সমীরণ বিশ্বাস:বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। ই-বর্জ্য : কৃষি, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের নীরব হুমকি ! প্রতিদিন নতুন নতুন মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ, স্মার্ট ডিভাইস ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র বাজারে আসছে।
প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতি মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে এক নতুন পরিবেশগত সংকট, “ই-বর্জ্য” বা Electronic Waste (E-waste)। আধুনিক সভ্যতার এই অদৃশ্য বিপদ এখন বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি একটি ভয়াবহ হুমকি, কারণ ই-বর্জ্যের বিষাক্ত উপাদান মাটি, পানি, বায়ু ও খাদ্যশৃঙ্খলকে ধীরে ধীরে দূষিত করছে।
ই-বর্জ্য বলতে মূলত সেইসব বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্যকে বোঝায়, যেগুলো আর ব্যবহারযোগ্য নয় বা ফেলে দেওয়া হয়েছে। যেমন, পুরনো মোবাইল ফোন, নষ্ট কম্পিউটার, ভাঙা টেলিভিশন, অকেজো ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, ব্যাটারি, চার্জার, ইলেকট্রনিক সার্কিট বোর্ড, তার ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে মানুষ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন ডিভাইস কিনছে এবং পুরনো ডিভাইসগুলো পরিত্যক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ই-বর্জ্যের পরিমাণ।
বিশ্বে প্রতি বছর কয়েক কোটি টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক বর্জ্যের একটি অংশ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করছে পুনর্ব্যবহারের নামে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব বর্জ্য সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয় না। ফলে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ দূষণ সৃষ্টি করছে।
ই-বর্জ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এতে থাকা ক্ষতিকর ভারী ধাতু ও রাসায়নিক উপাদান। যেমন, সীসা (Lead), পারদ (Mercury), ক্যাডমিয়াম (Cadmium), আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম ও ব্রোমিনযুক্ত যৌগ। এসব উপাদান দীর্ঘদিন মাটিতে জমা হয়ে মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয়। কৃষিজমিতে এই দূষণ ছড়িয়ে পড়লে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং খাদ্যশস্যের মাধ্যমে বিষাক্ত পদার্থ মানবদেহে প্রবেশ করে।
কৃষি ও পরিবেশের ওপর ই-বর্জ্যের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। যখন খোলা জায়গায় ই-বর্জ্য পোড়ানো হয়, তখন বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসে মিশে বায়ুদূষণ সৃষ্টি করে। আবার বৃষ্টির পানির মাধ্যমে ই-বর্জ্যের রাসায়নিক উপাদান মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করে। অনেক সময় নদী বা খালে এসব বর্জ্য ফেলা হয়, যা জলজ প্রাণী ও মৎস্যসম্পদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত। যদি কৃষিজমির মাটি দূষিত হয়ে পড়ে, তাহলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। দূষিত মাটিতে উৎপাদিত শাকসবজি, ধান, ফলমূল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি বাড়তে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শরীরে ক্যানসার, কিডনি রোগ, স্নায়বিক সমস্যা, শ্বাসকষ্ট এবং শিশুদের বিকাশজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-বর্জ্য শুধু পরিবেশগত নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাও। কারণ সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ধাতু অপচয় হচ্ছে। অনেক ইলেকট্রনিক যন্ত্রে স্বর্ণ, রূপা, তামা ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো মূল্যবান উপাদান থাকে, যা পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে আবার ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ধ্বংস করার ফলে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তেমনি মূল্যবান সম্পদও নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনও পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। শহরাঞ্চলে পুরনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র খোলা জায়গায় ফেলে রাখা, পোড়ানো বা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে আলাদা করার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে শিশু শ্রমিকরাও ঝুঁকিপূর্ণভাবে এসব বর্জ্য আলাদা করার কাজে যুক্ত থাকে, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক মানুষ জানেন না যে পুরনো ব্যাটারি, মোবাইল ফোন বা চার্জার সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেওয়া উচিত নয়। ফলে এসব বর্জ্য ময়লার ভাগাড়ে জমে পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।
ই-বর্জ্য কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হলো “Reduce, Reuse and Recycle” নীতি অনুসরণ করা। অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক পণ্য কম ব্যবহার করা, পুরনো ডিভাইস পুনরায় ব্যবহার করা এবং ব্যবহার অনুপযোগী যন্ত্র সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা। উদাহরণস্বরূপ, একটি মোবাইল ফোন সামান্য সমস্যার কারণে ফেলে না দিয়ে মেরামত করে আরও কিছুদিন ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে পুরনো কম্পিউটার বা ল্যাপটপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া যেতে পারে।
পুনর্ব্যবহার বা Recycling ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু আলাদা করে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব। এতে যেমন পরিবেশ দূষণ কমে, তেমনি নতুন কাঁচামালের ওপর চাপও হ্রাস পায়। এজন্য প্রয়োজন সরকার অনুমোদিত নিরাপদ রিসাইক্লিং ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রযুক্তি।
সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকারকে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। একইসঙ্গে স্কুল, কলেজ ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশ “Green Technology” বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী ও সহজে মেরামতযোগ্য ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি করলে ই-বর্জ্যের পরিমাণ কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি পুরনো কৃষি যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক সেন্সর থেকেও ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। তাই কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি এর নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে IoT-ভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তি, সেন্সর, ব্যাটারি ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের পর সেগুলোর সঠিক নিষ্পত্তি জরুরি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পরিবেশ শুধু বর্তমান প্রজন্মের নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও অধিকার রয়েছে একটি নিরাপদ ও সুস্থ পৃথিবীতে বসবাস করার। আজ যদি আমরা ই-বর্জ্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন না হই, তাহলে আগামী দিনে এর মূল্য দিতে হবে কৃষি, প্রকৃতি ও মানবসভ্যতাকে।
ই-বর্জ্য কোনো সাধারণ আবর্জনা নয়; এটি একটি নীরব বিষ। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। প্রতিটি মানুষ যদি দায়িত্বশীল আচরণ করে, সঠিকভাবে ই-বর্জ্য পৃথক করে এবং পুনর্ব্যবহারে অংশ নেয়, তাহলে এই সংকট অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এখনই সময় সচেতন হওয়ার, পরিবার ও সমাজকে সচেতন করার এবং পরিবেশবান্ধব ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার। কারণ একটি নিরাপদ পরিবেশ মানেই নিরাপদ কৃষি, নিরাপদ খাদ্য এবং সুস্থ ভবিষ্যৎ।
লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।


