বাংলাদেশের মৎস্যখাত এক কৌশলগত সন্ধিক্ষণে: কেন ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যাকুয়া ইনপুট, টেকসই উৎপাদন এবং রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির

তথ্যভিত্তিক ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

মেহেদী ইসলাম:দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মৎস্যখাতকে একটি উৎপাদন-সাফল্যের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু আজ খাতটি আরও গুরুত্বপূর্ণ এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে।

এখন আর মূল প্রশ্ন নয়, কীভাবে আরও বেশি মাছ উৎপাদন করা যায়। মূল প্রশ্ন হলো, কীভাবে প্রতিটি জলাশয়, প্রতিটি পুকুর এবং প্রতিটি উৎপাদন চক্র থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা যায়, একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।

সংখ্যাগুলো বাংলাদেশের অসাধারণ অর্জনের সাক্ষ্য বহন করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫০.১৮ লাখ মেট্রিক টন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সুপ্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন ছিল ৬.২৯ লাখ মেট্রিক টন, যা জাতীয় উৎপাদনের ১২.৫৩ শতাংশ।

এই সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। উন্নত পোনা, আধুনিক চাষ প্রযুক্তি, মানসম্মত খাদ্য, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং বেসরকারি ও সরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এই অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এই সাফল্যের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও লুকিয়ে আছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন ছিল ৭.০৬ লাখ মেট্রিক টন, যা ২০২৩-২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৬.২৯ লাখ মেট্রিক টনে। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত আহরণ, আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ইতোমধ্যেই প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিচ্ছে।

এই বাস্তবতায় আমাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু বদলাতে হবে। বাংলাদেশের মৎস্যখাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না কত টন খাদ্য, ওষুধ বা রাসায়নিক বিক্রি হলো তার ওপর। বরং নির্ধারিত হবে কতটা বিজ্ঞানসম্মতভাবে এসব ইনপুট ব্যবহার করা হলো তার ওপর। আজও অনেক খামারে উৎপাদন ক্ষতির মূল কারণ হলো দুর্বল পানির গুণগত মান, অপর্যাপ্ত বায়োসিকিউরিটি, রোগব্যাধি, স্ট্রেসজনিত মৃত্যু এবং অযৌক্তিক ওষুধ ব্যবহার। ফলাফল একটাই—উৎপাদন খরচ বাড়ে, লাভ কমে এবং রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল হয়। এ কারণেই আগামী দিনের অ্যাকুয়াকালচার শিল্পে কেবল রোগের চিকিৎসা যথেষ্ট হবে না।

ভবিষ্যৎ হবে প্রতিরোধভিত্তিক
বিজ্ঞানভিত্তিক প্রোবায়োটিক, কার্যকর পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, পানি মান নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, ইমিউন সাপোর্ট সল্যুশন, রেসিড্যু-ফ্রি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল মনিটরিং হবে নতুন প্রতিযোগিতামূলক শক্তি। এসব শুধু পণ্য নয়। এসব ভবিষ্যৎ বাজারে প্রবেশের পাসপোর্ট। বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে ক্রেতারা শুধু মাছ কিনছে না; তারা কিনছে নিরাপত্তা; তারা কিনছে ট্রেসেবিলিটি; তারা কিনছে টেকসই উৎপাদনের নিশ্চয়তা।তারা কিনছে খাদ্য নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের প্রতিশ্রুতি।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭১,৪৭৭ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ৪,৩৭৬ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। কিন্তু এটিই শেষ গন্তব্য নয়। বাংলাদেশের সামনে আরও বড় সুযোগ অপেক্ষা করছে। বিশাল সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রের সম্পদ, টুনা ও পেলাজিক মৎস্য আহরণ, আধুনিক চিংড়ি চাষ, জেনেটিক উন্নয়ন, হ্যাচারি প্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানি বাজার সব মিলিয়ে দেশের মৎস্যখাত আগামী দশকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত না সর্বোচ্চ উৎপাদন। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত Maximum Sustainable Yield (MSY)—অর্থাৎ এমন উৎপাদন যা সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করবে, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

একজন মৎস্য জীববিজ্ঞানী এবং গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যাকুয়াকালচার, প্রাণিস্বাস্থ্য ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একজন পেশাজীবী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের পরবর্তী মৎস্য বিপ্লব আসবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দায়িত্বশীল অ্যাকুয়া ইনপুট ব্যবস্থাপনা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমন্বয় থেকে।

প্রকৃতি থেকে আরও বেশি আহরণ নয়
প্রতিটি উৎপাদন ইউনিট থেকে আরও বেশি মূল্য সৃষ্টি সেই লক্ষ্যেই এগোতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী মৎস্যখাত হবে সেই খাত, যা শুধু মাছ উৎপাদন করবে না, বরং টেকসইভাবে সম্পদ সংরক্ষণ করে জাতীয় অর্থনীতি, রপ্তানি এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাবে।বাংলাদেশের মৎস্যখাতের আগামী অধ্যায় ঠিক সেখান থেকেই শুরু হবে।

লেখক: Fisheries Biologist | Agribusiness Strategist | Aquaculture Marketing Professional

তথ্যসূত্র: মৎস্য অধিদপ্তর (DoF) বাংলাদেশ, Yearbook of Fisheries Statistics 2023-24; National Fisheries Week 2024; FAO Fisheries and Aquaculture Data; বাংলাদেশ মৎস্য ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি পরিসংখ্যান ২০২৩-২৪।