২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য ঘোষিত বাজেট মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক-সিকৃবি ভিসি
সিকৃবি প্রতিনিধি:প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর নেতৃত্বে প্রণীত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি এই গণমুখী বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) ভাইস- চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো: আলিমুল ইসলাম ।
টেকসই কৃষি উন্নয়নে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পৌঁছাতে গুরুত্ব দিতে হবে
মোঃ গোলাম আরিফ: কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক কার্যলয়, পাবনার আয়োজনে “টেকসই কৃষি উন্নয়নে কৃষি তথ্য বিস্তার: বর্তমান ও আগামীর করণীয়”শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি : কতটা মিলল হিসাব?
মো. ওয়াকিলুর রহমান:বাংলাদেশের কৃষি আজ এক অনন্য সাফল্যের গল্প। জনপ্রতি সীমিত আবাদি জমির ওপর নির্ভর করেই দেশের কৃষকেরা ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। কৃষি শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়; এটি দেশের খাদ্য ব্যবস্থা, গ্রামীণ জীবিকা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। দীর্ঘদিন পর একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে প্রণীত জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রেক্ষাপটে কৃষকের প্রত্যাশা ও বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের কৃষকের চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা চান সাশ্রয়ী মূল্যে বীজ, সার, সেচ, বিদ্যুৎ ও কৃষিযন্ত্রের সহজলভ্যতা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে চান কার্যকর বীমা ও পুনর্বাসন সহায়তা। সর্বোপরি, তারা চান উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য, যাতে কৃষিকাজ একটি টেকসই ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে টিকে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কৃষি উপকরণ কিনতে হয়। আবার বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকেও তারা বঞ্চিত হন। উদাহরণস্বরুপ-এবার বোরো মৌসুমে কৃষকেরা সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
এ বাস্তবতায় কৃষকের প্রত্যাশা পূরণে শুধু নীতিগত অঙ্গীকার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো।
গত কয়েক বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কৃষি ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দের পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও জাতীয় বাজেটে এর অংশীদারিত্ব ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে কৃষি খাতে মোট বাজেটের প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশ হারে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) সংশোধিত বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৫.৮১ শতাংশ, যা আগের বছরের ৬.৬৫ শতাংশের তুলনায় কম। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি-সংশ্লিষ্ট পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। পরিমাণগতভাবে এটি আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ৩২ কোটি টাকা বেশি হলেও মোট বাজেটের অনুপাতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৯৯ শতাংশে।
এখানেই কৃষকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে একটু ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাতীয় বাজেট সামগ্রিকভাবে যেখানে ১৯.০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি মাত্র ২.২৫ শতাংশ। খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি—এসব জাতীয় অগ্রাধিকারের আলোকে কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির এই ধীরগতি কতটা যৌক্তিক, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কৃষিকে যদি সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হয়, তবে বাজেটে তার প্রতিফলনও থাকতে হবে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৪৪ কোটি টাকা থেকে ৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে বরাদ্দ একটু বাড়ালো হয়েছে। অপরপক্ষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা থেকে কমে মাত্র ৭০৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। একইভাবে ভূমি ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটেও কাটছাঁট করা হয়েছে। অথচ কৃষির সামগ্রিক উন্নয়ন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, পানি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে একটি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং অন্য খাতে সংকোচন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
ভর্তুকির চিত্রও মিশ্র বার্তা দেয়। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ভর্তুকি বাবদ ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কম। বিশেষ করে কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ১৭ হাজার কোটি টাকা থেকে মাত্র ১ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে ১৭ হাজার ১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সামগ্রীক ভৃর্তুকি খাতে বরাদ্দের মাত্র ১৯.৯৯ শতাংশ কৃষি খাতে রাখা হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে এই সীমিত বৃদ্ধি কৃষকের জন্য কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রস্তবিত বাজেটে, ভূর্তুকি, প্রণোদনা ও চলতি হস্তান্তর অংশে ’অন্যান্য’ খাতে বেশ বড় বরাদ্দ ৩৩,৮১২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে (চলতি অর্থবছর এই বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৩,০৪১ কোটি টাকা) যা প্রয়োজনের নিরিখে কৃষি খাতে হস্তান্তর করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে।
তবে বাজেটে কৃষকের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য ১ হাজার ৬২.৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কৃষকের কাছে সরকারি সহায়তা আরও সহজে ও স্বচ্ছভাবে পৌঁছানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ ৮০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে বেশ কিছু কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কৃষি কাজে ব্যবহৃত কীটনাশকের ওপর আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ও অগ্রীম কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ধান, গম, আলু, বীজসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের উৎস কর (সোর্স ট্যাক্স) বিদ্যমান ১ থেকে ৫ শতাংশ হার কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি নির্ভরতা কমাতে ডাল, তৈলবীজ, মসলা ও ভুট্টা চাষে ৪ শতাংশ সুদে সহজ শর্তে কৃষিঋণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং কৃষকের আর্থিক চাপ হ্রাসে সহায়ক হতে পারে। যা খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করবে বলে আশা করা যায়।
আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো কৃষি মন্ত্রণালয় সাতটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর মধ্যে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবা প্রদান, মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ, ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জৈব সারের সর্বোত্তম ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগ টেকসই কৃষি উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তবে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে বাজেটের সামঞ্জস্য বিচার করলে কিছু ঘাটতি স্পষ্ট হয়। কৃষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি, কৃষি বীমার সম্প্রসারণ, খাল খনন ও পুনঃখনন এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলেও এসব কর্মসূচির জন্য পর্যাপ্ত ও সুস্পষ্ট বরাদ্দ এখনও দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে কৃষি বীমা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন, খাল পুনঃখনন এবং তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্ট-আপ তহবিল গঠনের বিষয়গুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা হয়ত তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজেটের গুণগত মান এবং সময়মত বাস্তবায়ন। বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেই কৃষকের কল্যাণ নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন এমন ব্যয় কাঠামো, যার সুফল সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছায়। বর্তমানে বাজেটের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব কৃষকের জীবনে সীমিত। তাই কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ সেবা, বাজার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। প্রয়োজনে এসব খাতে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, কৃষি খাতের বাজেট কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের হিসাব নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষকের জন্য কিছু আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ থাকলেও বরাদ্দের সামগ্রিক চিত্র এখনও তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কৃষকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান যত কমবে, ততই শক্তিশালী হবে গ্রামীণ অর্থনীতি, নিরাপদ হবে দেশের খাদ্য ব্যবস্থা এবং টেকসই হবে জাতীয় উন্নয়ন। কৃষিকে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ কৃষক সুরক্ষিত থাকলে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং দেশও সুরক্ষিত থাকবে।
লেখক: প্রফেসর, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
কোরবানির পশুতে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতা: বদলে যাওয়া এক অর্থনীতির গল্প
ড. মো. শরীফুল ইসলাম:বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব বিপ্লবগুলোর মধ্যে কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অন্যতম। একসময় কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে এলেই সীমান্তপথে বিদেশি গরুর প্রবেশ ছিল সাধারণ দৃশ্য। দেশের বাজার অনেকাংশেই নির্ভর করত বাইরের পশুর ওপর। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ বাংলাদেশ শুধু কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সক্ষমতাও অর্জন করেছে। এটি নিছক কৃষি বা প্রাণিসম্পদ খাতের সাফল্য নয়; এটি গ্রামীণ উন্নয়ন, যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারীর অংশগ্রহণ এবং জাতীয় অর্থনীতির এক অনন্য অর্জনের গল্প।
২০২৫ সালের কোরবানির ঈদে বাংলাদেশে প্রায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ লাখ ৫ হাজার গরু ও মহিষ এবং ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ছাগল ও ভেড়া ছিল। অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০ লাখেরও বেশি পশু উদ্বৃত্ত ছিল। আরও বিস্ময়ের বিষয়, প্রায় ৩৩ লাখ পশু অবিক্রীত থেকেছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে—বাংলাদেশ আজ কোরবানির পশু উৎপাদনে একটি নতুন সক্ষমতার জায়গায় পৌঁছেছে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতি সহায়তা, খামারভিত্তিক উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রবণতা। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে এখন ছোট, মাঝারি ও বড় খামার গড়ে উঠেছে। অনেক শিক্ষিত তরুণ চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তার বদলে গবাদিপশু খামারকে বেছে নিচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তারাও ঘরভিত্তিক খামারের মাধ্যমে পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনছেন।
একসময় ভারতীয় গরু ছাড়া কোরবানির বাজার কল্পনাই করা যেত না। সীমান্ত এলাকায় ঈদের আগে গরুর অস্বাভাবিক প্রবাহ ছিল প্রকাশ্য বাস্তবতা। কিন্তু বর্তমানে সরকার স্পষ্টভাবে বলছে—দেশে কোরবানির পশুর জন্য বিদেশি আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বড়। আগে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যেত; এখন সেই অর্থ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভেতরেই আবর্তিত হচ্ছে।
কোরবানির পশু কেন্দ্রিক অর্থনীতি এখন একটি বিশাল ভ্যালু চেইনে পরিণত হয়েছে। খামারি ছাড়াও এর সঙ্গে যুক্ত আছেন পশুখাদ্য ব্যবসায়ী, ওষুধ বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক, হাট ইজারাদার, কসাই, চামড়া ব্যবসায়ী ও মৌসুমি শ্রমিকরা। প্রতিবছর কোরবানিকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হয়। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থ প্রবাহ বাড়ায়, যা স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে চাঙ্গা করে।
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত বর্তমানে জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ অবদান রাখছে। যদিও এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি, তারপরও কোরবানিকেন্দ্রিক উৎপাদন দেশের অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কোরবানির চিত্রও পরিবর্তনের বার্তা দেয়। ২০২৫ সালে রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২৩ লাখ ২৪ হাজার পশু কোরবানি হয়েছে। এরপর ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ৮৫ হাজার পশু। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো এখন গবাদিপশু উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। চরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় ঘাস চাষ এবং খামার সম্প্রসারণ এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে এই অর্জনের মাঝেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে খামারিদের সবচেয়ে বড় সংকট পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি। ভুট্টা, খৈল, খড়, ঘাস ও অন্যান্য খাদ্য উপকরণের মূল্য বাড়তে থাকায় উৎপাদন ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষুদ্র খামারি ব্যাংক ঋণ বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পান না। ফলে তারা উচ্চ সুদে ধার নিয়ে খামার পরিচালনা করতে বাধ্য হন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো বাজার ব্যবস্থাপনা। অনেক সময় খামারিরা ন্যায্যমূল্য পান না, অথচ ভোক্তাদের উচ্চমূল্যে পশু কিনতে হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে খামারি ও ক্রেতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হন। আধুনিক ও ডিজিটাল হাট ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অনলাইন পশুর হাটের ধারণা করোনাকালে জনপ্রিয়তা পেলেও সেটিকে এখনও পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়নি।
পশুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত মোটাতাজাকরণের জন্য ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা ওষুধ ব্যবহার করে থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও সরকারের নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও এ বিষয়ে আরও কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পশু উৎপাদনের জন্য খামারিদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড় গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলছে। চরাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলের খামারিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাই জলবায়ু সহনশীল খামার ব্যবস্থাপনা ও অভিযোজন কৌশল এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের কোরবানির পশু খাতকে আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, খামারিদের জন্য সহজশর্তে ঋণ ও বীমা সুবিধা বাড়াতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগে ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে পশুবীমা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দেশীয় জাতের গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অভিযোজন শক্তি অনেক বেশি। উন্নত জাতের সঙ্গে দেশীয় জাতের বৈশিষ্ট্য সমন্বয় করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, পশুখাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা বাড়াতে হবে। পতিত জমি, চরাঞ্চল ও রাস্তার পাশের খালি জমিতে ঘাস চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে খাদ্য সংকট অনেকাংশে কমবে।
চতুর্থত, আধুনিক কোরবানির হাট গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা গেলে হাট ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
পঞ্চমত, কোরবানির পর চামড়া শিল্পকে আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রতিবছর কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হলেও সঠিক সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পায় না।
সবশেষে বলতে হয়, কোরবানির পশুতে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতা শুধু একটি কৃষিভিত্তিক অর্জন নয়; এটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। এই সাফল্য প্রমাণ করে, পরিকল্পিত নীতি, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং মানুষের পরিশ্রম একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ যেকোনো খাতেই আত্মনির্ভরতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
আজ দেশের খামারিরা আর শুধু কোরবানির বাজারের চাহিদা পূরণ করছেন না; তারা জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছেন। গ্রামীণ বাংলাদেশে যে নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব চলছে, কোরবানির পশুতে স্বনির্ভরতা তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। এই অর্জনকে টেকসই ও আধুনিক রূপ দিতে পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ শুধু নিজস্ব চাহিদা পূরণই করবে না, বরং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তোলার পথেও এগিয়ে যাবে।
-লেখক:সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট, সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা, বাংলাদেশ।
সিকৃবির মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের নতুন ডিন ড. শহীদুল ইসলাম
সিকৃবি প্রতিনিধি:সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের নতুন ডিন হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মাৎস্য বিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র প্রফেসর ড. শহীদুল ইসলাম।



