অস্থির বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তির রূপরেখা তুলে ধরল বিশেষজ্ঞরা

এগ্রিলাইফ২৪ ডটকম: বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় এমন উদ্বেগ তুলে ধরে "পরিবেশ ও প্রতিবেশ ফোরাম-চট্টগ্রাম" এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তৃত বিশ্লেষণ ও করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার ১৬ এপ্রিল নগরীর একটি রেস্টোরেন্ট এ বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা আইএসডিই বাংলাদেশ, 'ক্লিন' এবং 'বিডব্লিউজিইডি' এর সহযোগিতায় "পরিবেশ ও প্রতিবেশ ফোরাম-চট্টগ্রাম" এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ক্যাব বিভাগীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক বাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী।

সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিভিন্ন স্তরের পেশাজীবি ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জ্বালানী সাশ্রয়ী নীতি ঘোষনা, সংকট মোকাবেলায় অগ্রাধিকার ভিত্তিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন, এখনই একই সাথে জ্বালানী সংকটের সময় বিকল্প জ্বালানি হিসাবে নবায়নেোযাগ্য জ্বালানী বিশেষ করে সৌরশক্তি ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে কৌশলগতভাবে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানের দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে "পরিবেশ ও প্রতিবেশ ফোরাম-চট্টগ্রাম" এর সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সাইন্স এর প্রফেসর ডঃ খালেদ মিসবাহুজ্জমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ক্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইএসডিই এর নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজের হোসাইন, পরিবেশ ও প্রতিবেশ ফোরাম-চট্টগ্রাম এর সদস্য ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এম নাসিরুল হক, সদস্য ও ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ন সম্পাদক মোঃ সেলিম জাহাঙ্গীর, সাংগঠনিক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মিটুল দাস গুপ্ত প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে সরাসরি সরবরাহ সংকটে পড়ে। ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর এর চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়াচ্ছে, যা টাকার মান কমানো এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বক্তব্যে আরও বলা হয়, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় গত এক দশকে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজি, এলপিজি ও পেট্রোলিয়ামের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, ৬৫ শতাংশ এলএনজি এবং অর্ধেকের বেশি এলপিজি হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে ওই অঞ্চলে যেকোনো উত্তেজনা সরাসরি জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলে।

সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাবও তুলে ধরা হয়। গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার বড় অংশ অচল হয়ে পড়ছে, শিল্প উৎপাদন কমছে, পরিবহন খরচ বাড়ছে এবং কৃষিতে সেচব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়। জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে বলেও সতর্ক করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে জ্বালানি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পর থেকে বাংলাদেশ একটি ব্যয়বহুল জ্বালানি কাঠামোর মধ্যে আটকে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে এলএনজি ও তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পাকিস্তানের সৌরবিদ্যুৎ বিপ্লব একটি কার্যকর উদাহরণ, যেখানে স্বল্প সময়ে ব্যাপক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশেও প্রায় ৪ কোটির বেশি পরিবারের একটি বড় অংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে পারে।

তাদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা জ্বালানি আমদানি কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন এবং কৃষিখাতে সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আরও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সংবাদ সম্মেলনে ১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট সমাধানে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতির আমদানিতে কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার, সরকারী-বেসরকারী ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, কৃষি কাজে সৌরচালিত সেচ পাম্প বৃদ্ধি, গণপরিবহনে বৈদ্যুতিক যান চালু এবং নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য স্বল্প সুদে ঋনের হার বাড়ানো। এছাড়া জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়।

বক্তারা বলেন, বর্তমান সংকট শুধু ঝুঁকি নয়, এটি একটি সুযোগও। এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হবে দেশকে।