
রোটারিয়ান ড. মো. হেমায়েতুল ইসলাম আরিফ, কো-কোঅর্ডিনেটর, রোটারি পাবলিক ইমেজ, রিপসা টিম, ডি-৬৪, বাংলাদেশ
ভূমিকা
বিশ্ব ইতিহাসে সফলতম বৈশ্বিক স্বাস্থ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে রোটারি ইন্টারন্যাশনালের পোলিও নির্মূল কর্মসূচি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই অভিযান বিশ্বকে প্রমাণ করেছে যে সুসংগঠিত বৈশ্বিক সহযোগিতা, স্থানীয় সম্পৃক্ততা, বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি এবং অদম্য মানবিক অঙ্গীকারের সমন্বয়ে যেকোনো জটিল স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ জয় করা সম্ভব। পোলিও নির্মূলে রোটারির ভূমিকা কেবল অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি একটি সামগ্রিক, বহুমুখী এবং টেকসই মডেল প্রতিষ্ঠা করেছে যা সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, জনসচেতনতা, টিকাদান কৌশল, নজরদারি ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে এক সুতোয় গেঁথেছে।
আজ যখন মানবসভ্যতা “অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)” নামের নীরব মহামারির সামনে দাঁড়িয়ে, তখন রোটারির সেই সফল পোলিও মডেলই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পথনির্দেশ। AMR কেবল বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করছে। এই সংকট মোকাবিলায় খণ্ডিত প্রচেষ্টা বা স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সুসংহত, দীর্ঘমেয়াদি, বৈশ্বিক ও স্থানীয় পর্যায়ে সম্পৃক্ততামূলক কৌশল—ঠিক যেমনটি রোটারি পোলিও নির্মূলে অনুসরণ করেছিল।
রোটারি শুধু পোলিও নির্মূলে সফল হয়নি; তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক এবং টেকসই মডেল গড়ে তুলেছে, যা আজ AMR-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য অপরিহার্য। এখনই সময় রোটারিয়ানদের সেই সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, নেটওয়ার্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে AMR মোকাবেলায় নেতৃত্ব দেওয়ার। নতুন বছরে আগামীর বাংলাদেশ তথা বিশ্বের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এই মডেলকে নতুন রূপে ও নতুন প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করে একটি কার্যকর ও টেকসই অভিযান শুরু করতে হবে যেখানে রোটারি থাকবে অগ্রভাগে, তার ঐতিহ্যবাহী পরিষেবা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে।
পোলিও নির্মূলে রোটারির সাফল্যের মূলনীতি
রোটারির পোলিও কার্যক্রম কয়েকটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে—যা AMR মোকাবেলাতেও সমানভাবে কার্যকর হতে পারে।
১. দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি
১৯৮৫ সালে রোটারি পোলিও নির্মূলের লক্ষ্য ঘোষণা করে এবং টানা চার দশক সেই লক্ষ্য ধরে রেখে কাজ করেছে। এই অটল প্রতিশ্রুতিই সাফল্যের মূল।
২. শক্তিশালী বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব
WHO, UNICEF, CDC, বিভিন্ন সরকার ও স্থানীয় সংগঠন—সবার সঙ্গে রোটারি একটি জোট তৈরি করেছে। এই বহুপক্ষীয় সমন্বয়ই পোলিও অভিযানের প্রাণশক্তি।
৩. স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয়তা
২০০টিরও বেশি দেশে রোটারির ক্লাবগুলো মাঠপর্যায়ে কাজ করেছে—মানুষকে সচেতন করেছে, টিকাদান পরিচালনা করেছে ও আস্থা তৈরি করেছে।
৪. কৌশলগত অর্থায়ন
রোটারি পোলিও কার্যক্রমে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে এবং বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোকে অর্থায়নে উৎসাহিত করেছে।
AMR সংকট: কেন রোটারির হস্তক্ষেপ অপরিহার্য?
AMR কোনো সাধারণ স্বাস্থ্যসমস্যা নয়—এটি ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ব্যবস্থা, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবজীবনকে হুমকিতে ফেলছে।
প্রতি বছর বিশ্বে লাখো মানুষের মৃত্যু ঘটছে এর কারণে, এবং ২০৫০ সালে এই সংখ্যা ১ কোটিতে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটি প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত, বৈশ্বিক, দীর্ঘমেয়াদি ও সংগঠিত উদ্যোগ—যে মডেল রোটারি ইতোমধ্যেই প্রয়োগ করে সফলতা দেখিয়েছে।
রোটারি পোলিও মডেলের আলোকে AMR নিয়ন্ত্রণ কৌশল
১. বৈশ্বিক জোট গঠন
- WHO, FAO, OIE, বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি সংস্থাকে নিয়ে “Global AMR Eradication Initiative” গঠন
- জাতীয় পর্যায়ে AMR-কে অগ্রাধিকার স্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা
২. গবেষণা ও নজরদারি শক্তিশালীকরণ
- কমিউনিটি-ভিত্তিক AMR নজরদারি নেটওয়ার্ক তৈরি
- মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধি
- দ্রুত ডায়াগনস্টিক কিট উন্নয়ন ও ডেটা সংগ্রহে সহায়তা
৩. জনসচেতনতা ও শিক্ষা বিস্তার
- "AMR Literacy Program" চালু করে স্কুল–কলেজে সচেতনতা
- স্বাস্থ্যকর্মী, ভেটেরিনারিয়ান ও কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ
- মিডিয়া ক্যাম্পেইন ও কমিউনিটি-based প্রচার
৪. অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টিওয়ার্ডশিপ
- হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে যুক্তিসঙ্গত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের গাইডলাইন
- কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রচার
৫. সংক্রমণ প্রতিরোধ শক্তিশালী করা
- হাসপাতালের Infection Control প্রোগ্রামে সহায়তা
- কমিউনিটিতে স্বাস্থ্যবিধি, স্যানিটেশন ও WASH কার্যক্রম প্রচলন
রোটারি ক্লাবের জন্য করণীয়
স্থানীয় ক্লাবগুলো সহজেই কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারে:
১. কমিউনিটি ম্যাপিং:স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ফার্মেসি, পশুখামার ও ওষুধের দোকান চিহ্নিতকরণ।
২. স্টেকহোল্ডার নেটওয়ার্ক তৈরি:চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, ভেট ডাক্তার, কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে আলোচনা মঞ্চ তৈরি।
৩. এডভোকেসি মিটিং:সিভিল সার্জন, প্রশাসন ও সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে AMR বিষয়ে বৈঠক।
৪. সচেতনতা কার্যক্রম:স্কুল–কলেজে বক্তৃতা, পোস্টার প্রদর্শনী, ভিডিও প্রদর্শন।
৫. পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন:স্থানীয় AMR পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা মূল্যায়ন।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
চ্যালেঞ্জ
- AMR একটি বহুমুখী ও জটিল সমস্যা
- বহু সেক্টরের সমন্বয় প্রয়োজন
- দীর্ঘমেয়াদি তহবিল নিশ্চিত করা কঠিন
সম্ভাবনা:রোটারির বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক, বিশ্বাসযোগ্যতা, স্থানীয় ক্লাবের শক্তিশালী উপস্থিতি এবং সরকারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা—এই সবই AMR মোকাবেলায় একটি বিশেষ সুবিধা প্রদান করে।
উপসংহার
রোটারি প্রমাণ করেছে যে সংগঠিত জনসম্পৃক্ততা কঠিনতম স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে। AMR আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যহুমকিগুলোর একটি। পোলিও নির্মূলে রোটারির অভিজ্ঞতা, নেটওয়ার্ক ও নেতৃত্ব AMR-এর বিরুদ্ধেও কার্যকর অস্ত্র হতে পারে।
এখনই সময়—
"AMR নির্মূল করুন – আজই পদক্ষেপ নিন!"
এই প্রচেষ্টা অসংখ্য জীবন রক্ষা করবে, রোটারির মানবসেবার উত্তরাধিকারকে আরও সমৃদ্ধ করবে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলবে।
























