খামার থেকে খাবার টেবিলে নিরাপদ আমিষ উৎপাদন নিশ্চিতে ভেটেরিনারিয়ানরাই মূল চালিকাশক্তি

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

ডা: মোজাম্মেল হক খানঃ বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং প্রাণী স্বাস্থ্য রক্ষায় পশুচিকিৎসা পরিষেবার পদ্ধতিগত ভূমিকা তুলে ধরতে ডব্লিউভিএ কাউন্সিল “পশুচিকিৎসক: খাদ্য ও স্বাস্থ্যের রক্ষক” এই থিমটি নির্বাচন করেছে।
খামার থেকে শুরু করে খাবার টেবিল পর্যন্ত, প্রাণীজ খাদ্য নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং দায়িত্বশীলভাবে উৎপাদিত হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে " ভেটেরিনারিয়ানরা " অগ্রভাগে থাকেন। তাদের কাজ ভোক্তাদের সুরক্ষা দেয়, নিরাপদ ও টেকসই খাদ্য ব্যবস্থাকে সমর্থন করে, জুনোটিক রোগ প্রতিরোধ করে এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে শক্তিশালী করে।

২০২৬ সালের এই থিমটি স্বীকার করে যে, বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থাগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে আন্তঃসংযুক্ত এবং উদীয়মান রোগের হুমকি, জলবায়ু-সম্পর্কিত চাপ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, ভেটেরিনারিয়ানরা কেবল প্রাণী স্বাস্থ্য পেশাদার হিসেবেই কাজ করেন না, বরং স্বাস্থ্য সুরক্ষা, টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা/স্থায়িত্বে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেন। বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস ২০২৬-এর লক্ষ্য হলো টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ভেটেরিনারি পরিষেবা সম্পর্কে জনসচেতনতা এবং নীতিগত স্বীকৃতি বৃদ্ধি করা।

আগামীকাল শনিবার, ২৫শে এপ্রিল ২০২৬ ইং সালে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে "World Veterinary Day -2026" বিশ্ব পশুচিকিৎসা দিবস ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক প্রতিপাদ্য হলো "পশুচিকিৎসক: খাদ্য ও স্বাস্থ্যের রক্ষক"। এই প্রতিপাদ্যটি "খামার থেকে খাবার টেবিল" প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং জুনোটিক রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে ভেটেরিনারিয়ানদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর আলোকপাত করবে।

ভেটেরিনারি ডক্টর'স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ভ্যাব) এর আয়োজনে বিশ্ব পশুচিকিৎসা দিবস ২০২৬ উদযাপন করতে একটি বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সাথে যোগ দিয়েছি। এই বছর, আমরা আমাদের প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে আমাদের পেশা সম্পর্কে একটি গভীর সত্যকে সম্মান জানাচ্ছি: 'পশুচিকিৎসক: খাদ্য ও স্বাস্থ্যের রক্ষক'।"

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তায় কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এই খাতের উন্নয়নে তিনি ভেটেরিনারি পেশা ও শিক্ষার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

স্বনির্ভরতার দর্শন:
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন একটি আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার জন্য কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বিপ্লব অপরিহার্য। তাঁর আমলে প্রাণিসম্পদ খাতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ফলে পশুপাখির রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য দক্ষ ভেটেরিনারিয়ানদের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। ভেটেরিনারি শিক্ষা ও অবকাঠামো: তাঁর শাসনামলে দেশের প্রাণিসম্পদ বিভাগকে ঢেলে সাজানো হয় এবং মাঠপর্যায়ে পশু চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভেটেরিনারি শিক্ষার মান উন্নয়নে তিনি গুরুত্বারোপ করেছিলেন।

কর্মসংস্থান ও পেশাগত মর্যাদা:
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশব্যাপী পশু চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর তিনি নজর দেন। তাঁর "সবুজ বিপ্লব" ও গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল পশু সম্পদের উন্নয়ন, যা পরোক্ষভাবে ভেটেরিনারি পেশার গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সারসংক্ষেপে, জিয়াউর রহমান ভেটেরিনারি পেশাকে নিছক একটি সাধারণ কাজ হিসেবে না দেখে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর গৃহীত খাল খনন কর্মসূচি ও কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমেই মূলত বাংলাদেশে আধুনিক প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থার ভিত্তি।

বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান অপরিসীম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় জিডিপিতে এই খাতের অবদান ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এর অবদান ১৬.৫৪ শতাংশ।

প্রাণিসম্পদের প্রধান অবদানগুলো নিচে তুলে ধরা হলো: পুষ্টি ও আমিষের যোগান: প্রাণিসম্পদ মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১৫৫ লাখ মেট্রিক টন দুধ, ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন মাংস এবং ২৪৪০ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি: দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষভাবে এবং ৫০ শতাংশ পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে পোল্ট্রি শিল্পে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার ৪০ শতাংশই নারী।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন: হিমায়িত মাংস, চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।

কৃষিকাজ ও জ্বালানি: গবাদিপশু জমি চাষ, ভারবহন এবং শস্য মাড়াইয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া পশুর গোবর জৈব সার হিসেবে জমির উর্বরতা বাড়ায় এবং জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

দারিদ্র্য বিমোচন: গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রায় ৮৩.৯ শতাংশ পরিবার গৃহপালিত পশু-পাখি পালনের মাধ্যমে তাদের বাড়তি আয়ের সংস্থান ও স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করছে।

ভেটেরিনারি পেশার মূল ভিত্তি:
"প্রায়শই, জনসাধারণ আমাদের কেবল তাদের প্রিয় পোষা প্রাণীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দেখে। যদিও সেই বন্ধন পবিত্র, বাস্তবতা হলো আমরা তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। খাদ্য উৎপাদনের সম্মুখ সারি থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক গবেষণার গভীরতা পর্যন্ত, পশুচিকিৎসকরা হলেন সমাজের রক্ষাকারী অদৃশ্য ঢাল। আমরা নিশ্চিত করি যে প্রাণীজ খাদ্য নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং সর্বোচ্চ কল্যাণকর মানদণ্ড মেনে উৎপাদিত হয়।"

এক স্বাস্থ্য এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা "জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাণু-প্রতিরোধী প্রতিরোধ এবং উদীয়মান মহামারীর এই যুগে, আমাদের কাজ আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমরা 'এক স্বাস্থ্য' পদ্ধতির প্রথম প্রতিরক্ষা রেখা এই উপলব্ধি যে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং আমাদের সম্মিলিত পরিবেশ অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত। উৎসস্থলে জুনোটিক রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমে, আমরা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করি।" আমরা টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে পশুচিকিৎসা পরিষেবার বৃহত্তর নীতিগত স্বীকৃতির আহ্বান জানাই। অপরিহার্য স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমাদের ভূমিকা যেন আইনে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ ও প্রশিক্ষণ দ্বারা সমর্থিত হয়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবী। "

ভেটেরিনারিয়ানদের নিষ্ঠা, সহানুভূতি, উৎকর্ষতা এবং দক্ষতা এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে । ভেটেরিনারি পেশা শুধু পশু চিকিৎসক নন; ভেটেরিনারিয়ানরা এখন জাতীয় রক্ষক এবং বৈশ্বিক অভিভাবক। আসুন আমরা 'পশুর স্বাস্থ্যকে জাতীয় সম্পদে' রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাই। Happy Wishes to "World Veterinary Day -20#6"