
সমীরণ বিশ্বাস:বালাই দমনে ‘ককটেল স্প্রে’: কৃষির জন্য নীরব মরণফাঁদ। বাংলাদেশের কৃষি আজ নানা সম্ভাবনার পাশাপাশি বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ ও বৈজ্ঞানিক চাষাবাদের প্রসার যেমন কৃষিকে এগিয়ে নিচ্ছে, তেমনি অপরিকল্পিত ও অজ্ঞতাপ্রসূত কিছু চর্চা কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো, বালাই দমনে ‘ককটেল স্প্রে’ ব্যবহার। কৃষকরা নিজেরা বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, মাকড়নাশক, হরমোন ও মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট একসাথে মিশিয়ে নতুন ধরনের স্প্রে তৈরি করছেন, যাকে তারা ‘ককটেল’ নামে অভিহিত করছেন। এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, যা কৃষির জন্য এক নীরব মরণব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে।
ককটেল স্প্রে কী এবং কেন এটি বিপজ্জনক:
ককটেল স্প্রে বলতে বোঝায় একাধিক কৃষি রাসায়নিককে একসাথে মিশিয়ে তৈরি একটি অনির্ধারিত ও পরীক্ষাবিহীন মিশ্রণ। সাধারণত কৃষকরা মনে করেন, একাধিক বালাইনাশক একসাথে প্রয়োগ করলে সব ধরনের পোকা-মাকড় ও রোগ একবারেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। প্রতিটি রাসায়নিকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, কার্যপ্রণালী ও প্রতিক্রিয়া থাকে। এগুলো একসাথে মেশালে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন যৌগ তৈরি হতে পারে, যা গাছের জন্য ক্ষতিকর, এমনকি পুরো ফসল নষ্ট করে দিতে পারে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা: ডিডিটি’র অভিশাপ:
একসময় শক্তিশালী কীটনাশক হিসেবে ডিডিটি ব্যবহৃত হতো। এটি আবিষ্কারের জন্য ১৯৪৮ সালে সুইস বিজ্ঞানী পল হারম্যান মুলার নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই কীটনাশক অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, এটি পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফলস্বরূপ, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। এই ইতিহাস আমাদের শেখায়, যে কোনো রাসায়নিকের অন্ধ ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ককটেল স্প্রে ঠিক সেই একই ঝুঁকির দিকে আমাদের ঠেলে দিচ্ছে।
কৃষকরা কেন ককটেল স্প্রে ব্যবহার করছেন:
কৃষকদের এই প্রবণতার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে, অনুকরণপ্রবণতা: গ্রামের এক কৃষক যদি দেখে অন্য কেউ ককটেল ব্যবহার করে ভালো ফল পাচ্ছে (যদিও তা সাময়িক হতে পারে), তখন সে-ও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে। সঠিক রোগ নির্ণয়ের অভাব: অনেক কৃষক কিংবা বালাইনাশক বিক্রেতা সঠিকভাবে রোগ বা পোকা শনাক্ত করতে পারেন না। ফলে তারা “সবকিছু একসাথে দিলে কিছু না কিছু কাজ করবে” এই ধারণা থেকে একাধিক রাসায়নিক মিশিয়ে ব্যবহার করেন। বিক্রেতাদের প্রভাব: কিছু অসাধু বিক্রেতা বিক্রি বাড়ানোর জন্য কৃষকদের একাধিক পণ্য একসাথে ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এতে তাদের বিক্রি বাড়ে, কিন্তু কৃষকের ক্ষতি হয়। খরচ ও সময় বাঁচানোর চেষ্টা: স্প্রে করার শ্রম খরচ বেশি হওয়ায় কৃষকরা একবারেই সবকিছু প্রয়োগ করতে চান। বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলে দূর থেকে পানি এনে স্প্রে করতে হয়, তাই একবারেই কাজ শেষ করার প্রবণতা থাকে। ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য: অনেক সময় একক বালাইনাশক কাজ না করায় কৃষকরা একাধিক পণ্য একসাথে ব্যবহার করতে বাধ্য হন, কারণ বাজারে ভেজাল বা কম কার্যকর পণ্য পাওয়া যায়।
ককটেল স্প্রের ভয়াবহ প্রভাব
ফসলের ক্ষতি: রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে তৈরি নতুন যৌগ গাছের জন্য বিষাক্ত হতে পারে, ফলে পাতা ঝলসে যাওয়া, বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাওয়া বা সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটে। অর্থনৈতিক ক্ষতি: একাধিক বালাইনাশক ব্যবহার করায় খরচ বেড়ে যায়, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। এতে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি: অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিকের ব্যবহার মাটির উর্বরতা কমায়, উপকারী পোকামাকড় ধ্বংস করে এবং পরিবেশ দূষণ বাড়ায়। প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি: পোকামাকড় ও রোগজীবাণু ধীরে ধীরে বালাইনাশকের প্রতি প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, ফলে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও বেশি মাত্রার বিষ প্রয়োগ করতে হয়। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি: ফসলের মধ্যে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ জমে থাকে, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নানা রোগের কারণ হতে পারে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
কীভাবে বুঝবেন ককটেল ক্ষতিকর:
কৃষকরা কিছু লক্ষণ দেখে সহজেই বুঝতে পারেন যে মিশ্রণটি ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে, দ্রবণ মেশানোর পর পানি গরম হয়ে যাওয়া, বুদবুদ বা ফেনা তৈরি হওয়া, দ্রবণের রঙ পরিবর্তন হওয়া, নিচে গাদ বা অধক্ষেপ জমা হওয়া, এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে রাসায়নিক বিক্রিয়া হচ্ছে, যা গাছের জন্য ক্ষতিকর।
করণীয়: নিরাপদ কৃষির পথে:
এই সমস্যার সমাধানে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি, ককটেল স্প্রে পরিহার: অপ্রয়োজনীয় ও অনুমোদনহীন মিশ্রণ ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: কোনো বালাইনাশক প্রয়োগের আগে কৃষি কর্মকর্তা বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে রোগ শনাক্ত করে সুনির্দিষ্ট সমাধান গ্রহণ করতে হবে। অনুমোদিত মিশ্রণ ব্যবহার: বাজারে অনেক কোম্পানি পরীক্ষিত ও অনুমোদিত মিশ্রণ পণ্য সরবরাহ করে। এগুলো ব্যবহার করা নিরাপদ। প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি: কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, যাতে তারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে পারেন। ভেজাল প্রতিরোধ: সরকারকে বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের বালাইনাশক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
কৃষি আমাদের দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে বৈজ্ঞানিক ও নিরাপদ চর্চার বিকল্প নেই। ককটেল স্প্রে সাময়িকভাবে কিছু ফল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি কৃষির জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই এখনই সচেতন হতে হবে, ককটেলকে না বলতে হবে, নিরাপদ কৃষিকে হ্যাঁ বলতে হবে। কৃষকের সঠিক জ্ঞান, দায়িত্বশীল বিক্রেতা এবং কার্যকর নীতিমালার সমন্বয়েই আমরা একটি টেকসই ও নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি।
লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।
























