
রোটারিয়ান ড মো হেমায়েতুল ইসলাম আরিফ:যখন রাজশাহীর প্রত্যান্ত গ্রামের একজন কৃষক সকালবেলা তার গরু দুধ দোহন করে, আর জাপান বা আমেরিকার একটি আধুনিক মাংস প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্টের একজন কর্মী মাংসের মান পরীক্ষা করেন তখন এই দুই দৃশ্যকে সংযুক্ত করছে একটি সুতো, যার নাম ‘প্রাণীচিকিৎসক’ (ভেটেরিনারিয়ান)।
ওয়ার্ল্ড ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন (WVA) ২০২৬ সালের বিশ্ব পশুচিকিৎসা দিবসের (২৫ এপ্রিল) থিম ঘোষণা করেছে: "প্রাণীচিকিৎসক: খাদ্য ও স্বাস্থ্যের রক্ষক" (Veterinarians: Guardians of Food and Health) । এই প্রতিপাদ্য শুধু একটি ক্যাচফ্রেজ নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার একটি বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা। এটি "খামার থেকে প্লেট পর্যন্ত" পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রাণীচিকিৎসকদের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে তৈরি—খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও প্রাণীস্বাস্থ্য রক্ষায় তারা প্রধান যোদ্ধা।
১৭০ মিলিয়ন মানুষের বাংলাদেশের জন্য, যেটি একটি উন্নত দেশে পরিণত হতে চায়, এই প্রতিপাদ্যটি একান্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে চাই। কিন্তু একটি অসুস্থ জাতি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে স্মার্ট দেশ নির্মাণ সম্ভব নয়। সুস্থ ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত হয় নিরাপদ খাদ্য থেকে—সেটি কৃষিজাত হোক বা প্রাণিজাত। এই উপলব্ধি থেকেই আমাদের নির্মাণ করতে হবে ‘নতুন বাংলাদেশ’।
নীরব প্রহরী: কেন "খামার থেকে প্লেট" এত জরুরি
অধিকাংশ মানুষ প্রাণীচিকিৎসকদের শুধু "পশুদের ডাক্তার" মনে করেন। বাস্তবে তারা সাধারণ মানুষের থালায় রাখা খাবারের রক্ষক। ‘ওয়ান হেলথ’ বা একীভূত স্বাস্থ্য ধারণা বলে—মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য পরস্পরের সাথে জড়িত। ইতিহাস বলছে, উদীয়মান সংক্রামক রোগগুলোর ৬০ শতাংশই জনন রোগ (জুনোটিক), অর্থাৎ এগুলো প্রাণী থেকে মানুষে আসে (যেমন করোনা বা নিপাহ)। বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের কথা মনে আছে? খেজুর রসের মাধ্যমে যেটি ছড়িয়েছিল।
প্রাণীচিকিৎসকরাই এই বিপদের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তারা নিশ্চিত করেন যে আমরা যে দুধ, মাংস বা ডিম খাই, সেটি যেন অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু বা ক্ষতিকর জীবাণু (যেমন সালমোনেলা) মুক্ত হয়। এই তদারকি না থাকলে, ‘খামার থেকে প্লেট’ যাত্রাপথটি রোগের মহাসড়কে পরিণত হয়।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের চারটি স্তম্ভ
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টির গুরুত্ব বোঝাতে গেলে আমাদের এই থিমের চারটি মূল দিক বিশ্লেষণ করতে হবে:
১. খাদ্য নিরাপত্তা ও সুরক্ষা (টেকসই প্রাণিসম্পদ): বাংলাদেশ ধান ও মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও পুষ্টির নিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাণীচিকিৎসকরা পশুর পালের স্বাস্থ্য ভালো রাখেন, গরুতে ম্যাসটাইটিস (ওলান মাথা) রোগ প্রতিরোধ করেন এবং মুরগির মৃত্যুহার কমিয়ে আনেন। একটি সুস্থ গরু বেশি দুধ দেয়; একটি সুস্থ খামার নিরাপদ মাংস সরবরাহ করে।
২. জনস্বাস্থ্য (জুনোটিক রোগ ও এএমআর): অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা হলো ‘নীরব মহামারি’। বাংলাদেশে মুরগি ও মাছে অবৈধ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার একটি জাতীয় সংকট। কৃষক যখন মুরগিকে দ্রুত মোটাতাজা করতে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ান, তখন মানুষ সেই মাংস খেয়ে শরীরে ‘সুপারবাগ’ তৈরি করে, যাকে পরে কোনো ওষুধ মারে না। প্রাণীচিকিৎসকরাই ‘বিবেচনাপ্রসূত ব্যবহার’ নীতি প্রচার করে এএমআর-এর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরক্ষা তৈরি করেন।
৩. একীভূত স্বাস্থ্য পদ্ধতি (ওয়ান হেলথ): সুন্দরবন হলো মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাতের কেন্দ্র। বাঘ, হরিণ আর গৃহপালিত পশু এক সীমানায় বসবাস করে। এখানে প্রাণীচিকিৎসকরা বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করেন, কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেন এবং ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করেন। বাংলাদেশে ওয়ান হেলথ কোনো তত্ত্ব নয়, এটি বাঁচার কৌশল।
৪. অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা: বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত প্রাণিসম্পদনির্ভর। একবার খুরার রোগ (FMD) মহামারি আকার ধারণ করলে কৃষকের সব সঞ্চয় মুহূর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে। প্রাণীচিকিৎসকরা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচ্ছল রাখেন এবং নারী উদ্যোক্তাদের (যারা ছোট মুরগির খামার করেন) ক্ষমতায়ন করেন।
বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ: আইন ও বিনিয়োগের ঘাটতি
যদিও বিশ্ব থিমটি উচ্চাভিলাষী, বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট কিছু বাধা রয়েছে। আমাদের প্রাণিসম্পদ খাত ব্যাপকভাবে অনিয়ন্ত্রিত। অধিকাংশ কসাইখানায় কোনো স্বাস্থ্যবিধি নেই। ‘মেমোরি অফ ইউ’ অতীতের জুনোটিক রোগের স্মৃতি মুছে যাওয়ার কারণে আমরা উদাসীন হয়ে যাই।
আইনগত ফাঁক: বাংলাদেশে এখনো একটি আধুনিক প্রাণীস্বাস্থ্য আইন (Animal Health Act) নেই। ১৯২০ সালের ‘প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা আইন’ (Cruelty to Animals Act) যুগপূরণের অযোগ্য। আমাদের এমন আইন দরকার যা প্রতিটি কসাইখানায় প্রাণিচিকিৎসকের পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করবে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ভেটেরিনারি ওষুধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং রোগ আউটব্রেক মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল গঠন করবে।
বিনিয়োগের ঘাটতি: আমরা প্রায়ই মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে বিনিয়োগ করি, কিন্তু প্রাণীর উৎসে রোগ প্রতিরোধে ল্যাব ও প্রাণীচিকিৎসকে বিনিয়োগ করতে চাই না। জনস্বাস্থ্যে বিনিয়োগকৃত প্রতি টাকার বিপরীতে প্রতিদান দশগুণ।
নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ: ত্রি-শক্তি কৌশল
"প্রাণীচিকিৎসক: খাদ্য ও স্বাস্থ্যের রক্ষক" এই প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে বাংলাদেশকে তিনটি ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করতে হবে: সরকার, বেসরকারি ও সামাজিক।
ক. সরকারি উদ্যোগ (নীতি ও পরিকাঠামো)
- পাস করুন ‘বাংলাদেশ প্রাণীস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০২৬’:এই আইনে সব শহর ও গ্রামের কসাইখানায় জীবিত ও মৃত পশু পরীক্ষা (ante-mortem and post-mortem) বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- প্রতিটি উপজেলায় ‘ওয়ান হেলথ ইউনিট’ স্থাপন:প্রাণী ও মানব হাসপাতালকে সংযুক্ত করে তথ্য ভাগাভাগি করতে হবে (যেমন নিপাহ বা অ্যানথ্রাক্স সতর্কতা)।
- ভালো প্রাণি চর্চা (Good Animal Practice) -এ ভর্তুকি:যেসব খামার প্রাণীচিকিৎসকের পরামর্শে বায়োসিকিউরিটি ও অ্যান্টিবায়োটিক উইথড্রো পিরিয়ড মেনে চলে, তাদের কর ছাড় দিতে হবে।
খ. বেসরকারি ও এনজিও উদ্যোগ
- প্যারা-ভেটদের প্রশিক্ষণ:বিআরএসি ও ফ্রেন্ডশিপের মতো এনজিওগুলোর বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাদের কমিউনিটি লাইভস্টক ওয়ার্কারদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা প্রাণীর জ্বর-সর্দি চিনে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারে।
- প্রাইভেট ল্যাব নেটওয়ার্ক:কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে এএমআর টেস্টের ব্যবস্থা করতে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। কৃষক যদি জানেন যে তার দুধে অ্যান্টিবায়োটিক আছে, তিনি তা বিক্রি করবেন না।
- লাইভস্টক ডিজিটাল হেলথ কার্ড:একটি মোবাইল অ্যাপ, যেখানে প্রতিটি গরু বা ছাগলের ডিজিটাল স্বাস্থ্য পাসপোর্ট থাকবে, যা বাজারে ক্রেতা স্ক্যান করে দেখতে পারবেন।
গ. সামাজিক উদ্যোগ (জনসচেতনতা)
- নিরাপদ খাদ্যের সামাজিক আন্দোলন:ভোক্তাদের দাবি বাড়াতে হবে। যদি একজন গৃহিণী ভেটেরিনারি স্ট্যাম্প ছাড়া মাংস কিনতে অস্বীকার করেন, তাহলে বাজার নিজেই বদলে যাবে।
- স্কুলের পাঠ্যক্রমে ‘ওয়ান হেলথ’:মাদ্রাসা ও স্কুলের শিশুদের শেখানো যে পশু ছোঁয়ার পর হাত ধোয়া ও মাংস ভালো করে সেদ্ধ করা জীবন বাঁচায়।
- মিডিয়া ক্যাম্পেইন:"বেশিরভাগ রোগ আসে প্রাণী থেকে কিন্তু প্রাণীচিকিৎসকরা সেই পথ বন্ধ করে দেন।" নাটক ও রেডিওর মাধ্যমে ভেটেরিনারি পেশাকে মর্যাদা দেওয়া।
উপসংহার: অনাক্রম্যতা বিনিয়োগের মাধ্যমেই আসে
একটি সুস্থ শরীর ও শক্ত ইমিউনিটি অর্জিত হয় নিরাপদ খাদ্য থেকে। একটু কল্পনা করুন: একটি বাংলাদেশ যেখানে এক গ্লাস দুধ খেয়ে শিশুর অ্যান্টিবায়োটিক টক্সিসিটি হওয়ার ভয় নেই; যেখানে কৃষকের পশু একটি প্রতিরোধযোগ্য ভাইরাসে মারা যায় না; যেখানে একটি ওয়েট মার্কেটে মহামারির সূচনা হয় না, কারণ সেখানে একজন প্রাণীচিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন। এটি স্বপ্ন নয়। এটি প্রাণিসম্পদ শিল্পে বিনিয়োগ ও পেশাটিকে সম্মান জানানোর ফল। বিশ্ব পশুচিকিৎসা দিবস ২০২৬-এ আমাদের স্বীকার করতেই হবে—চিকিৎসকরা অসুস্থ মানুষকে বাঁচান, কিন্তু প্রাণীচিকিৎসকরা আমাদের প্রথম থেকেই অসুস্থ হওয়া থেকে বাঁচান। তারাই সেই শৃঙ্খলের রক্ষক (Guardians of the Chain)।
আমাদের অঙ্গীকার:
সরকারের প্রতি: প্রাণীস্বাস্থ্য আইন যুগ উপযোগী করে পাস করুন আজই।
কৃষকের প্রতি: ওষুধ বিক্রেতার কথা না বলে প্রাণীচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ভোক্তার প্রতি: নিরাপদ মাংস-দুধ ও ডিমের জন্য একটু বেশি দাম দিন।
প্রাণীচিকিৎসকের প্রতি: আমরা আপনাকে দেখছি। আপনিই নতুন বাংলাদেশের স্থপতি।
আসুন আমরা সবাই মিলে "খামার থেকে প্লেট" পর্যন্ত নিরাপদ, বিজ্ঞানসম্মত ও সংহত একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলি।
লেখকঃউপ-প্রধান ভেটেরিনারিয়ান, ভেটেরিনার এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কো-কোঅর্ডিনেটর, পাবলিক ইমেজ কমিটি, রিপসা, রোটারি ক্লাব অব রাজশাহী সেন্ট্রাল; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ লাইভস্টক সোসাইটি (বিএলএস)