উষ্ণ পৃথিবী, অনিশ্চিত কৃষি: অভিযোজনই ভবিষ্যৎ

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

সমীরণ বিশ্বাসঃ জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবিকার ওপর। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থান ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।

অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু ফলন ও আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ফলে খাদ্য ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অভিযোজনমূলক কৃষি প্রযুক্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনাই হতে পারে ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি।

পৃথিবীর জলবায়ু দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড় এবং অনিয়ন্ত্রিত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাব বিশ্বের সব দেশেই অনুভূত হলেও কৃষিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ তার অন্যতম উদাহরণ।

দেশের কৃষি বহুদিন ধরে প্রকৃতিনির্ভর। কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে যাওয়ায় কৃষিও ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে। একদিকে দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি; কোথাও খরা, কোথাও আকস্মিক বন্যা, সব মিলিয়ে কৃষক এখন আবহাওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখোমুখি। একটি মৌসুমের সামান্য আবহাওয়াগত অস্বাভাবিকতাও হাজার হাজার কৃষকের বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বাংলাদেশে বোরো, আউশ ও আমন ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফল উৎপাদন জলবায়ুর ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। উচ্চ তাপমাত্রা ধানের পরাগায়নে বাধা সৃষ্টি করে, ফলন কমায় এবং শস্যের গুণগত মান নষ্ট করে। তাপপ্রবাহের সময় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির উৎপাদনশীলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে কীটপতঙ্গ ও রোগবালাইয়ের প্রকোপ নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, যা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। অনেক এলাকায় মিঠা পানির সংকটের কারণে প্রচলিত ফসল চাষ অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব হলো কৃষি ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন। আগে যে সময়ে বৃষ্টি হতো, এখন তা অনিশ্চিত। কৃষকের বপন, রোপণ, সেচ ও ফসল কাটার সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই সংকট মোকাবিলায় শুধুমাত্র ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করলেই হবে না; প্রয়োজন অভিযোজনকে জাতীয় কৃষি কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। সাথে সাথে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা গুলোতে শস্যবীমা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য।

অভিযোজনের প্রথম ধাপ হলো বিজ্ঞানভিত্তিক আবহাওয়া তথ্য কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া। নির্ভুল স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কৃষককে সঠিক সময়ে বপন, সেচ, সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও মোবাইলভিত্তিক কৃষি পরামর্শ এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু সহনশীল জাতের উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ আরও জোরদার করতে হবে। খরা, লবণাক্ততা, তাপ এবং জলাবদ্ধতা সহনশীল ফসলের জাত কৃষকের ঝুঁকি কমাতে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্রুত মাঠে পৌঁছানো জরুরি।

তৃতীয়ত, পানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি-সাশ্রয়ী চাষাবাদ এবং ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিতে প্রতিটি ফোঁটা পানির কার্যকর ব্যবহার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা অপরিহার্য। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিবর্তে মাটি পরীক্ষাভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনা, জৈব সার, সবুজ সার এবং সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। সুস্থ মাটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় অধিক সক্ষম।

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), ড্রোন প্রযুক্তি, রিমোট সেন্সিং এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টি, আবহাওয়া এবং রোগবালাই সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য কৃষককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে এবং সম্পদের অপচয়ও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে কৃষি বীমা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য সহজ ও দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।

অভিযোজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধি। প্রশিক্ষণ, সম্প্রসারণ সেবা, ডিজিটাল শিক্ষা এবং স্থানীয় জ্ঞানকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের স্মার্ট কৃষিতে সম্পৃক্ত করা গেলে কৃষি আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও লাভজনক হবে। নীতিনির্ধারণেও পরিবর্তন জরুরি। কৃষি, পানি, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অর্থায়নের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও প্রযুক্তি সহযোগিতা কার্যকরভাবে কাজে লাগানোও গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তনকে থামানো একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব, কিন্তু এর প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় অভিযোজনই সবচেয়ে কার্যকর পথ। বাংলাদেশের কৃষি ইতোমধ্যে বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং দূরদর্শী নীতি যুক্ত হলে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। আজকের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা নির্ধারণ করবে। তাই কৃষিকে শুধু উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, বরং জলবায়ু অভিযোজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। কারণ উষ্ণ পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াইয়ে অভিযোজনই হবে কৃষির নতুন শক্তি, নতুন আশা এবং টেকসই ভবিষ্যতের একমাত্র বাস্তব পথ।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের কৃষিকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। প্রচলিত কৃষি পদ্ধতি দিয়ে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তাই অভিযোজনকে কৃষি উন্নয়নের মূল কৌশল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু সহনশীল ফসল, দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, ডিজিটাল কৃষি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, IoT, ড্রোন প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সম্প্রসারণ সেবার সমন্বিত প্রয়োগই কৃষিকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই করবে। 

পাশাপাশি কৃষকদের আর্থিক সুরক্ষা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং নীতিগত সমন্বয় নিশ্চিত করা অপরিহার্য। খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এই তিনটি লক্ষ্য অর্জনে জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক কৃষির কোনো বিকল্প নেই। আজকের সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগই আগামী প্রজন্মের নিরাপদ খাদ্য, সমৃদ্ধ কৃষি এবং টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলবে। তাই এখনই সময়, উষ্ণ পৃথিবীর বাস্তবতা মেনে নিয়ে অভিযোজনকে ভবিষ্যতের কৃষির প্রধান শক্তিতে পরিণত করার।
লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।