সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশের কৃষি আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তার চাপ এবং কৃষি জমির ক্রমহ্রাসমান পরিমাণ, সবকিছু মিলিয়ে কৃষিকে আরও দক্ষ, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং টেকসই করে তোলার বিকল্প নেই। কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থার মূল ভিত্তি যে মাটি, সেই মাটির স্বাস্থ্য নিয়েই আমাদের সবচেয়ে বড় অবহেলা রয়ে গেছে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশের অধিকাংশ কৃষক এখনো নিয়মিত মাটি পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ে সহজলভ্য, দ্রুত এবং প্রযুক্তিনির্ভর IoT (Internet of Things) ভিত্তিক মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে, ল্যাবরেটরিভিত্তিক মাটি পরীক্ষার সুবিধা সীমিত, ব্যয়বহুল এবং অধিকাংশ কৃষকের নাগালের বাইরে। ফলে কৃষক অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে সার প্রয়োগ করছেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই বৈজ্ঞানিক নয়।
মাটি একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি কেবল খনিজ কণার সমষ্টি নয়; বরং এতে অসংখ্য অণুজীব, জৈব পদার্থ, পানি, বায়ু এবং পুষ্টি উপাদানের একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বিদ্যমান। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে মাটির উৎপাদনক্ষমতা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ব্যবস্থাই হুমকির মুখে পড়ে।
আদর্শ কৃষি মাটিতে সাধারণভাবে প্রায় ৪৫ শতাংশ খনিজ পদার্থ, ২৫ শতাংশ পানি, ২৫ শতাংশ বায়ু এবং ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকার কথা বলা হয়। তবে এই অনুপাত স্থির নয়; মাটির ধরন, গঠন এবং আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে ৫ শতাংশ জৈব পদার্থের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটিই মাটির উর্বরতা, পানি ধারণক্ষমতা, অণুজীবের কার্যক্রম এবং পুষ্টি সংরক্ষণের মূল চালিকাশক্তি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অনেক কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আদর্শ মানের অনেক নিচে নেমে গেছে। কোথাও কোথাও তা ১–২ শতাংশেরও কম। একই সঙ্গে জৈব কার্বনের ঘাটতি দিন দিন বাড়ছে। এর ফলে মাটির গঠন দুর্বল হচ্ছে, পানি ধারণক্ষমতা কমছে, অণুজীবের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং ফসলের উৎপাদনশীলতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।
অন্যদিকে, অধিক ফলনের আশায় বছরের পর বছর অপরিকল্পিতভাবে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও বিভিন্ন রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মাটির প্রকৃত চাহিদা না জেনে একই ধরনের সার বারবার প্রয়োগ করা হয়। এর সঙ্গে অতিরিক্ত কীটনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার মাটির জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। উপকারী ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, কেঁচোসহ অসংখ্য জীব ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে, যা মাটির স্বাভাবিক পুনর্জীবন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো মাটির অম্লতা বৃদ্ধি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির pH ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার, অপরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং জৈব পদার্থের ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় মাটি অতিরিক্ত অম্লীয় হয়ে উঠছে। আবার উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততাও বাড়ছে। pH-এর ভারসাম্য নষ্ট হলে ফসল প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না, ফলে সার প্রয়োগ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো নিয়মিত মাটি পরীক্ষা। চিকিৎসক যেমন রোগ নির্ণয় না করে ওষুধ দেন না, তেমনি মাটির অবস্থা না জেনে সার প্রয়োগও বৈজ্ঞানিক হতে পারে না। মাটি পরীক্ষা করলে pH, বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা (EC), আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সুষম সার ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয়।
বিশ্বের উন্নত কৃষি ব্যবস্থায় এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। IoT-ভিত্তিক স্মার্ট সয়েল সেন্সর মাঠ পর্যায়েই কয়েক মিনিটের মধ্যে মাটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। সেন্সর থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোবাইল অ্যাপ বা ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা যায় এবং কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা কিংবা গবেষক তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন। এর ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সঠিক সার সুপারিশ এবং ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব হয়।
বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। যদি প্রতিটি উপজেলা কৃষি অফিস, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার কিংবা কৃষি সেবা কেন্দ্রে IoT-ভিত্তিক মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবে কৃষক সহজেই নিজের জমির স্বাস্থ্য জানতে পারবেন। এতে সার অপচয় কমবে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে, পরিবেশ দূষণ কমবে এবং কৃষকের লাভ বাড়বে এবং IoT-ভিত্তিক মাটি পরীক্ষার যুব কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি হবে।
শুধু কৃষক নয়, রাষ্ট্রও এর মাধ্যমে বিশাল উপকার পেতে পারে। দেশে যদি লক্ষ লক্ষ মাটির পরীক্ষার তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে অঞ্চলভিত্তিক মাটির উর্বরতা, অম্লতা, লবণাক্ততা, জৈব কার্বন ও পুষ্টির ঘাটতির একটি জাতীয় মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হবে। এই তথ্য কৃষি নীতি, সার আমদানি, গবেষণা এবং জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে Precision Agriculture বা নির্ভুল কৃষির ধারণা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এর মূল ভিত্তিই হলো তথ্যভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা। মাটির অবস্থা অনুযায়ী যেখানে যতটুকু সার বা পানি দরকার, ঠিক ততটুকুই প্রয়োগ করা হয়। এতে উৎপাদন বাড়ে, ব্যয় কমে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকে।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় শুধু প্রযুক্তি নয়, কৃষি ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি, সবুজ সার চাষ, ফসল পর্যায়ক্রম, ডালশস্য অন্তর্ভুক্তি, ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া, কম চাষ পদ্ধতি এবং সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা (Integrated Nutrient Management) গ্রহণ করতে হবে। রাসায়নিক সার পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়; বরং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য। এছাড়া মাটির স্থায়ীভাবে জৈব কার্বন বৃদ্ধির জন্য বায়োচার ব্যবহার করার এখনি সময়।
সরকার ইতোমধ্যে কৃষির ডিজিটাল রূপান্তরে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এখন সময় এসেছে সেই উদ্যোগকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে জাতীয় IoT-ভিত্তিক মাটি স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি চালু করার। প্রতিটি উপজেলায় স্মার্ট সয়েল সেন্সর, প্রশিক্ষিত জনবল, ডিজিটাল ডেটা প্ল্যাটফর্ম এবং কৃষকের জন্য সহজ সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান (SRDI), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত অংশগ্রহণ জরুরি।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, মাটি সুস্থ থাকলে কৃষি সুস্থ থাকবে; কৃষি সুস্থ থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে; আর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে জাতি হবে সমৃদ্ধ। তাই মাটিকে কেবল উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আজকের প্রয়োজন শুধু সার ভর্তুকি নয়, মাটির স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, মাটির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা রক্ষা। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য IoT-ভিত্তিক জাতীয় মাটি পরীক্ষার কর্মসূচি বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি। বিজ্ঞানভিত্তিক মাটি ব্যবস্থাপনাই পারে বাংলাদেশের কৃষিকে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ, লাভজনক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় নিয়মিত মাটি পরীক্ষা: টেকসই কৃষির জন্য IoT ভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচি এখন সময়ের দাবি।
লেখক কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।



