ফোকাস ডেস্ক: দেশের বৃহত্তম কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট' (বারি) বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের অদক্ষতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বারি’র একাধিক কৃষিবিজ্ঞানী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে পরিচালক ও মহাপরিচালক (ডিজি) পদে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের পদায়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন, কৃষি গবেষণা কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক উৎপাদন প্রক্রিয়া বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা এবং নিবিড় বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। উচ্চ ফলনশীল ফসলের নতুন জাত, প্রজনন বীজ উৎপাদন এবং আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতা ও নিষ্ঠা অপরিহার্য। একজন বিজ্ঞানী শিক্ষানবীশ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পর্যায়ক্রমে ঊর্ধ্বতন, প্রধান এবং মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পান। এই স্তরে পৌঁছাতে একজন বিজ্ঞানীর দীর্ঘ ২৭ থেকে ৩০ বছর সময় লেগে যায়। অতঃপর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মাত্র আটজনকে পরিচালক পদে পদায়ন করা হয় এবং তাঁদের মধ্য থেকেই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মহাপরিচালক (গ্রেড-১) পদে নিয়োগ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। অথচ বর্তমান নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এই শীর্ষ পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রাখা হচ্ছে, যা সামগ্রিক গবেষণা কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
এদেশে কৃষির ইতিহাস অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। ১৮৮০ সালে ফ্যামিন কমিশনের পরামর্শে 'Bengal Department of Agriculture' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ১৯০৫ সালে 'Nuclear Agricultural Research Laboratory' এবং ১৯০৮ সালে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে ১৬১.২ হেক্টর জমি নিয়ে ঢাকা ফার্ম স্থাপন করা হয়। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে এটি 'East Pakistan Department of Agriculture (Research and extension)' নামে পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে ২৬০ হেক্টর জমি নিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করে ১৯৬৮ সালে 'Directorate of Agriculture (Research and Education)' প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং XXXII অনুযায়ী সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে বিএআরসি (BARC) গঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালের ৪ঠা আগস্ট শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি উন্নয়ন ও জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং LXII এর মাধ্যমে 'Directorate of Agriculture (Research and Education)' বিলুপ্ত করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) প্রতিষ্ঠা করেন।
বিএআরআই (BARI) এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৬৭৩টি জাত ও ৬৭২টি আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বর্তমানে দেশব্যাপী ৪টি উইং, ৬টি ফসল গবেষণা কেন্দ্র, ১৭টি গবেষণা বিভাগ, ৮টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ২৮টি উপকেন্দ্র, ১২টি খামার গবেষণা পদ্ধতি ও উন্নয়ন এলাকা (FSRD) এবং ৮৫টি বহুস্থানিক গবেষণা এলাকার (MLT) মাধ্যমে এর বিশাল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা আক্ষেপ করে জানান, প্রতিষ্ঠানের কলেবর ও পরিধি বাড়লেও সেই অনুপাতে জনবল বাড়েনি। এই তীব্র জনবল সংকটের কারণে গবেষণা ব্যাহত হচ্ছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অধরা থেকে যাচ্ছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে অবিলম্বে বারি'র নতুন পদ সৃজন বা জনবল কাঠামো রিভিজিট করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞানীদের অভিযোগ, বিগত ২০০৯ এবং ২০১৭ সালে দুই দফায় প্রতিষ্ঠানের প্রজ্ঞাপন পরিবর্তন করে একদল স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় দেশের কৃষিব্যবস্থাকে ফের আমদানিনির্ভর করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে স্বায়ত্তশাসিত এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে প্রশাসনের (এডমিন) হাতে। ফলে কৃষিবিজ্ঞানীরা বর্তমানে তাঁদের মূল উদ্ভাবনী কাজের চেয়ে প্রশাসনিক জটিলতা মোকাবিলা করতেই বেশি ব্যস্ত থাকছেন।
বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭০০ দক্ষ বিজ্ঞানী রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই উচ্চতর পিএইচডি ও পোস্ট-ডক ডিগ্রিধারী। এছাড়া সব মিলিয়ে ৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন 'নন-টেকনিক্যাল' প্রশাসনিক শিক্ষাগত যোগ্যতার কর্মকর্তারা এখন ঠিক করে দিচ্ছেন কোন বিষয়ের ওপর গবেষণা হবে বা কোন বিজ্ঞানী উচ্চতর ডিগ্রি নেবেন। এমনকি বিদেশের মাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক কোনো সেমিনার বা প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে হলেও সেখানে প্রশাসনের প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যা বিজ্ঞানীদের মতে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
নেতৃত্বের এই দীর্ঘসূত্রতা ও শূন্যতার কারণে প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ও গবেষণা কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, একবার নেতৃত্বহীন অবস্থায় গবেষণা ব্যাহত হলে তা পুনরুদ্ধার করতে অতিরিক্ত ১ থেকে ২ বছর সময় লেগে যায়, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিরাট ক্ষতি। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয় ও সচিব মহোদয়ের কাজের ধীরগতির কারণে বারি-র বৈজ্ঞানিক সমাজ দেশের কৃষি খাত রক্ষার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।



