এল নিনোর আশঙ্কা, প্রস্তুত আমরা ?

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

সমীরণ বিশ্বাস:প্রকৃতি কখনো স্থির নয়। পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থাও একটি চলমান ও জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে সমুদ্র, বায়ুমণ্ডল, সূর্য, মেঘ, বাতাস এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন একে অপরের সঙ্গে অবিরাম মিথস্ক্রিয়া করে। এই বিশাল ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা হলো এল নিনো (El Niño)।

এটি এমন একটি জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, যা প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্টি হলেও এর প্রভাব পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশে অনুভূত হয়। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষণা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, এল নিনো আসলে কী, কেন এটি ঘটে, কোথায় এর উৎপত্তি, এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে ? একই সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী ?

এল নিনো কী ?

স্প্যানিশ ভাষায় "El Niño" শব্দের অর্থ "ছোট ছেলে" বা "খ্রিস্টশিশু"। দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর জেলেরা বড়দিনের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণ পানির প্রবাহ লক্ষ্য করে এ নামটি দিয়েছিলেন। বৈজ্ঞানিকভাবে এল নিনো হলো মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া। এটি El Niño–Southern Oscillation (ENSO) নামের বৃহৎ জলবায়ু চক্রের উষ্ণ পর্যায়। সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৭ বছর অন্তর এটি দেখা দেয় এবং ৯ থেকে ১২ মাস, কখনো কখনো তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।

কেন এল নিনো সৃষ্টি হয় ?

স্বাভাবিক অবস্থায় পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বাতাস (Trade Winds) প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি উপরে উঠে আসে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় আপওয়েলিং (Upwelling)। কিন্তু কোনো কারণে যখন এই বাণিজ্যিক বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে, তখন উষ্ণ পানি পূর্বদিকে ফিরে আসে এবং মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে জমা হয়। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। উষ্ণ সমুদ্রের কারণে বায়ুমণ্ডলের চাপ, মেঘের গঠন, বৃষ্টিপাত এবং বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক ধারা বদলে যায়। এভাবেই এল নিনোর জন্ম হয়। অর্থাৎ এল নিনো কেবল সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘটনা নয়; এটি সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের যৌথ পরিবর্তনের একটি জটিল প্রক্রিয়া।

কোথায় এর উৎপত্তি এবং কোথায় প্রভাব পড়ে ?

এল নিনোর উৎপত্তি হয় মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে। কিন্তু এর প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এর প্রভাব দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপের কিছু অংশ। বাংলাদেশে এল নিনো সরাসরি সৃষ্টি না হলেও এর প্রভাবে মৌসুমি বায়ুর শক্তি দুর্বল হতে পারে, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে এবং তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়তে পারে।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ ?

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষাকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাংলাদেশের বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের একটি বড় অংশ এই সময়ে হয়ে থাকে। যদি এই সময় এল নিনো শক্তিশালী হয়, তাহলে, মৌসুমি বায়ু দুর্বল হতে পারে। স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। খরা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এল নিনো থাকলেই প্রতিটি এলাকায় একই ধরনের আবহাওয়া হবে—এমন নয়। স্থানীয় আবহাওয়া, বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা, ভারত মহাসাগরের অবস্থা এবং অন্যান্য জলবায়ুগত উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কী কী ঘটতে পারে ?

তাপমাত্রা বৃদ্ধি:  এল নিনো সাধারণত বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে এল নিনো যুক্ত হলে রেকর্ড তাপমাত্রা সৃষ্টি হতে পারে। কম বৃষ্টিপাত ও খরা: বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার অনেক এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে কৃষি, পানীয় জল এবং সেচব্যবস্থা চাপের মুখে পড়বে। কৃষিতে ক্ষতি:  ধান, ভুট্টা, গম, ডাল এবং সবজির উৎপাদন কমে যেতে পারে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে জমিতে সেচের খরচও বেড়ে যাবে। বন আগুনের ঝুঁকি: ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দাবানলের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি:  সমুদ্রের উষ্ণ পানি মাছের স্বাভাবিক বাসস্থান পরিবর্তন করে। পেরু ও ইকুয়েডরের উপকূলে মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে। প্রবালপ্রাচীর উষ্ণ পানির কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি: কৃষি উৎপাদন কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে চাল, গম, ভুট্টা, ভোজ্যতেল এবং পশুখাদ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি: অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হৃদ্‌রোগের জটিলতা এবং শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। কোথাও আবার অতিবৃষ্টির কারণে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু বা মশাবাহিত রোগের প্রকোপও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব :

বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বর্ষার বৃষ্টিপাত কমে গেলে কৃষি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ তাপপ্রবাহ শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলবে। তৃতীয়ত, বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাবে, ফলে জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। চতুর্থত, নদীর পানিপ্রবাহ কমে গেলে সেচ, নৌপরিবহন এবং মিঠাপানির মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পঞ্চমত, খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

এল নিনো কি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল ?

এ প্রশ্নের উত্তর কিছুটা জটিল। এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত চক্র। অর্থাৎ এটি বহু হাজার বছর ধরেই ঘটে আসছে। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এল নিনোর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে আরও তীব্র হতে পারে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনো সৃষ্টি করে না; তবে এটি এল নিনোর ক্ষতিকর প্রভাবকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিজ্ঞানীরা কীভাবে এল নিনো পর্যবেক্ষণ করেন ?

বর্তমানে স্যাটেলাইট, সমুদ্রে স্থাপিত ভাসমান বয়া, সমুদ্রজাহাজ, আবহাওয়া কেন্দ্র এবং সুপারকম্পিউটারভিত্তিক জলবায়ু মডেলের মাধ্যমে এল নিনো পর্যবেক্ষণ করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বাতাসের গতি এবং সমুদ্রস্রোতের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা কয়েক মাস আগেই সম্ভাব্য পরিস্থিতির পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও প্রকৃতির জটিলতার কারণে শতভাগ নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না।

আমাদের করণীয়:

এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু এর ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সরকারি পর্যায়ে, আবহাওয়া পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কবার্তা আরও শক্তিশালী করতে হবে। পানি সংরক্ষণ ও সেচব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে। খরা-সহনশীল ফসলের জাত সম্প্রসারণ করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য বিকল্প পরিকল্পনা রাখতে হবে। স্বাস্থ্যখাতে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। কৃষকদের জন্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী চাষাবাদের সময় নির্ধারণ করা। পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা ব্যবহার করা। খরা-সহনশীল জাতের ফসল নির্বাচন করা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সাধারণ মানুষের জন্য, তীব্র গরমে পর্যাপ্ত পানি পান করা। দুপুরের প্রখর রোদে অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা। বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় কমানো। গাছ লাগানো এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। সরকারি আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা অনুসরণ করা।

এল নিনো পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক ঘটনা। এর উৎপত্তি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের প্রশান্ত মহাসাগরে হলেও এর প্রভাব বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কাল আমাদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ই বর্ষা ও কৃষি মৌসুমের প্রধান অংশ। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্বাভাস, কার্যকর পরিকল্পনা, পানি ও কৃষি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং জনসচেতনতা থাকলে এল নিনোর সম্ভাব্য ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বৈজ্ঞানিক তথ্য, সময়োপযোগী প্রস্তুতি এবং সমন্বিত উদ্যোগ। প্রকৃতিকে থামানো যায় না, কিন্তু জ্ঞান, পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অবশ্যই সম্ভব।

লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।