বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

সমীরণ বিশ্বাস:যুদ্ধ, জ্বালানি ও সার সংকট: বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যুদ্ধ আর শুধুমাত্র সীমান্তের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অর্থনীতি, জ্বালানি, কৃষি এবং সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তায়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-এর মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ শিরা, হরমুজ প্রণালি কে অচল করে দিয়েছে বলে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থার জন্য এক গুরুতর সংকেত বহন করে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয়:

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু জ্বালানি নয়, বরং রাসায়নিক সারসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কারণ আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় ব্যবহৃত অধিকাংশ রাসায়নিক সার উৎপাদন ও পরিবহন জ্বালানি-নির্ভর। যুদ্ধের কারণে যদি এই সরবরাহ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া অবশ্যম্ভাবী। এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের দামে প্রতিফলিত হয়।

সার সংকট ও কৃষি উৎপাদনের সরাসরি সম্পর্ক:

বর্তমান কৃষি উৎপাদন অনেকাংশেই নির্ভর করে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম-ভিত্তিক সারের ওপর। এই সারগুলোর অভাব হলে ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বৈশ্বিক ফসল উৎপাদন প্রায় ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা মানব ইতিহাসে এক ভয়াবহ খাদ্য সংকটের সূচনা করতে পারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো টোরেও এক সাক্ষাৎকারে আলজাজিরা-কে বলেন, পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে এবং এটি শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থার ওপর সরাসরি হুমকি।

সময়মতো বপন ব্যাহত: উৎপাদন চক্রে বিপর্যয়:

কৃষি একটি সময়নির্ভর প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট মৌসুমে বীজ বপন, সার প্রয়োগ এবং পরিচর্যার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সার সংকটের কারণে অনেক দেশ সময়মতো বপন করতে পারছে না। বিশেষ করে এশিয়ার কিছু অঞ্চলে ইতোমধ্যেই বপনের উপযুক্ত সময় পেরিয়ে গেছে, যা ওই অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদনকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই দেরি শুধুমাত্র চলতি মৌসুমের উৎপাদনকেই প্রভাবিত করবে না; এর প্রভাব আগামী মৌসুমেও পড়তে পারে, ফলে খাদ্য সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি পরিকল্পনায় পরিবর্তন: ফসলের ধরনে রূপান্তর:

সারের অভাব মোকাবিলায় বড় কৃষি উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের ফসল উৎপাদন কৌশল পরিবর্তন করতে পারে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রাজিল গম ও ভুট্টার মতো উচ্চ সারনির্ভর ফসলের পরিবর্তে সয়াবিনের মতো কম সারনির্ভর ফসলের দিকে ঝুঁকতে পারে। সয়াবিনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি মাটিতে নাইট্রোজেন স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে, ফলে অতিরিক্ত সারের প্রয়োজন হয় না। তবে এর ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যেতে পারে, কারণ সয়াবিন মূলত একটি তেলবীজ ফসল।

জ্বালানি সংকট ও খাদ্য মূল্যের আন্তঃসম্পর্ক:

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি কৃষির ওপর প্রভাব ফেলে। জমি চাষ, সেচ, ফসল সংগ্রহ এবং পরিবহন, সবকিছুতেই জ্বালানি প্রয়োজন। ফলে তেলের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অনেক কৃষক খাদ্য ফসলের পরিবর্তে জৈব জ্বালানি (বায়োফুয়েল) উৎপাদনের জন্য ফসল ব্যবহার করতে পারেন। যেমন ভুট্টা বা সয়াবিন ব্যবহার করে বায়োফুয়েল তৈরি করা হয়। এতে খাদ্য সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে, যা বাজারে খাদ্যের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি: একটি অনিবার্য বাস্তবতা:

খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং এটি আগামীতে আরও তীব্র হতে পারে। ম্যাক্সিমো টোরেও সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধির ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়া অবশ্যম্ভাবী। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ এসব দেশের জনগণের আয় কম এবং খাদ্যের পেছনে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি। ফলে খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি:

ইতিহাস বলছে, খাদ্য সংকট প্রায়ই সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। খাদ্যের অভাব ও মূল্যবৃদ্ধি মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়, যা কখনো কখনো রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নেয়। আরব বসন্তের মতো ঘটনাগুলোর পেছনেও খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি খাদ্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্ভাব্য সমাধান ও করণীয়:

এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প বাণিজ্য পথ ও উৎস তৈরি করতে হবে। জৈব ও টেকসই কৃষি চর্চা বৃদ্ধি: রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার ও প্রাকৃতিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। খাদ্য মজুদ ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন: দেশগুলোকে তাদের খাদ্য মজুদ বাড়াতে হবে এবং সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার: স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, মাটি বিশ্লেষণ এবং সঠিক সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। নীতিগত সমন্বয়: খাদ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং সারের সরবরাহ বিঘ্ন, এই তিনটি উপাদান একত্রে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় এই বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব এড়ানো সম্ভব নয়। দেশের কৃষি উৎপাদন অনেকাংশেই নির্ভরশীল আমদানিকৃত রাসায়নিক সারের ওপর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি বা সরবরাহ ব্যাহত হলে সরাসরি তার প্রভাব পড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচে।

বিশেষ করে ইউরিয়া, টিএসপি , ডিএপি ও এমওপি সারের দাম বেড়ে গেলে কৃষকের জন্য চাষাবাদ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এতে অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক চাষে নিরুৎসাহিত হতে পারেন, যা সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হলে ফসল উৎপাদন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। ডিজেল ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি কৃষি খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা খাদ্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, সারের বিকল্প উৎস খোঁজা এবং বহুমুখী আমদানি নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো যায়। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের জন্য ভর্তুকি কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা দরকার, যাতে তারা উৎপাদন চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হন। পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান এবং স্থানীয় পর্যায়ে সার উৎপাদনের উদ্যোগ বাড়ানো যেতে পারে।

এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করতে পারে। অন্যথায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, খাদ্য নিরাপত্তা শুধুমাত্র কৃষি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইরান-ইসরাইল-মার্কিন উত্তেজনার মতো একটি আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে পুরো বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে, তা আজ স্পষ্ট। তাই এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগ, দূরদর্শী নীতি এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যদি সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্ব এক অভূতপূর্ব খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে, যার প্রভাব হবে দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুমাত্রিক।

লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।