিকভাবে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ “খালভিত্তিক অর্থনীতি”-র একটি বিশ্ব মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

পরিশেষে, এই প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিতে খালভিত্তিক মডেল একটি “Blue-Green Economy Framework” হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে পানি হবে উৎপাদনের ভিত্তি, খাল হবে অবকাঠামো এবং গ্রাম হবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মূল ইউনিট। তখনই দেশের প্রতিটি গ্রাম হবে একেকটি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ইউনিট তথা দেশের লাইফলাইন।