প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি : কতটা মিলল হিসাব?
মো. ওয়াকিলুর রহমান:বাংলাদেশের কৃষি আজ এক অনন্য সাফল্যের গল্প। জনপ্রতি সীমিত আবাদি জমির ওপর নির্ভর করেই দেশের কৃষকেরা ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। কৃষি শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়; এটি দেশের খাদ্য ব্যবস্থা, গ্রামীণ জীবিকা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। দীর্ঘদিন পর একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে প্রণীত জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রেক্ষাপটে কৃষকের প্রত্যাশা ও বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের কৃষকের চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা চান সাশ্রয়ী মূল্যে বীজ, সার, সেচ, বিদ্যুৎ ও কৃষিযন্ত্রের সহজলভ্যতা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে চান কার্যকর বীমা ও পুনর্বাসন সহায়তা। সর্বোপরি, তারা চান উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য, যাতে কৃষিকাজ একটি টেকসই ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে টিকে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কৃষি উপকরণ কিনতে হয়। আবার বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকেও তারা বঞ্চিত হন। উদাহরণস্বরুপ-এবার বোরো মৌসুমে কৃষকেরা সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
এ বাস্তবতায় কৃষকের প্রত্যাশা পূরণে শুধু নীতিগত অঙ্গীকার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো।
গত কয়েক বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কৃষি ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দের পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও জাতীয় বাজেটে এর অংশীদারিত্ব ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে কৃষি খাতে মোট বাজেটের প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশ হারে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) সংশোধিত বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৫.৮১ শতাংশ, যা আগের বছরের ৬.৬৫ শতাংশের তুলনায় কম। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি-সংশ্লিষ্ট পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। পরিমাণগতভাবে এটি আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ৩২ কোটি টাকা বেশি হলেও মোট বাজেটের অনুপাতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৯৯ শতাংশে।
এখানেই কৃষকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে একটু ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাতীয় বাজেট সামগ্রিকভাবে যেখানে ১৯.০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি মাত্র ২.২৫ শতাংশ। খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি—এসব জাতীয় অগ্রাধিকারের আলোকে কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির এই ধীরগতি কতটা যৌক্তিক, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কৃষিকে যদি সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হয়, তবে বাজেটে তার প্রতিফলনও থাকতে হবে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৪৪ কোটি টাকা থেকে ৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে বরাদ্দ একটু বাড়ালো হয়েছে। অপরপক্ষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা থেকে কমে মাত্র ৭০৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। একইভাবে ভূমি ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটেও কাটছাঁট করা হয়েছে। অথচ কৃষির সামগ্রিক উন্নয়ন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, পানি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে একটি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং অন্য খাতে সংকোচন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
ভর্তুকির চিত্রও মিশ্র বার্তা দেয়। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ভর্তুকি বাবদ ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কম। বিশেষ করে কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ১৭ হাজার কোটি টাকা থেকে মাত্র ১ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে ১৭ হাজার ১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সামগ্রীক ভৃর্তুকি খাতে বরাদ্দের মাত্র ১৯.৯৯ শতাংশ কৃষি খাতে রাখা হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে এই সীমিত বৃদ্ধি কৃষকের জন্য কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রস্তবিত বাজেটে, ভূর্তুকি, প্রণোদনা ও চলতি হস্তান্তর অংশে ’অন্যান্য’ খাতে বেশ বড় বরাদ্দ ৩৩,৮১২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে (চলতি অর্থবছর এই বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৩,০৪১ কোটি টাকা) যা প্রয়োজনের নিরিখে কৃষি খাতে হস্তান্তর করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে।
তবে বাজেটে কৃষকের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য ১ হাজার ৬২.৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কৃষকের কাছে সরকারি সহায়তা আরও সহজে ও স্বচ্ছভাবে পৌঁছানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ ৮০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে বেশ কিছু কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কৃষি কাজে ব্যবহৃত কীটনাশকের ওপর আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ও অগ্রীম কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ধান, গম, আলু, বীজসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের উৎস কর (সোর্স ট্যাক্স) বিদ্যমান ১ থেকে ৫ শতাংশ হার কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি নির্ভরতা কমাতে ডাল, তৈলবীজ, মসলা ও ভুট্টা চাষে ৪ শতাংশ সুদে সহজ শর্তে কৃষিঋণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং কৃষকের আর্থিক চাপ হ্রাসে সহায়ক হতে পারে। যা খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করবে বলে আশা করা যায়।
আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো কৃষি মন্ত্রণালয় সাতটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর মধ্যে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবা প্রদান, মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ, ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জৈব সারের সর্বোত্তম ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগ টেকসই কৃষি উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তবে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে বাজেটের সামঞ্জস্য বিচার করলে কিছু ঘাটতি স্পষ্ট হয়। কৃষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি, কৃষি বীমার সম্প্রসারণ, খাল খনন ও পুনঃখনন এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলেও এসব কর্মসূচির জন্য পর্যাপ্ত ও সুস্পষ্ট বরাদ্দ এখনও দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে কৃষি বীমা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন, খাল পুনঃখনন এবং তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্ট-আপ তহবিল গঠনের বিষয়গুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা হয়ত তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজেটের গুণগত মান এবং সময়মত বাস্তবায়ন। বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেই কৃষকের কল্যাণ নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন এমন ব্যয় কাঠামো, যার সুফল সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছায়। বর্তমানে বাজেটের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব কৃষকের জীবনে সীমিত। তাই কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ সেবা, বাজার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। প্রয়োজনে এসব খাতে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, কৃষি খাতের বাজেট কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের হিসাব নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষকের জন্য কিছু আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ থাকলেও বরাদ্দের সামগ্রিক চিত্র এখনও তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কৃষকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান যত কমবে, ততই শক্তিশালী হবে গ্রামীণ অর্থনীতি, নিরাপদ হবে দেশের খাদ্য ব্যবস্থা এবং টেকসই হবে জাতীয় উন্নয়ন। কৃষিকে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ কৃষক সুরক্ষিত থাকলে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং দেশও সুরক্ষিত থাকবে।
লেখক: প্রফেসর, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাজেটে নিরাপদ খাদ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হোক
ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন: সারা পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ধান, মাছ, সবজি, ফলমূল, দুধ ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে অনেক দূর এগিয়েছে।
মানব সভ্যতার ভিত্তি: সুস্থ মাটি, নির্মল বায়ু ও বিশুদ্ধ পানি
সমীরণ বিশ্বাস:সুস্থ মাটি, নির্মল বায়ু ও বিশুদ্ধ পানি: মানব সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য ভিত্তি। পরিবেশ: জীবনের মূল ভিত্তি। প্রকৃতির তিনটি প্রধান উপাদান, মাটি, বায়ু এবং পানি; মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। “সুস্থ মাটি, নির্মল বায়ু আর বিশুদ্ধ পানি টিকিয়ে রেখেছে মানব সভ্যতাকে। এই প্রাণশক্তির আধার ফুরিয়ে আসছে ক্রমেই, যা অচিরেই হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে পৃথিবীকে।” এই কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় বাস্তবতা। মানুষের উন্নয়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং ভোগবাদী জীবনযাত্রার কারণে প্রকৃতির মৌলিক সম্পদগুলো আজ চরম চাপের মুখে। মাটি তার উর্বরতা হারাচ্ছে, বায়ু দূষিত হচ্ছে এবং নিরাপদ পানির উৎস দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে শুধু পরিবেশ নয়, মানব সভ্যতার অস্তিত্বও আজ এক গভীর সংকটের সম্মুখীন। প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী শুধু মানুষের নয়; এটি সকল প্রাণী, উদ্ভিদ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও আবাসস্থল। তাই পরিবেশ রক্ষা কেবল একটি দায়িত্ব নয়, বরং মানবজাতির টিকে থাকার শর্ত।
সুস্থ মাটি: মাটি শুধু কৃষিজ ফসল উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবন্ত বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি। কোটি কোটি অণুজীব, কেঁচো, উপকারী ছত্রাক এবং নানা জীব মাটিকে জীবন্ত রাখে। এই মাটিই খাদ্য উৎপাদন, বন সৃষ্টি এবং কার্বন সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, অপরিকল্পিত চাষাবাদ, বন উজাড় এবং শিল্প বর্জ্যের কারণে মাটির স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি ঘটছে। উর্বর জমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে, জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
নির্মল বায়ু: মানুষ প্রতিদিন হাজার হাজার বার শ্বাস নেয়। অথচ সেই বায়ুই আজ দূষণের শিকার। যানবাহনের ধোঁয়া, কলকারখানার নির্গমন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং বন ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। বায়ু দূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে।
বিশুদ্ধ পানি: পানি ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। অথচ বিশ্বের বহু অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। নদী, খাল, বিল ও জলাশয় দূষিত হচ্ছে শিল্প বর্জ্য, প্লাস্টিক এবং রাসায়নিক পদার্থের কারণে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক স্থানে লবণাক্ততা ও আর্সেনিক দূষণ মানুষের স্বাস্থ্য ও কৃষিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
জলবায়ু পরিবর্তন: পরিবেশ সংকটের নতুন মাত্রা:
বর্তমান সময়ে পরিবেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট। তীব্র তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেখা দিচ্ছে। ঘন ঘন বন্যা ও খরা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষক ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
কৃষি ও পরিবেশের গভীর সম্পর্ক:
কৃষি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সুস্থ পরিবেশের ওপর। উর্বর মাটি, পর্যাপ্ত পানি, উপযুক্ত তাপমাত্রা এবং জীববৈচিত্র্য ছাড়া কৃষি উৎপাদন সম্ভব নয়। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অতিরিক্ত তাপে ধানের ফলন কমছে। ফুল ও ফল ঝরে যাচ্ছে। নতুন নতুন রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। সেচের খরচ বাড়ছে। খরা ও বন্যায় ফসল নষ্ট হচ্ছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।
জীববৈচিত্র্যের সংকট:
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি, মাছ, বনজ প্রাণী, সবাই পরিবেশের একটি অংশ। আজ বন ধ্বংস, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্তির পথে। বিশেষ করে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়া একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। পৃথিবীর অধিকাংশ খাদ্যশস্যের পরাগায়ন মৌমাছির মাধ্যমে হয়। মৌমাছি হারিয়ে গেলে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ মানে শুধু প্রাণী রক্ষা নয়; বরং মানব সভ্যতার খাদ্য ও ভবিষ্যৎ রক্ষা।
প্লাস্টিক দূষণ: নীরব বিপর্যয়:
বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় পরিবেশগত সমস্যা হলো প্লাস্টিক দূষণ। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক আমাদের নদী, সমুদ্র, কৃষিজমি এবং শহরকে দূষিত করছে। প্লাস্টিক মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে, জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন খাদ্য, পানি এবং এমনকি মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। এটি ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
কার্বন স্মার্ট কৃষি, ভবিষ্যতের পথ:
পরিবেশ ও কৃষি রক্ষায় বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কার্বন স্মার্ট কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো; কার্বন নিঃসরণ কমানো। মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন। পানি সাশ্রয়। উৎপাদন বৃদ্ধি। জলবায়ু সহনশীল কৃষি গড়ে তোলা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
উদ্ভাবনী প্রযুক্তি:
কৃষিতে এআই প্রযুক্তি। স্মার্ট মাটি বিশ্লেষণ (IoT Soil Sensor)। আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা। কৃষি ড্রোন প্রযুক্তি। প্রিসিশন ফার্মিং। ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা। এসব প্রযুক্তি কৃষকদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমায়।
বিশ্ব পরিবেশ এর গুরুত্ব:
২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করায় যে পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। আজকের পৃথিবীতে পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি উন্নয়নের বিপরীতে নয়; বরং টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যদি আমরা আজ পরিবেশ রক্ষা না করি, তবে আগামী দিনে, খাদ্য সংকট বাড়বে, পানির সংকট তীব্র হবে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাবে। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের সময়।
আমাদের করণীয়:
ব্যক্তিগত পর্যায়ে: অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো। গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করা। পানি অপচয় রোধ করা। পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতন হওয়া। কৃষি খাতে: জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা। সুষম সার ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা। পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা। কার্বন স্মার্ট কৃষি সম্প্রসারণ করা। সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে বন সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো। শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণ। পরিবেশ শিক্ষা সম্প্রসারণ। জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
সুস্থ মাটি, নির্মল বায়ু এবং বিশুদ্ধ পানি, এই তিনটি উপাদানই মানব সভ্যতার জীবনরেখা। কিন্তু আমাদের অসচেতন কর্মকাণ্ডের কারণে এই অমূল্য সম্পদগুলো ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে মানব সভ্যতার অগ্রগতিও থেমে যাবে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের সেই সত্যটি আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবী আমাদের উত্তরাধিকার নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে ধার নেওয়া একটি আমানত। আসুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এ আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি, “সুস্থ মাটি রক্ষা করি, নির্মল বায়ু নিশ্চিত করি, বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণ করি; প্রকৃতি বাঁচাই, পৃথিবী বাঁচাই, মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করি।”
লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।
জলবায়ু অভিযান ২০২৬: সরকারের খাল খনন– সময়োপযোগী এক উদ্যোগ
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ ও আমাদের অঙ্গীকার
রোটারিয়ান ড. মো. হেমায়েতুল ইসলাম আরিফ: প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৭২ সালের স্টকহোম সম্মেলনে এই দিবসের ভিত্তি স্থাপন করে।





















