ডা. শাহাদাত হোসেন পারভেজঃযদি একটি খাত দেশের ক্ষুদ্র কৃষকের আয়ের প্রধান উৎস হয়, জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং দেশের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেই খাতে সরকারি বিনিয়োগ, গবেষণা, দক্ষ জনবল এবং নীতিগত অগ্রাধিকারও সমানভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতের বাস্তবতা এখনও সে পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
# মাঠপর্যায়ে ভেটেরিনারি সেবা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি
বর্তমানে দেশের সব উপজেলায় মাত্র একজন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও একজন ভেটেরিনারি সার্জনকে কয়েক লাখ গবাদিপ্রাণি ও পোলট্রির স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হয়। জনবল সংকটের কারণে কোথায় কোথায় এই দুইটি পদের একটি পদে লোকবল রয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পদটি উপজেলার দপ্তর প্রধানের পদ হওয়ায় সে ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের সেবা তার পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না যেহেতু উনি উপজেলায় বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে ব্যস্ত থাকেন। সেক্ষেত্রে একজন ভেটেরিনারি সার্জনের পক্ষে একই সঙ্গে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, টিকাদান, রোগ নজরদারি, খামারি প্রশিক্ষণ, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাণিজ খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি রোগ মোকাবিলা করা কার্যত অসম্ভব।
এ অবস্থায় প্রতিটি উপজেলায় অন্তত ৩ জন ভেটেরিনারি সার্জন ও একজন প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা পদ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি। একজন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিতে, একজন প্রজনন ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায়, একজন নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে এবং একজন খামারি সম্প্রসারণ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কাজ করলে মাঠপর্যায়ে সেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
#রোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগই সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ
প্রাণিসম্পদে রোগ দেখা দেওয়ার পর তা নিয়ন্ত্রণ করতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার তুলনায় রোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগ অনেক কম ব্যয়বহুল এবং অধিক কার্যকর। এ কারণে মহাখালীর Livestock Research Institute (LRI)-কে আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, উন্নত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত বাজেটের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দেশীয় চাহিদা অনুযায়ী উন্নতমানের ভ্যাকসিন উৎপাদন করা যায়। উল্লেখ্য যে আমাদের দেশে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার এনিম্যাল ভ্যাকসিন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
একইভাবে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI)-এর গবেষণা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নতুন সংক্রামক রোগ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR), জিনগত উন্নয়ন, প্রাণিখাদ্য প্রযুক্তি, প্রাণিজ পণ্যের গুণগত মান এবং ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে গবেষণা ছাড়া ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।
#দক্ষ ভেটেরিনারি মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে
দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো-যেমন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (DLS), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI), মিল্ক ভিটা এবং অন্যান্য প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্ট সংস্থায় এন্ট্রি-লেভেলের বহু কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক পদে বিএসসি ইন ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি ডিগ্রিধারীরা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী সমান সুযোগ পাচ্ছেন না বলে দীর্ঘদিন ধরে পেশাজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
যারা পাঁচ বছরব্যাপী শিক্ষা গ্রহণ করে প্রাণিস্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, রোগ নির্ণয়, পুষ্টি, প্রজনন, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণায় দক্ষতা অর্জন করেন, তাদের সেই দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই সরকারি নিয়োগনীতিতে মেধা, যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ন্যায্য ও সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।
# One Health বাস্তবায়নে ভেটেরিনারিয়ানদের বিকল্প নেই
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH) দীর্ঘদিন ধরে One Health ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। কারণ, মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ-এই তিনটি একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু, অ্যানথ্রাক্স, নিপাহ, জলাতঙ্কসহ বিভিন্ন জুনোটিক রোগ মোকাবিলায় ভেটেরিনারিয়ানদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের মহামারি প্রতিরোধ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনে ভেটেরিনারি পেশাজীবীদের আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা অপরিহার্য।
#Food Security এবং Food Safety-দুই ক্ষেত্রেই প্রাণিসম্পদের গুরুত্ব
খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security) নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত প্রাণিজ প্রোটিন উৎপাদন বাড়াতে হবে। আবার নিরাপদ খাদ্য (Food Safety) নিশ্চিত করতে হলে প্রাণী থেকে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে আসা রোগ, ওষুধের অবশিষ্টাংশ, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এবং জবাই-পরবর্তী স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এই দুই ক্ষেত্রেই ভেটেরিনারিয়ানদের পেশাগত দক্ষতা অপরিহার্য। তাই নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ভেটেরিনারি সেবাকে আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
# বেসরকারি ভেটেরিনারিয়ানদের জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে হবে
দেশের কয়েক হাজার বেসরকারি ভেটেরিনারিয়ান প্রত্যন্ত গ্রামে কৃষকের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। অথচ তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, আর্থিক প্রণোদনা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কিংবা সরকারি কর্মসূচির সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়।
সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের (Public-Private Partnership) মাধ্যমে এই বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগানো গেলে প্রাণিস্বাস্থ্য সেবার পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারের ওপর চাপও কমবে।
#প্রাণিসম্পদে বিনিয়োগ মানেই টেকসই উন্নয়নে বিনিয়োগ
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে প্রাণিসম্পদ খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য দূরীকরণ (SDG-1), ক্ষুধামুক্তি ও পুষ্টি (SDG-2), সুস্বাস্থ্য (SDG-3), নারীর ক্ষমতায়ন (SDG-5), কর্মসংস্থান (SDG-8), দায়িত্বশীল উৎপাদন (SDG-12) এবং জলবায়ু অভিযোজন (SDG-13)-প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রাণিসম্পদ খাত প্রত্যক্ষ অবদান রাখছে।
তাই প্রাণিসম্পদে বিনিয়োগ কোনো খাতভিত্তিক ব্যয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
# নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান
বাংলাদেশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন (BVA) এবং ভেটেরিনারি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (VAB) দীর্ঘদিন ধরে প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ভেটেরিনারি সেবা সম্প্রসারণ, গবেষণা জোরদার, দক্ষ মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং One Health বাস্তবায়নের দাবিতে কাজ করে যাচ্ছে। বিবিএসের সাম্প্রতিক জরিপ এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান আজ সেই দাবিগুলোর যৌক্তিকতাকে আরও সুসংহত করেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী, মাননীয় সচিব এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিনীত আহ্বান-বাংলাদেশের কৃষির নতুন বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিন। ক্ষুদ্র কৃষকের আয়ের প্রধান ভিত্তি যখন প্রাণিসম্পদ, তখন জাতীয় বাজেট, গবেষণা, জনবল, ভ্যাকসিন উৎপাদন, শিক্ষা, নিয়োগনীতি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
কারণ, প্রাণিসম্পদে বিনিয়োগ মানে শুধু গরু, ছাগল বা হাঁস-মুরগিতে বিনিয়োগ নয়; এটি কোটি ক্ষুদ্র কৃষকের জীবন-জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন, যুব কর্মসংস্থান, নিরাপদ খাদ্য, জনস্বাস্থ্য এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।
-লেখক: ভেটেরিনারিয়ান,| সাংগঠনিক সম্পাদক, ভেটেরিনারি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (VAB)



