ডুবে কেন ঢাকা-চট্টগ্রাম ? সমাধান কোথায়?

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

সমীরণ বিশ্বাসঃপ্রতি বর্ষায় একই দৃশ্য। রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই পানির নিচে তলিয়ে যায়। চট্টগ্রামে কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণে রেললাইন প্লাবিত হয়, যানবাহন থেমে যায়, শিল্পাঞ্চল অচল হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় রেললাইনের ওপর পানি জমে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন শত শত যাত্রী নিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। এমন ঘটনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং বর্ষাকালের নিয়মিত বাস্তবতা।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়, অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প এবং দীর্ঘ পরিকল্পনার পরও কেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম বারবার ডুবে যায়? এর জন্য কি কেবল অতিবৃষ্টি দায়ী, নাকি প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সংঘাত, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনাই মূল কারণ?

বাস্তবতা হলো, ঢাকা ও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার চরিত্র এক নয়। দুই শহরের ভূপ্রকৃতি ভিন্ন, পানি প্রবাহের ধরন ভিন্ন, সমস্যার উৎসও ভিন্ন। কিন্তু একটি জায়গায় তারা অভিন্ন, প্রাকৃতিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে আমরা নিজেরাই ধ্বংস করেছি।

ঢাকা মূলত একটি নিম্নভূমির নগরী। একসময় শহরটির চারপাশে বিস্তৃত ছিল অসংখ্য খাল, বিল, জলাভূমি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা। এগুলো অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করে ধীরে ধীরে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে পাঠাত। প্রকৃতিই ছিল ঢাকার সবচেয়ে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। কিন্তু কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়নে সেই প্রাকৃতিক অবকাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছে। খাল ভরাট হয়েছে, জলাভূমি দখল হয়েছে, অনেক খাল বক্স কালভার্টের নিচে চাপা পড়েছে, আর অধিকাংশ ড্রেন প্রতিদিন প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যে আটকে যাচ্ছে। ফলে এক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণেই পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

সরকার ইতোমধ্যে ঢাকার ১৪১টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১০৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণে ৩৩টি এলাকা রয়েছে। খাল পুনঃখনন, ড্রেন সংস্কার, কালভার্ট উন্নয়ন, পাম্পিং স্টেশন সম্প্রসারণ এবং জলাধার পুনরুদ্ধারের কাজ চলমান। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে পানি সম্পদ খাতে ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বরাদ্দ সরকারের অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, প্রকল্পের সংখ্যা নয়; সঠিক নকশা, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

চট্টগ্রামের সমস্যা আরও জটিল। এটি পাহাড়, কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলিত ভূপ্রকৃতির ওপর গড়ে ওঠা একটি উপকূলীয় মহানগর। এখানে একই সময়ে তিন উৎস থেকে পানি আসে, স্থানীয় বৃষ্টির পানি, পাহাড়ি ঢল এবং জোয়ারের প্রভাব। ভারী বর্ষণে পাহাড় থেকে বিপুল পানি দ্রুত সমতলে নেমে আসে। একই সময়ে যদি বঙ্গোপসাগরে উচ্চ জোয়ার থাকে, তাহলে কর্ণফুলী নদীর পানির স্তর বেড়ে যায়। তখন শহরের খাল ও ড্রেন দিয়ে বৃষ্টির পানি নদীতে নামতে পারে না। বরং নদীর উচ্চ পানির চাপ নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রকৌশল বিজ্ঞানে একে ব্যাকওয়াটার ইফেক্ট বলা হয়।

এ কারণেই সমুদ্রের এত কাছে থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামে পানি জমে। অনেকের ধারণা, সমুদ্রের পাশে শহর হওয়ায় বৃষ্টির পানি সহজেই সাগরে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে পানি সাগরে পৌঁছাতে হলে খাল, নালা, ড্রেন ও নদীপথের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত থাকতে হয়। চট্টগ্রামের বহু প্রাকৃতিক খাল দখল, ভরাট ও সংকুচিত হওয়ায় সেই প্রবাহ আজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড় কাটা, জলাভূমি ধ্বংস এবং কংক্রিটনির্ভর নগরায়ন। আগে পাহাড় বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ধীরে ধীরে নিচে নামতে দিত। এখন পাহাড় কেটে বসতি ও স্থাপনা গড়ে তোলায় পানি দ্রুত নেমে আসে এবং ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ে। একই সঙ্গে খোলা মাঠ ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়ায় মাটির পানি শোষণের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে অধিকাংশ বৃষ্টির পানি সরাসরি ড্রেনে গিয়ে অল্প সময়েই ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে।

জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এখন স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাত আগের তুলনায় অনেক বেশি হচ্ছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জোয়ারের উচ্চতাও বাড়ছে। ফলে উপকূলীয় শহরগুলোর জলাবদ্ধতা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলও একই বাস্তবতার অংশ।

এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন শহর থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। জাপানের টোকিওতে বিশাল ভূগর্ভস্থ জলাধার ও টানেল অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করে পরে নদীতে ছেড়ে দেয়। সিঙ্গাপুর বৃষ্টির পানিকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং, কৃত্রিম জলাধার এবং ডিজিটাল স্টর্মওয়াটার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। চীনের স্পঞ্জ সিটি ধারণায় পারমিয়েবল পেভমেন্ট, গ্রিন রুফ, রেইন গার্ডেন এবং উন্মুক্ত সবুজ অবকাঠামোর মাধ্যমে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে নগর পানি ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে ভাবার। প্রথমত, সব খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধার দখলমুক্ত করে পুনরুদ্ধার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বিবেচনায় রেখে ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুনঃনকশা করতে হবে। তৃতীয়ত, বড় আকারের রিটেনশন পন্ড, ভূগর্ভস্থ জলাধার, আধুনিক পাম্পিং স্টেশন এবং চট্টগ্রামে স্বয়ংক্রিয় স্লুইসগেট নির্মাণ জরুরি। চতুর্থত, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা আনতে হবে। ড্রেনে বর্জ্য ফেলা বন্ধ না হলে কোনো অবকাঠামোই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকবে না।

ডিজিটাল প্রযুক্তিও এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), ডপলার রাডার, রিয়েল-টাইম বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ, স্মার্ট সেন্সর এবং স্বয়ংক্রিয় বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা যুক্ত হলে কোথায় পানি জমছে, কোথায় ড্রেন বন্ধ হচ্ছে বা কোন এলাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হবে। স্মার্ট সিটির অন্যতম শর্তই হলো তথ্যভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা।

তবে প্রযুক্তি বা অবকাঠামোই শেষ কথা নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বয়। ঢাকায় সিটি কর্পোরেশন, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা ও অন্যান্য সংস্থা; চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন্দর কর্তৃপক্ষ, রেলওয়ে ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান পৃথকভাবে কাজ করে। কিন্তু একীভূত পরিকল্পনা ও জবাবদিহির অভাবে বহু প্রকল্প প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারে না। তাই একটি শক্তিশালী সমন্বিত মেট্রোপলিটন ড্রেনেজ অথরিটি গঠন এখন সময়ের দাবি।

সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শুধু বৃষ্টির কারণে ডুবে না; ডুবে আমাদের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক জলপথ ধ্বংস, অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়হীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে। জলাবদ্ধতা এখন আর মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবহন, বিনিয়োগ এবং জলবায়ু সহনশীলতার অন্যতম বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ।

আজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আমরা কি প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে শহর গড়ব, নাকি প্রকৃতির নিয়মকে সম্মান করে টেকসই নগরায়নের পথে হাঁটব? উত্তরটি শুধু আগামী বর্ষার নয়; আগামী প্রজন্মের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার সঙ্গেও জড়িত।

লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।