"আমা‌দের ভাবনায় কোরবানী" জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

মোতমাইন্না মুন্নীঃপবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কোরবানি একটি ইবাদত হলেও এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জবাই, অপরিচ্ছন্ন মাংস সংরক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝু‌ঁকিও আ‌ছে । তাই কোরবানির সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। এই বিষয়ে পশুপালন অনুষদের শিক্ষার্থীরা কোরবানির নানা দিক নিয়ে তাদের চিন্তাশীল পর্যবেক্ষণ ও মূল্যবান অভিমত উপস্থাপন করেছেন।

কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
আব্দুল্লাহ আল সাঈদ পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

ডেক্সামেথাসন বা হাইড্রোকরটিসনের মতো স্টেরয়েড ব্যবহার করে পশু মোটাতাজাকরণ করলে পশুর কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়। শরীরে ইলেকট্রোলাইট বা লবণের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে কিডনি স্বাভাবিকভাবে পানি ও সোডিয়াম নিষ্কাশন করতে পারে না। ফলে কোষের ফাঁকা স্থানে পানি জমে পশুকে বাহ্যিকভাবে মোটাতাজা ও স্বাস্থ্যবান দেখালেও বাস্তবে তা অঙ্গ বিকলের লক্ষণ বহন করে। দীর্ঘদিন স্টেরয়েড প্রয়োগের কারণে অনেক পশু হাটে নেওয়ার আগেই মারা যায়। আবার সামান্য হিট স্ট্রেসেও গরু স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক কিংবা কিডনি বিকলের শিকার হতে পারে।

জবেহের পর রান্নার তাপেও এসব হরমোন পুরোপুরি নষ্ট হয় না। ফলে এই মাংস খাওয়ার মাধ্যমে হরমোনের অবশিষ্টাংশ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে কিডনি, লিভার ও হরমোনজনিত নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত লাভের আশায় এ ধরনের অনিরাপদ মোটাতাজাকরণ শুধু পশুর জন্য নয়, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি। তাই স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক ব্যবহার ও সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

কোরবানির আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ
মাহবুবুর রহমান শরীফ পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সুস্থ পশু নির্বাচন শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। কোরবানির পশুর সঠিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। গরুর নিয়মিত টিকা প্রদান লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD), ক্ষুরা রোগ (FMD)সহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই খামারি ও ক্রেতাদের এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।

পশুর শরীরে জ্বর, গুটি, ক্ষত, অতিরিক্ত লালা ঝরা, খাওয়ায় অরুচি, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা গেলে তা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অসুস্থ বা সন্দেহজনক পশু কোরবানির জন্য নির্বাচন করা উচিত নয়। পাশাপাশি নিয়মিত কৃমিনাশক প্রয়োগ প্রয়োজন, কারণ কৃমি পশুর পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত করে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

কোরবানির আগে পশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া জরুরি। দীর্ঘ পরিবহন, অতিরিক্ত ভিড় ও গরমে পশু হিট স্ট্রেসে আক্রান্ত হতে পারে।  যা মাংসের গুণগত মান ও পশুর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই পশুকে পরিষ্কার পানি, নিরাপদ ও সুষম খাদ্য এবং শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া পশু ক্রয় ও জবাইয়ের আগে অভিজ্ঞ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ। সুস্থ পশু, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সচেতন ব্যবস্থাপনাই নিরাপদ কোরবানি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম শর্ত।

কোরবানির পশুর যত্ন, পরিবহন ও মানবিক ব্যবস্থাপনা
হুর-এ তানহা তামান্না, পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
দীর্ঘ পথ পরিবহনের ফলে পশুর শরীরে ক্লান্তি ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। তাই কোরবানির আগে পশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্রাম পেলে পশুর রক্ত চলাচল ও বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে, ফলে জবাইয়ের পর সহজে রক্ত বের হয়ে আসে এবং মাংসের গুণগত মান ভালো থাকে। একই সঙ্গে মাংস সতেজ, সুস্বাদু ও সংরক্ষণ উপযোগী হয়। শান্ত ও আরামদায়ক পরিবেশে রাখলে পশু দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং পরিচর্যাও সহজ হয়।

পশু পরিবহনের সময় অতিরিক্ত গাদাগাদি করা উচিত নয়, কারণ এতে পশু আহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পরিবহনের গাড়ির মেঝে পরিষ্কার ও নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন, যেন ইট, পেরেক বা ধারালো কিছু না থাকে। দীর্ঘ যাত্রায় নির্দিষ্ট বিরতিতে পশুকে পানি ও খাদ্য দিতে হবে এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পশুকে মারধর, ভয় দেখানো বা টানা-হেঁচড়া না করে কোমল আচরণের মাধ্যমে ওঠানামা করানো উচিত।
ইসলাম পশুর প্রতিও দয়া ও সহানুভূতির শিক্ষা দেয়। তাই কোরবানির সময় পশুর প্রতি মানবিক আচরণ করা অপরিহার্য। জবাইয়ের আগে পশুকে পানি পান করানো, ধারালো ছুরি ব্যবহার করা এবং একটি পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই না করা । পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে দ্রুত ও কম কষ্টে জবাই সম্পন্ন করাই মানবিক কোরবানির অন্যতম শর্ত। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা ত্যাগের পাশাপাশি দয়া, দায়িত্ববোধ ও মানবতার প্রকাশ।

কোরবানির পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর মাংস সংরক্ষণ
মোঃ আতিয়ার রহমান পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

পবিত্র ঈদুল আজহা ত্যাগ, মানবতা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। এই আনন্দের সময়েও জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের প্রতি সচেতন থাকা জরুরি। তাই কোরবানির পশু জবাইয়ের জন্য নির্ধারিত স্থান ব্যবহার করা উচিত। কোরবানির পর রক্ত ও বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করতে হবে। বর্জ্য গর্ত করে মাটিচাপা দেওয়া এবং জবাইয়ের স্থান ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এতে রোগজীবাণু, দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণ কমে।

কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই চামড়া ছাড়ানোর সময় সতর্ক থাকতে হবে, যেন ক্ষত সৃষ্টি না হয়। সংরক্ষণের আগে অতিরিক্ত মাংস ও চর্বি পরিষ্কার করে পর্যাপ্ত লবণ মাখিয়ে ঠান্ডা স্থানে রাখতে হবে। মাংস সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে কাটাকাটি করা উচিত। জীবাণুমুক্ত পাত্রে সংরক্ষণ করলে মাংস দীর্ঘসময় ভালো থাকে। দ্রুত ফ্রিজে রাখা নিরাপদ। ভেজে সংরক্ষণ করতে চাইলে অতিরিক্ত পানি শুকিয়ে শুকনো পাত্রে রাখতে হবে এবং ওপরে তেল দিতে হবে, যাতে বাতাসের সংস্পর্শে নষ্ট না হয়।

মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীসম্পদ ও পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য আরও সুন্দরভাবে ফুটে উঠবে।

স্বাস্থ্যসম্মত পশুপালন ও টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন
মোস্তফা আবদুল্লাহ্ কামাল, পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবিকার সঙ্গে প্রাণিসম্পদ খাত গভীরভাবে জড়িত। বিশেষ করে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে হাজারো খামারি গবাদিপশু পালন ও বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। পশুর হাট, পরিবহন, পশুখাদ্য বিক্রি এবং চামড়া শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বর্তমানে দেশীয় খামারগুলোতে চাহিদার তুলনায় বেশি পশু উৎপাদিত হওয়ায় দেশীয় পশুর প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে। স্বাস্থ্যসম্মত ও প্রাকৃতিক উপায়ে পশু পালন নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে দ্রুত লাভের আশায় কিছু অসাধু খামারি স্টেরয়েড, ক্ষতিকর ওষুধ ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন, যা পশু ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অস্বাস্থ্যকর উপায়ে মোটাতাজাকরণ পশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে এবং মাংসের গুণগত মান নষ্ট করে। এসব মাংস দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং খামারিরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।

তাই নিরাপদ ও টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। পশুপালনে সুষম খাদ্য, সঠিক পরিচর্যা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্টেরয়েড ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তি, সরকারি সহায়তা এবং সচেতন খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।