নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া:দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সহায়তা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির কার্যকর ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়া ও বিগ অ্যান্ড চিক (B&C)-এর যৌথ গবেষণাগারে উন্নয়ন করা ফ্লাইহুইল গ্রিন পাওয়ার প্রযুক্তি। ২০১৪ সাল থেকে ধারাবাহিক গবেষণা, প্রকৌশল নকশা উন্নয়ন, যন্ত্রাংশের সমন্বয় ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তিটির কার্যকর প্রোটোটাইপ প্রস্তুত করা হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) আরডিএ ক্যাম্পাসে স্থাপিত পরীক্ষামূলক ফ্লাইহুইল গ্রিন পাওয়ার প্ল্যান্ট পরিদর্শন করেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আরডিএর মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামানিক, উপপরিচালক ও গবেষক দলের সদস্য ড. মনিরুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট গবেষক, প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা।
পরিদর্শনকালে গবেষক দল প্রযুক্তিটির কার্যপদ্ধতি, শক্তি সঞ্চয় ও দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতা এবং কৃষি ও শিল্প খাতে এর সম্ভাব্য প্রয়োগ সম্পর্কে সংসদ সদস্যকে অবহিত করেন। পরীক্ষামূলক প্রদর্শনীতে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় ১০০ কিলোওয়াট বৈদ্যুতিক ড্রাইভিং পাওয়ারের সঙ্গে ফ্লাইহুইলে সঞ্চিত ঘূর্ণনশক্তি কাজে লাগিয়ে প্রায় ৫০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত তাৎক্ষণিক আউটপুট সক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়েছে। এ সময় ওই আউটপুট দিয়ে সাবমার্সিবল পাম্প, ওয়েল্ডিং মেশিন ও বৈদ্যুতিক মোটর চালিয়ে দেখানো হয়।
প্রযুক্তিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লো-স্পিড ১৫০ আরপিএম স্থায়ী চুম্বক জেনারেটর (Permanent Magnet Generator)। মোটর, ভেরিয়েবল ফ্রিকোয়েন্সি ড্রাইভ (VFD), গিয়ারবক্স, ভারী ফ্লাইহুইল, শ্যাফট, বিয়ারিং এবং ১৫০ আরপিএম স্থায়ী চুম্বক জেনারেটরের সমন্বয়ে পুরো ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। গবেষণার কারিগরি নকশায় এক মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্লাইহুইল প্ল্যান্টের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফ্লাইহুইল মূলত একটি যান্ত্রিক শক্তি সঞ্চয় ও দ্রুত পুনঃসরবরাহ প্রযুক্তি। বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে ভারী ফ্লাইহুইল ঘুরিয়ে শক্তি ঘূর্ণনগত শক্তি হিসেবে সঞ্চিত হয়। প্রয়োজনের মুহূর্তে সেই সঞ্চিত শক্তি জেনারেটরের মাধ্যমে পুনরায় বিদ্যুতে রূপান্তর করা যায়। ফলে আকস্মিক উচ্চ লোড, বড় মোটর চালুর সময় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা, ভোল্টেজ ও কম্পাঙ্কের ওঠানামা এবং স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎঘাটতি মোকাবিলায় প্রযুক্তিটি ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকেরা জানান, পরীক্ষায় ১০০ কিলোওয়াট ড্রাইভিং পাওয়ারের সঙ্গে ৫০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত তাৎক্ষণিক আউটপুট দেখানো হলেও এটিকে ১০০ কিলোওয়াট থেকে সরাসরি ৫০০ কিলোওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। অতিরিক্ত তাৎক্ষণিক আউটপুটের একটি অংশ আসে ফ্লাইহুইলে আগে থেকে সঞ্চিত ঘূর্ণনশক্তি থেকে। তাই পূর্ণাঙ্গ পাইলট পর্যায়ে ইনপুট-আউটপুট শক্তি, কর্মদক্ষতা, তাপমাত্রা, কম্পন, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব স্বাধীনভাবে যাচাই করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় এক যুগের গবেষণায় প্রযুক্তিটির মূল নকশা, যন্ত্রাংশের সমন্বয় ও কার্যকর প্রোটোটাইপ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন প্রয়োজন সরকারি পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ পাইলট যাচাই এবং সফলতার ভিত্তিতে দ্রুত প্রতিলিপি বা রিপ্লিকেশন। আরডিএর বিদ্যমান নকশা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এক বা একাধিক পূর্ণাঙ্গ ইউনিট স্থাপন করে পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রযুক্তিটি সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
আরডিএর মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামানিক বলেন, “দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনকে পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ না রেখে বিজ্ঞানসম্মত যাচাইয়ের মাধ্যমে বাস্তব প্রয়োগে নিয়ে যেতে হবে। আরডিএ ক্যাম্পাসে পূর্ণাঙ্গ পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন করে প্রযুক্তিটির বাস্তব কর্মক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করা হবে। পরীক্ষায় সফল হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশীদারত্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ প্রযুক্তির প্রতিলিপি স্থাপনের পথ তৈরি করা সম্ভব হবে।”
আরডিএর উপপরিচালক ও গবেষক দলের সদস্য ড. মনিরুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চ ব্যয় এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন বিবেচনায় ২০১৪ সাল থেকে আরডিএ, বগুড়া ও বিগ অ্যান্ড চিকের যৌথ গবেষণাগারে আমরা এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছি। দীর্ঘ গবেষণা, নকশা উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি কার্যকর প্রোটোটাইপ প্রস্তুত হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এ ব্যবস্থায় ১৫০ আরপিএমের লো-স্পিড স্থায়ী চুম্বক জেনারেটর ব্যবহার করা হয়েছে। ফ্লাইহুইলে সঞ্চিত ঘূর্ণনশক্তি প্রয়োজনের সময় দ্রুত বিদ্যুতে রূপান্তর করা গেলে আকস্মিক লোড, ভোল্টেজ ও কম্পাঙ্কের ওঠানামা এবং স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎঘাটতি মোকাবিলায় এটি কার্যকর হতে পারে। এখন প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ পাইলট যাচাই। সফল হলে বিদ্যমান নকশার ভিত্তিতে সরকার দ্রুত একাধিক ইউনিট প্রতিলিপি করতে পারবে।”
গবেষক দলের প্রাথমিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এক মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্লাইহুইল গ্রিন পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনে আনুমানিক ২৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বিদ্যুৎ সঞ্চয় ও পুনঃসরবরাহের কার্যকর ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ইউনিটপ্রতি প্রায় ১ টাকা ৫০ পয়সা এবং সম্ভাব্য কার্যকাল প্রায় ৪০ বছর ধরা হয়েছে। তবে এসব হিসাব পূর্ণাঙ্গ পাইলট ও স্বাধীন কারিগরি-অর্থনৈতিক মূল্যায়নের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা ও দ্রুত শক্তি সরবরাহে ব্যবহৃত হচ্ছে। গবেষণা তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও পেনসিলভানিয়ায় ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্লাইহুইল কেন্দ্র, চীনের শানসি প্রদেশে ৩০ মেগাওয়াটের ডিংলুন ফ্লাইহুইল প্রকল্প এবং আয়ারল্যান্ডের মানিপয়েন্টে বৃহৎ ফ্লাইহুইলভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সৌরবিদ্যুতের উদ্বৃত্ত শক্তি সঞ্চয়, সন্ধ্যার পিক চাহিদা মোকাবিলা, কৃষি সেচ, হিমাগার, হাসপাতাল, তৈরি পোশাকশিল্প, ইপিজেড এবং ভারী যন্ত্রপাতিনির্ভর শিল্পে দ্রুত বিদ্যুৎ সহায়তা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এতে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা ও আমদানিকৃত জ্বালানির ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কাঁচামালের অপচয় ও আর্থিক ক্ষতি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদন করা গেলে দেশীয় প্রকৌশল সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
প্ল্যান্টের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করে সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা দেশীয় এ গবেষণা উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, ২০১৪ সাল থেকে দীর্ঘ গবেষণার মধ্য দিয়ে প্রযুক্তিটি যেহেতু কার্যকর প্রোটোটাইপ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাই প্রয়োজনীয় কারিগরি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক যাচাই দ্রুত শেষ করে সরকারি উদ্যোগে বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়ন ও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিলিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্লাইহুইল গ্রিন পাওয়ার প্রযুক্তির সামনে এখন মূল লক্ষ্য নতুন করে ধারণাগত গবেষণা নয়; বরং ‘গবেষণা থেকে বাস্তবায়ন’ এবং ‘প্রোটোটাইপ থেকে রিপ্লিকেশন’। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও স্বাধীন যাচাইয়ে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া গেলে এ প্রযুক্তি নবায়নযোগ্য শক্তি সঞ্চয়, কৃষি ও শিল্পে দ্রুত বিদ্যুৎ সহায়তা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিগত সংযোজন হয়ে উঠতে পারে।