সৌরবিদ্যুৎ: কৃষি, খাদ্য ও জ্বালানির নতুন দিগন্ত

এগ্রিবিজ এন্ড টেক
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

সমীরণ বিশ্বাসঃজলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কৃষিজমির সংকোচন এবং জ্বালানির চাহিদা, এই চারটি বড় চ্যালেঞ্জ আজ বিশ্বের প্রতিটি দেশের সামনে সমানভাবে উপস্থিত। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। একদিকে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় একই জমিতে একসঙ্গে খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণা, অর্থাৎ এগ্রিভোল্টাইকস (Agrivoltaics), একটি যুগান্তকারী সমাধান হিসেবে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। এগ্রিভোল্টাইকস এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কৃষিজমির নির্দিষ্ট উচ্চতায় সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয় এবং নিচের জমিতে কৃষিকাজ অব্যাহত থাকে। ফলে একই জমি থেকে একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ ও কৃষিপণ্য উৎপাদন সম্ভব হয়। সীমিত ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি গড়ে তুলতে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের অন্যতম কার্যকর মডেল হতে পারে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। তাই এখন এমন একটি সমাধান প্রয়োজন, যা কৃষি ও জ্বালানি, উভয় খাতকে সমানভাবে শক্তিশালী করবে। এগ্রিভোল্টাইকস সেই সমাধানেরই একটি বাস্তব উদাহরণ। সাধারণত ৫ থেকে ৬ মিটার উচ্চতায় সৌর প্যানেল স্থাপন করা হলে নিচের জমিতে কৃষিকাজ নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা যায়। কৃষিযন্ত্র চলাচল, সেচ, পরিচর্যা এবং ফসল সংগ্রহেও তেমন কোনো সমস্যা হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে আংশিক ছায়া ফসলকে অতিরিক্ত তাপ থেকে রক্ষা করে এবং মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে সহায়তা করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে এগ্রিভোল্টাইকস সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে সৌর প্যানেলের নিচে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু সবজি, মসলা, ঔষধি উদ্ভিদ এবং পশুখাদ্যজাতীয় ফসল আংশিক ছায়ায় আরও ভালো ফলন দেয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের আয়ও বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশের উত্তরাঞ্চল, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিচের জমিতে বিভিন্ন অর্থকরী ফসল চাষ করা সম্ভব। বিশেষ করে মরিচ, ধনিয়া, পুঁইশাক, কচু, ডালজাতীয় ফসল, আদা, হলুদ, অ্যালোভেরা, বিভিন্ন ঔষধি গাছ এবং পশুখাদ্য ঘাস সহজেই উৎপাদন করা যেতে পারে। এতে জমি অনাবাদি থাকবে না, বরং দ্বৈত উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমান বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা কেবল উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি জলবায়ু অভিযোজন, প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সৌর প্যানেলের নিচে তুলনামূলক কম তাপমাত্রা এবং কম বাষ্পীভবনের কারণে সেচের পানির প্রয়োজনও অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়। ফলে পানি সাশ্রয় হয় এবং কৃষি আরও টেকসই হয়।

এখানেই আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), স্মার্ট সয়েল সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং ড্রোন প্রযুক্তি যুক্ত হলে এগ্রিভোল্টাইকস আরও কার্যকর হয়ে উঠবে। মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টি উপাদান, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং রোগ-পোকার ঝুঁকি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করে কৃষকদের তাৎক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে, ফলন বাড়বে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি নিশ্চিত হবে।
এগ্রিভোল্টাইকস কেবল কৃষি বা বিদ্যুতের বিষয় নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, নারী ও যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কৃষক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অংশীদার হলে তাদের আয়ের নতুন উৎস সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মিত হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সৌর প্যানেলের নিচের জমি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকে। এটি জাতীয় সম্পদের অপচয়। যথাযথ গবেষণা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এই জমিগুলোকে উৎপাদন ব্যবস্থার আওতায় আনলে খাদ্য উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি প্রকল্পের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পাবে। তবে এগ্রিভোল্টাইকস বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, কোন অঞ্চলে কোন ফসল উপযোগী হবে, তা নিয়ে কৃষি গবেষণা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সৌর প্যানেলের উচ্চতা, দূরত্ব ও নকশা এমন হতে হবে যাতে পর্যাপ্ত আলো ও যন্ত্রপাতি চলাচলের সুযোগ থাকে। তৃতীয়ত, কৃষি, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ খাতের মধ্যে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে মাঠপর্যায়ে পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করতে হবে।

বিশ্ব এখন কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে সবুজ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে এগ্রিভোল্টাইকস একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। কারণ এটি একদিকে কার্বন নিঃসরণ কমায়, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখে এবং ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে। আজকের কৃষি শুধু জমি চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন তথ্য, প্রযুক্তি, শক্তি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত বিজ্ঞান। তাই ভবিষ্যতের কৃষি হবে স্মার্ট কৃষি, আর সেই স্মার্ট কৃষির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের মতো সীমিত ভূমি ও বিপুল জনসংখ্যার দেশে কৃষি ও জ্বালানিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একই জমিতে খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের এগ্রিভোল্টাইকস মডেল ভবিষ্যতের জন্য একটি বাস্তবসম্মত, পরিবেশবান্ধব এবং অর্থনৈতিক সমাধান। এখন প্রয়োজন সরকারি নীতিগত সহায়তা, গবেষণা, মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। পরিকল্পিতভাবে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ একদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে। কৃষি, খাদ্য ও জ্বালানির এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে টেকসই উন্নয়নের আগামী দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

-লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।