সমীরণ বিশ্বাস:মানুষের সভ্যতা, কৃষি, খাদ্য ও সংস্কৃতির গভীরে যদি কোনো নীরব শক্তি কাজ করে থাকে, তবে তার অন্যতম হলো গাছ। একটি গাছ শুধু কাঠ, ফল বা ছায়ার উৎস নয়; এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র, যেখানে অসংখ্য প্রাণের সহাবস্থান ঘটে।
গাছের শিকড়ের নিচে কোটি কোটি অণুজীব, কেঁচো ও উপকারী ব্যাকটেরিয়া মাটিকে উর্বর করে তোলে। তার ডালপালায় আশ্রয় নেয় পাখি, মৌমাছি, প্রজাপতি, কাঠবিড়ালি ও নানা উপকারী পোকামাকড়। প্রকৃতপক্ষে একটি গাছ মানে একটি জীবন্ত পৃথিবী। আজ বিশ্বজুড়ে প্রাণবৈচিত্র্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার, নদী-খাল দখল ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে পৃথিবীর বহু প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীব হারিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় গাছ শুধু পরিবেশ রক্ষার উপাদান নয়; এটি মানবজাতির টিকে থাকার নিরাপদ আশ্রয়।
গাছ ও প্রাণবৈচিত্র্যের অদৃশ্য সম্পর্ক:
প্রাণবৈচিত্র্য বলতে শুধু বাঘ, হরিণ বা বিরল পাখিকে বোঝায় না। ক্ষুদ্র কেঁচো, মৌমাছি, মাটির অণুজীব, শামুক, ঝিনুক, দেশি মাছ, দেশি ধানের জাত, সবই প্রাণবৈচিত্র্যের অংশ। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে গাছ। গাছের ঝরা পাতা মাটিকে জৈবপদার্থ দেয়। সেই পচা পাতাকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে কেঁচো ও অণুজীব। কেঁচো মাটিকে ঝুরঝুরে ও উর্বর করে, ফলে গাছ আরও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে। এই চক্রের মধ্য দিয়েই প্রকৃতিতে নতুন প্রাণের জন্ম হয়। একটি পুরোনো গাছকে কেন্দ্র করে ছোট্ট একটি পৃথিবী গড়ে ওঠে। পাখি সেখানে বাসা বাঁধে, মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে, প্রজাপতি ফুলে বসে পরাগায়ণে সাহায্য করে। কৃষির জন্য এই উপকারী প্রাণীগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৌমাছি ও প্রজাপতি না থাকলে বহু ফসলের পরাগায়ণ ব্যাহত হবে, খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে। অর্থাৎ গাছ কেবল অক্সিজেন দেয় না; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশগত ভারসাম্যের মূলভিত্তি।
কৃষি ও প্রাণবৈচিত্র্য: একে অপরের পরিপূরক:
বাংলাদেশের কৃষি মূলত প্রকৃতিনির্ভর। মাটি, পানি, দেশি বীজ, উপকারী পোকামাকড় ও অণুজীবের ওপর কৃষির উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে। অথচ আধুনিক কৃষির নামে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় গ্রামবাংলার মাঠে, খালে ও ডোবায় নানা জাতের দেশি মাছ দেখা যেত। ধানক্ষেতে পাওয়া যেত শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ ও নানা জলজ প্রাণী। আজ এদের অনেকেই হারিয়ে গেছে। অতিরিক্ত কীটনাশক শুধু ক্ষতিকর পোকা মারে না; এটি উপকারী পোকামাকড়, মাছ, ব্যাঙ ও মাটির অণুজীবও ধ্বংস করে। আগে বাড়ির আনাচকানাচে হেলেঞ্চা, কলমি, শুষনি, থানকুনি, ডাঁটা শাকসহ অসংখ্য অচাষকৃত শাক পাওয়া যেত। এসব শাক ছিল পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। এখন রাসায়নিক দূষণ ও জমির পরিবর্তনের কারণে এসব উদ্ভিদ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
দেশি ধানের বহু জাতও বিলুপ্তির পথে। অথচ দেশি ধানের অনেক জাত ছিল খরা, বন্যা কিংবা লবণাক্ততা সহনশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে দেশি ধানবৈচিত্র্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ জীববৈচিত্র্য যত বেশি হবে, কৃষি তত বেশি সহনশীল ও টেকসই হবে।
কীটনাশকের ভয়াবহ প্রভাব:
বর্তমানে কৃষিতে দ্রুত ফলনের আশায় মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে কিছু পোকা দমন হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্য ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। কীটনাশক মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীবকে ধ্বংস করে। ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা কমে যায়। জমি ধীরে ধীরে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিষাক্ত রাসায়নিক বৃষ্টির পানির মাধ্যমে খাল, বিল ও নদীতে মিশে জলজ প্রাণ ধ্বংস করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কীটনাশকের কারণে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ মৌমাছির পরাগায়ণের ওপর নির্ভরশীল। মৌমাছি হারিয়ে গেলে খাদ্যব্যবস্থাও সংকটে পড়বে। তাই এখন সময় এসেছে কৃষিতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈব কৃষি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর। কৃষিকে শুধু উৎপাদনের দৃষ্টিতে দেখলে হবে না; এটিকে জীববৈচিত্র্য রক্ষার অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।
গাছ হারালে হারাবে সভ্যতা:
একটি বড় গাছ কাটা মানে শুধু একটি উদ্ভিদ ধ্বংস করা নয়; এর সঙ্গে ধ্বংস হয় একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র। পাখির বাসা হারায়, অণুজীবের আবাস ধ্বংস হয়, মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। শহর ও গ্রামে নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গাছ কমে গেলে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্রও ব্যাহত হয়। অন্যদিকে গাছ কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই গাছ রক্ষা মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন:
প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। পরিবার, বিদ্যালয়, কৃষক, তরুণ সমাজ, গবেষক ও স্থানীয় জনগণ, সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রতিটি গ্রামে দেশি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। রাস্তার পাশে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, খাসজমিতে ও বাড়ির আঙিনায় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো জরুরি। শুধু বিদেশি সৌন্দর্যবর্ধক গাছ নয়; দেশীয় প্রজাতির গাছ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশি মাছ, দেশি ধান, অচাষকৃত শাক ও জলজ প্রাণ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষকদের পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও তা যেন প্রকৃতিবান্ধব হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেও জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ শিক্ষা আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হবে না।
প্রযুক্তি ও পরিবেশের সমন্বয় জরুরি:
বর্তমান বিশ্বে কৃষিতে AI, IoT ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এই প্রযুক্তি যদি পরিবেশবান্ধবভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে কৃষিতে রাসায়নিক নির্ভরতা কমানো সম্ভব। সয়েল সেন্সরের মাধ্যমে মাটির প্রকৃত অবস্থা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করা যায়। এতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার কমে। একইভাবে স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগ-পোকার আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব হলে নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগও কমানো যাবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে ভবিষ্যতের টেকসই কৃষির মূল চ্যালেঞ্জ।
আগামীর পৃথিবীর জন্য এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে:
প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হলে মানুষও টিকে থাকতে পারবে না। কারণ মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়; মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। মাটি, পানি, গাছ, পাখি, মাছ, মৌমাছি, সব মিলিয়েই পৃথিবীর জীবনচক্র। আজ যদি আমরা গাছ কাটি, নদী দূষিত করি, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করি এবং দেশীয় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিরাপদ পৃথিবী রেখে যাব। তাই এখনই সময় আমাদের জৈবিক সম্পদকে সম্মান করার, সংরক্ষণ করার এবং পুনরুদ্ধার করার। একটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য জীবন রোপণ করা। গাছ আমাদের নিরাপদ আশ্রয়। প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার সবচেয়ে বড় প্রহরী। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে গাছ, মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ প্রকৃতি বাঁচলে তবেই মানুষ বাঁচবে, কৃষি বাঁচবে, পৃথিবী বাঁচবে।
লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।


