জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: কৃষি খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত উপেক্ষিত-এএফবি

ফোকাস

স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এটি যথেষ্ট সাহসী নয় বলে মন্তব্য করেছে এগ্রিকালচারিস্টস্ ফোরাম অব বাংলাদেশ (এএফবি)।

সংগঠনটির মতে, বাজেটে কর ও শুল্ক ছাড়, খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ কৃষকদের জন্য সহায়ক হলেও বৃহত্তর কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির হার বাস্তবতার তুলনায় অনেক কম।

শনিবার (২০ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত “জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: প্রসঙ্গ কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এ মতামত তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এগ্রিকালচারিস্টস্ ফোরাম অব বাংলাদেশ (এএফবি)।

সূচনা বক্তব্যে এএফবির মহাসচিব কৃষিবিদ শেখ মুহাম্মদ মাসউদ বলেন, দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১১.৩৮ শতাংশ এবং প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ জনশক্তি প্রত্যক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই কৃষকের উন্নয়ন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬.৩৪ শতাংশ বেশি। তবে বৃহত্তর কৃষি খাতে (কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ, বন, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমি ও পানি সম্পদ) মোট বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ২.২৫ শতাংশ, যা বাজেটের সামগ্রিক ১৮.৭৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং প্রায় ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে কার্যত সংকুচিত বরাদ্দের শামিল।

আলোচনায় বলা হয়, এবারের বাজেটে সারের আমদানি ও বিপণনে ভ্যাট প্রত্যাহার, কীটনাশক আমদানিতে ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর (এডভান্স ট্যাক্স) প্রত্যাহার, ৩৬টি এগ্রোকেমিক্যাল কাঁচামালে ভ্যাট অব্যাহতি, ভেটেরিনারি ওষুধ ও ইনপুটে শুল্ক ছাড় এবং পোল্ট্রি ও হ্যাচারি যন্ত্রপাতিতে শুল্ক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং উৎপাদকরা উপকৃত হবেন।

এছাড়া খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৩.১৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে ২৪.৫০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা, পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে আম চাষিদের জন্য বিশেষ হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগকে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তবে এএফবির পক্ষ থেকে বলা হয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ২ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৬১৮ কোটি টাকা বা ১৮.৪৫ শতাংশ কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অথচ জিডিপিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ৪ থেকে ৫.৫ শতাংশের বেশি।

সংগঠনটির মতে, হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য কোনো বিশেষ পুনর্বাসন তহবিল নেই, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ অপ্রতুল, চরাঞ্চল ও পতিত জমি আবাদে কার্যকর উদ্যোগ অনুপস্থিত এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি সম্প্রসারণে শক্তিশালী নীতিগত পদক্ষেপ দেখা যায়নি। একই সঙ্গে দুগ্ধ খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষকের সহজ ঋণপ্রাপ্তি এবং প্রাণিসম্পদ খাতে বীমা চালুর বিষয়েও বাজেটে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই বলে উল্লেখ করা হয়।

গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা কৃষি খাতে মোট বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা, কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, হাওর উন্নয়ন ও শস্য বীমা তহবিল গঠন, উপকূলীয় কৃষি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা, পতিত জমি আবাদে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও রপ্তানির জন্য বিশেষায়িত পার্ক গড়ে তোলা, প্রকৃত কৃষকের কাছে কৃষিঋণ পৌঁছে দেওয়া এবং প্রাণিসম্পদ খাতে ডেইরি ও পোল্ট্রি বীমা চালুর সুপারিশ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. মো. ইলিয়াছ মোল্লা এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ সফিউল্লাহ, সাবেক সচিব নুরুল আলম, সাবেক সচিব ড. শরীফুল আলম জিন্নাহ, কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি আহসানুজ্জান লিন্টু, পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ দেওয়ান আলী হায়দার আলমগীর, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এএসএম শাহরিয়ার কবির, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সুজাহাঙ্গীর কবির সরকার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ফজলুল হক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মোশাররফ হোসেন, এএফবির উপদেষ্টা কৃষিবিদ গোলাম রাব্বানী, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. আব্দুর জব্বার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. মো. সফিউদ্দিন এবং এএফবির সিনিয়র সহ-সভাপতি আশরাফউদ্দিন আহমদ ও যুগ্ম মহাসচিব ডা. মো. শহীদুল্লাহ শরীফ।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মো. মিজানুর রহমান।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের কৃষির আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদন নয়; বরং সংরক্ষণ, মূল্য সংযোজন, বাজারজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার। সেই বিবেচনায় এবারের বাজেট কৃষিকে সচল রাখতে সহায়ক হলেও কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরও দূরদর্শী ও উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ প্রয়োজন।