সবুজায়নকে পরাগায়ন অবকাঠামোতে রূপ দিতে হলে গাছের সংখ্যা নয়, ফুলের সময়, নেকটার-পোলেনের মান এবং মৌচাষি ক্লাস্টারের প্রয়োজনকে নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে।
ড. মনিরুল ইসলাম
উপরিচালক, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়া
মূল কথা: ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে যদি ডার্থ পিরিয়ড-ভিত্তিক মৌবৃক্ষ পরিকল্পনা যুক্ত করা যায়, তবে মৌমাছির খাদ্যাভাব কমবে, মধু উৎপাদন বাড়বে, সিরাপ নির্ভরতা কমবে এবং কৃষকের ফসলের পরাগায়ন সুবিধা বৃদ্ধি পাবে।
ভূমিকা
বাংলাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে বৃহৎ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, সেটিকে কেবল পরিবেশ রক্ষা, ছায়া বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না। এই কর্মসূচিকে কৃষি, মধু উৎপাদন, ফসলের পরাগায়ন, মৌমাছির স্বাস্থ্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। কারণ একটি গাছ শুধু অক্সিজেন বা ছায়া দেয় না; সঠিক প্রজাতির গাছ হলে সেটি মৌমাছির খাদ্য দেয়, ফসলের ফলন বাড়ায়, মৌচাষির খরচ কমায় এবং কৃষকের আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এবং গাছের পরিচর্যা ও বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের কথাও এসেছে। এই মনিটরিং ব্যবস্থায় যদি শুধু ‘কতটি গাছ লাগানো হলো’ তথ্য থাকে, তাহলে কর্মসূচির কৃষি-অর্থনৈতিক মূল্য অনেকটাই সীমিত থাকবে। বরং কোন প্রজাতির গাছ, কোথায় লাগানো হলো, কোন মাসে ফুল দেয়, নেকটার-পোলেনের মান কত, আশপাশে মৌচাষি ক্লাস্টার আছে কি না—এসব তথ্যকে যুক্ত করতে হবে। তখন বৃক্ষরোপণ হবে শুধু সবুজায়ন নয়, জাতীয় পরাগায়ন অবকাঠামো নির্মাণেরও ভিত্তি।
মৌচাষের নীরব সংকট: ডার্থ পিরিয়ড
বাংলাদেশে আধুনিক মৌচাষের সবচেয়ে বড় নীরব সংকট হলো ‘ডার্থ পিরিয়ড’। ডার্থ পিরিয়ড বলতে এমন সময়কে বোঝায়, যখন মাঠে পর্যাপ্ত ফুল থাকে না এবং মৌমাছি নেকটার ও পোলেন কম পায়। নেকটার মৌমাছির শক্তির উৎস; আর পোলেন হলো প্রোটিনের উৎস, যা ব্রুড বা বাচ্চা পালনের জন্য অপরিহার্য। বাংলাপিডিয়ার Bee Forage Plant নিবন্ধে ফুলগাছকে মৌমাছির জীবনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; সেখানে বলা হয়েছে, পোলেন ব্রুডের খাদ্য এবং নেকটার উড়াল, খাদ্য সংগ্রহ ও ব্রুড পালনের শক্তি হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় করা একটি গবেষণায় মৌ-উদ্ভিদকে মৌসুমভিত্তিকভাবে তিন ভাগে দেখানো হয়েছে; ডিসেম্বর থেকে মার্চ honey flow season, এপ্রিল থেকে জুলাই dearth period এবং আগস্ট থেকে নভেম্বর extended period। ওই গবেষণায় দেখা যায়, আগস্ট-নভেম্বর সময়ে মাত্র চারটি মৌ-উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছিল, যার বেশিরভাগই প্রধানত পোলেন দেয়। এই তথ্য আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মৌচাষিরা সাধারণত ডিসেম্বর-মার্চের সরিষা, কালোজিরা, ধনিয়া, লিচু ও কুমড়াজাতীয় ফুলের মৌসুমকে মধুর প্রধান সময় মনে করেন; কিন্তু ওই মৌসুমে বেশি মধু পেতে হলে তার আগের এপ্রিল-নভেম্বর সময়েই কলোনিকে শক্তিশালী রাখতে হয়।
অভিজ্ঞ মৌচাষিরা জানেন, ডার্থ পিরিয়ডে কলোনি দুর্বল হলে সরিষা মৌসুমে বাক্স থাকলেও মধু কম আসে। দুর্বল কলোনিতে কর্মী মৌমাছি কম থাকে, ব্রুড কম হয়, রাণীর ডিম পাড়ার গতি কমে যায় এবং পোলেন স্টোর দুর্বল থাকে। ফলে ফুলের মৌসুম শুরু হলেও মৌমাছি দ্রুত জনসংখ্যা বাড়াতে পারে না। তাই ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ‘মৌবান্ধব বৃক্ষরোপণ’ হিসেবে ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।
গাছ নির্বাচন: সৌন্দর্য নয়, নেকটার-পোলেন ও ফুলের সময়
সব গাছ মৌমাছির জন্য সমান উপকারী নয়। অনেক গাছ দেখতে সুন্দর হলেও ডার্থ পিরিয়ডে মৌমাছিকে বাস্তব খাদ্য দেয় না। আবার কিছু গাছ নেকটার দেয়, কিছু গাছ পোলেন দেয়, আর কিছু গাছ নেকটার-পোলেন দুটোই দেয়। বাংলাপিডিয়ার Honey Plant নিবন্ধে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মৌমাছি কিছু উদ্ভিদে শুধু পোলেনের জন্য, কিছুতে শুধু নেকটারের জন্য এবং কিছুতে নেকটার-পোলেন উভয়ের জন্য যায়। তাই বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে ‘সৌন্দর্য’ নয়, ফুল ফোটার সময়, নেকটার-পোলেনের মান, স্থানীয় পরিবেশ এবং মৌচাষি ক্লাস্টারের দূরত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশে ৬৫টি plantation tree species নিয়ে করা phenology গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ গাছের ফুল ফোটার প্রধান সময় মার্চ-মে; কিন্তু আগস্ট-নভেম্বর সময়ে ফুল দেওয়া গাছ তুলনামূলক কম। একই গবেষণায় বাবলা, সোনালু, সিলকড়ই, পিতরাজ, কদম, খয়ের, বকুল, কেওড়া, বরইসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গাছের ফুল ফোটার সময় উল্লেখ আছে। ডার্থ পিরিয়ড ব্যবস্থাপনার জন্য এ ধরনের তথ্য অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ মৌচাষের পরিকল্পনা ক্যালেন্ডারভিত্তিক না হলে কলোনির খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
কেন ৮-১০ কোটি মৌবান্ধব গাছ জরুরি
Krishi Gobeshona Foundation-এর প্রকল্প তথ্যে বাংলাদেশে ৬০ হাজারের বেশি Apis mellifera কলোনির কথা উল্লেখ আছে। একই সূত্রে খারাপ ব্যবস্থাপনা, রোগ-পোকা, কীটনাশকের অপব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক কলোনি ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। একটি মৌকলোনির বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পোলেন ও নেকটার দরকার হয়। তাই জাতীয় পর্যায়ে পোলেন-নেকটার নিরাপত্তা শুধু মৌচাষির ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবিকার বিষয়।
সুতরাং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মধ্যে অন্তত ৮-১০ কোটি গাছ নেকটার-পোলেনসমৃদ্ধ মৌবান্ধব প্রজাতির হওয়া উচিত। এর মধ্যে অন্তত ৪-৫ কোটি গাছ সরাসরি মৌচাষি হাব অঞ্চলে লাগানো দরকার। উত্তরাঞ্চলের সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, দিনাজপুর ও গাইবান্ধা; দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা, নড়াইল, মাগুরা ও বাগেরহাট; এবং টাঙ্গাইল, গাজীপুর, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে বিশেষ মৌবৃক্ষ বেল্ট তৈরি করা যেতে পারে।
আরডিএ, বগুড়ায় জলবায়ু-সহনীয় মৌচাষ, রাণী মৌমাছি উন্নয়ন, মৌপণ্যের মূল্যশৃঙ্খলা এবং মাঠভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিয়ে যে গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এগোচ্ছে, সেটি এই জাতীয় নীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা দিতে পারে। পল্লী উন্নয়ন, মৌচাষ, কৃষি সম্প্রসারণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে নিয়ে মাঠপর্যায়ে মডেল মৌবৃক্ষ করিডোর তৈরি করা গেলে কর্মসূচির প্রভাব সরাসরি মৌচাষি ও কৃষকের ঘরে পৌঁছাবে।
নীতিগত অগ্রাধিকার: পাঁচটি কাজ আগে
১. ২৫ কোটি গাছের মধ্যে ৮-১০ কোটি গাছ মৌবান্ধব নেকটার-পোলেনসমৃদ্ধ প্রজাতি হিসেবে নির্ধারণ।
২. মৌচাষি হাবের ২-৩ কিলোমিটারের মধ্যে ফুলের ধারাবাহিক উৎস নিশ্চিত করা।
৩. ডিজিটাল মনিটরিংয়ে flowering month, nectar value, pollen value ও apiary distance যুক্ত করা।
৪. আরডিএ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ মৌচাষী সোসাইটির সমন্বয়ে National Bee Forage Taskforce গঠন।
৫. সাফল্যের সূচক হিসেবে survival rate, ফুলের উপস্থিতি, সিরাপ খরচ কমা, কলোনি শক্তি, মধু ও ফসলের ফলন বৃদ্ধি পরিমাপ।
কোথায় কোন ধরনের গাছ
রাস্তার পাশে রোপণের জন্য কড়ই, বাবলা, শিরীষ, সিলকড়ই, সোনালু, জারুল, কদম, বকুল, নিম, পিতরাজ, তেঁতুল ও খয়েরকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। খেতের আইলে বড় ছায়াদার গাছের বদলে সজিনা, বরই, নিম, বকুল, কামিনী, রঙ্গন, জবা, কাঞ্চন, গ্লিরিসিডিয়া, অপরাজিতা ও মাধবীলতার মতো গাছ ও লতা ব্যবহার করা যায়, যাতে ফসলের আলো-বাতাস কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মৌমাছির খাদ্যও বাড়ে।
পতিত জমি, খাস জমি ও চরাঞ্চলে ব্লক আকারে বাবলা-কড়ই-শিরীষ-সোনালু-জারুল-কদম-বকুল-বরই-তেঁতুল-মহুয়া মিশ্র বনায়ন করা যেতে পারে। দক্ষিণ উপকূলে কেওড়া, করচ, হিজল, কদম, জারুল, বকুল, জংলি বাদাম, নাগেশ্বর ও বাবলা বিশেষভাবে উপযোগী হতে পারে। তবে যে অঞ্চলে যে প্রজাতি স্থানীয়ভাবে মানানসই, সেখানকার মাটি, পানি, লবণাক্ততা, বৃষ্টিপাত, কৃষিজমির ধরন এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য বিবেচনায় চূড়ান্ত প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে।
সিরাপ নির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পথ
ডার্থ পিরিয়ডে মৌচাষিরা বাধ্য হয়ে চিনি বা মিষ্টির সিরাপ খাওয়ান। কিন্তু চিনি মৌমাছিকে শুধু তাৎক্ষণিক শক্তি দেয়; এটি পোলেনের বিকল্প নয়। Frontiers in Bee Science-এ প্রকাশিত ২০২৪ সালের বাংলাদেশভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ডার্থ পিরিয়ডে supplementary feeding মৌকলোনির টিকে থাকা ও উৎপাদনশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ওই গবেষণায় আরও দেখা যায়, sugar syrup ছিল সবচেয়ে ব্যয়বহুল খাদ্য-পরিপূরক; pumpkin syrup ব্যবহার করলে sugar feeding cost প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব।
এই গবেষণা থেকে নীতিগত শিক্ষা হলো—মৌচাষিকে শুধু চিনি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো ডার্থ পিরিয়ডে প্রাকৃতিক নেকটার-পোলেন উৎস তৈরি করা। অর্থাৎ গাছ লাগাতে হবে এমনভাবে, যাতে এপ্রিল-নভেম্বর সময়ে মৌমাছির খাদ্যশূন্যতা কমে। এতে সিরাপের খরচ কমবে, ব্রুড ভালো হবে, কর্মী মৌমাছি বাড়বে এবং নভেম্বর-মার্চের প্রধান ফুল মৌসুমে বেশি মধু সংগ্রহ সম্ভব হবে।
মধুর বাইরে বড় লাভ: ফসলের পরাগায়ন
মৌমাছির কাজ শুধু মধু তৈরি করা নয়; ফসলের পরাগায়ন করা। সরিষা, কালোজিরা, ধনিয়া, লিচু, কুমড়া ও বিভিন্ন শাকসবজির ক্ষেত্রে মৌমাছির পরাগায়ন ফলন ও গুণগত মানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে সরিষা নিয়ে গবেষণায় honey bee pollination-এর ফলে pod per plant, seeds per pod এবং seed yield per plant বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ডার্থ পিরিয়ডে মৌমাছিকে শক্তিশালী রাখা গেলে প্রধান ফুল মৌসুমে শুধু মধু নয়, ফসলের ফলনও বাড়বে।
এই কারণেই মৌবৃক্ষ নীতি কৃষি মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা সংস্থা, মৌচাষি সংগঠন এবং কৃষক সমিতির সমন্বিত নীতি হওয়া দরকার। মৌচাষকে আলাদা একটি ক্ষুদ্র খাত হিসেবে না দেখে ফসল উৎপাদন ব্যবস্থার পরাগায়ন অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
প্রস্তাবিত জাতীয় মৌবৃক্ষ করিডোর
নীতিগতভাবে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে একটি আলাদা উপাদান যুক্ত করা উচিত: জাতীয় মৌবৃক্ষ করিডোর। এই করিডোর হবে রাস্তার দুই পাশ, খালপাড়, নদীপাড়, রেলপথ, খাস জমি, চরাঞ্চল, পতিত জমি, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কৃষিজমির আইল ঘিরে। প্রতিটি মৌচাষি হাবের ২-৩ কিলোমিটারের মধ্যে পর্যাপ্ত ফুলের উৎস থাকতে হবে। কারণ মৌমাছি দূরে যেতে পারে, কিন্তু বেশি দূরে গেলে শক্তি ব্যয় বাড়ে এবং কলোনির কার্যকারিতা কমে। তাই শুধু জেলা পর্যায়ে গাছ লাগালেই হবে না; apiary cluster বা মৌচাষি ক্লাস্টারের চারপাশে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগাতে হবে।
এই কর্মসূচির জন্য একটি বাস্তবসম্মত গাছের অনুপাত হতে পারে: ৩০% বাবলা-কড়ই-শিরীষ-খয়ের, ২০% সোনালু-জারুল-কদম-বকুল, ২০% হিজল-করচ-কেওড়া-জলাভূমির গাছ, ১৫% বরই-সজিনা-তেঁতুল-আমলকি-বহেরা-হরিতকি, ১০% কামিনী-রঙ্গন-জবা-মাধবীলতা-অপরাজিতা এবং ৫% গবেষণা/ট্রায়াল প্রজাতি। ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির মতো প্রজাতি সীমিত ও সতর্কভাবে ব্যবহার করা উচিত; monoculture করলে জীববৈচিত্র্য কমে এবং ডার্থ পিরিয়ডের খাদ্য সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয় না।
ডিজিটাল মনিটরিংয়ে কী থাকা দরকার
সরকারের মনিটরিং অ্যাপে শুধু গাছের সংখ্যা থাকলে হবে না। সেখানে প্রজাতির নাম, রোপণের স্থান, survival rate, flowering month, nectar value, pollen value, nearby apiary distance এবং স্থানীয় মৌচাষি ক্লাস্টারের তথ্য যুক্ত করতে হবে। কোন মৌসুমে কোন এলাকায় ফুলের ঘাটতি বেশি, কোন গাছ বেঁচে থাকছে, কোন গাছ মৌমাছির খাদ্যে বেশি সহায়তা দিচ্ছে—এই তথ্যগুলো পরবর্তী বছরের রোপণ পরিকল্পনা উন্নত করবে।
এ কাজের জন্য বন বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বিশ্ববিদ্যালয়, Krishi Gobeshona Foundation এবং বাংলাদেশ মৌচাষী সোসাইটিকে নিয়ে একটি National Bee Forage Taskforce গঠন করা যেতে পারে। এই টাস্কফোর্স গাছের তালিকা, অঞ্চলভিত্তিক মৌবৃক্ষ ক্যালেন্ডার, নার্সারি নির্দেশিকা, মৌচাষি হাব ম্যাপিং এবং মাঠপর্যায়ের মনিটরিং কাঠামো তৈরি করবে।
সাফল্যের সূচক বদলাতে হবে
২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সাফল্য শুধু কত গাছ লাগানো হলো; এই সংখ্যায় মাপা যাবে না। সাফল্য মাপতে হবে কত গাছ বেঁচে রইল, কত গাছ ফুল দিল, কত মৌচাষি সিরাপ খরচ কমাতে পারল, কত কলোনি ডার্থ পিরিয়ড পার করে শক্তিশালী থাকল এবং সরিষা-লিচু-কুমড়া মৌসুমে মধু ও ফলন কত বাড়ল—এসব সূচকে।
বাংলাদেশের মৌচাষকে টেকসই করতে হলে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: বৃক্ষরোপণ হবে শুধু কাঠ, ছায়া বা সৌন্দর্যের জন্য নয়; বৃক্ষরোপণ হবে পরাগায়ন অবকাঠামো হিসেবে। ২৫ কোটি গাছের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ৮-১০ কোটি মৌবান্ধব গাছ লাগানো গেলে ডার্থ পিরিয়ডে মৌমাছির খাদ্যাভাব কমবে, সিরাপ নির্ভরতা কমবে, মৌমাছির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, মৌচাষির খরচ কমবে এবং কৃষকের ফলন বাড়বে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সময় এসেছে একটি নতুন নীতিবাক্য গ্রহণ করার—
‘গাছ লাগাই শুধু সবুজের জন্য নয়; গাছ লাগাই মৌমাছি, মধু, পরাগায়ন ও কৃষকের ভবিষ্যতের জন্য।’
তথ্যসূত্র
1. প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন: ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা ও ডিজিটাল মনিটরিং প্রসঙ্গ।
2. Banglapedia: Bee Forage Plant—নেকটার, পোলেন ও মৌমাছির খাদ্যভিত্তি। https://en.banglapedia.org/index.php/Bee_Forage_Plant
3. Banglapedia: Honey Plant—নেকটার ও পোলেনভিত্তিক মৌ-উদ্ভিদের ধারণা। https://en.banglapedia.org/index.php/Honey_Plant
4. Rashid et al. (2002): Identification of Bee Plants and Analysis of Honey Collected from Different Plant Sources—BAU এলাকায় honey flow season, dearth period ও extended period।
5. Krishi Gobeshona Foundation: বাংলাদেশে Apis mellifera কলোনি ও colony health challenge বিষয়ক প্রকল্প তথ্য। https://www.kgf.org.bd/project-details/27
6. Sultana et al. (2024), Frontiers in Bee Science: Evaluating the efficiency of supplementary feeding as a management strategy for enhancing honeybee colony growth and productivity. DOI: 10.3389/frbee.2024.1386799
7. Hasnat, Hossain & Hossain (2016): Flowering, fruiting and seed maturity of common plantation tree species in Bangladesh. Journal of Bioscience and Agriculture Research, 7(1), 583-589.
8. BSRI/Beekeeping in Bangladesh: বাংলাদেশে মৌচাষের সম্ভাবনা, ডার্থ পিরিয়ড ও গবেষণা-উপাত্ত।
9. Rural Development Academy (RDA), Bogura: জলবায়ু-সহনীয় মৌচাষ, রাণী মৌমাছি উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ উদ্যোগ সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম।
২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি: বাংলাদেশের মৌচাষ বাঁচাতে চাই “ডার্থ পিরিয়ড” ভিত্তিক মৌবৃক্ষ নীতি
Typography
- Smaller Small Medium Big Bigger
- Default Helvetica Segoe Georgia Times
- Reading Mode



