কোরবানির বর্জ্য ও পরিবেশ সংকট: সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

আব্দুল্লাহ আল নোমানঃঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে শহর ও জনপদে এক ধরনের পরিবেশ সংকট সৃষ্টি হয়।

ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাও একজন সচেতন নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কোরবানির পরবর্তী ৮-১০ দিন রাস্তাঘাট, ড্রেন ও আশপাশের খোলা জায়গায় পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, চামড়া ও অন্যান্য জৈব বর্জ্যের দুর্গন্ধ অসহনীয় হয়ে ওঠে। এসব বর্জ্য খোলা স্থানে ফেলে রাখলে তা দ্রুত পচে গিয়ে বায়ুদূষণ সৃষ্টি করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। পচন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুর গুণগত মান কমিয়ে দেয়, যা শ্বাসকষ্ট, এলার্জি ও অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে এসব বর্জ্য ড্রেনেজ ব্যবস্থায় জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে এবং নদী-খালসহ জলাশয়ের পানিদূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরিবেশবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই জৈব বর্জ্য পানিতে মিশে উচ্চমাত্রার জৈব দূষণ সৃষ্টি করে, যা জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া পচনশীল বর্জ্য থেকে উৎপন্ন দুর্গন্ধ ও গ্যাস বায়ুমণ্ডলের গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। মাছি-মশা ও অন্যান্য রোগবাহক পোকামাকড়ের বিস্তার ঘটিয়ে ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা। কোরবানির বর্জ্য কখনোই খোলা স্থানে বা ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ফেলা উচিত নয়। নির্দিষ্ট স্থানে গর্ত করে মাটি চাপা দেওয়া অথবা সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করা জরুরি।

এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য সংগ্রহ, বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং অস্থায়ী বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে অনেক শহরে স্বল্প সময়ের মধ্যেই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। কোথাও কোথাও নির্ধারিত ব্যাগ বিতরণ ও সচেতনতামূলক প্রচারণাও ইতিবাচক ফল দিয়েছে। তবে এই উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর করতে নাগরিকদের সক্রিয় সহযোগিতা অপরিহার্য।

তবে শুধু বর্জ্য অপসারণই নয়, এর টেকসই ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় কোরবানির বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এসব জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার উৎপাদন করা যায়, যা কৃষিক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব সার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এছাড়া বায়োগ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে বিকল্প জ্বালানি হিসেবেও এই বর্জ্য ব্যবহারযোগ্য।

পরিবেশ বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো—“বর্জ্য বলে কিছু নেই, সবই সম্পদ।” তাই সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোরবানির বর্জ্য আমাদের জন্য বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সিটি কর্পোরেশন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের সময়ে পরিবেশ সংরক্ষণ আর কোনো বিকল্প নয়, এটি একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। তাই আসন্ন ঈদুল আযহায় আমরা সবাই যদি সচেতনভাবে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করি, তবে একটি পরিচ্ছন্ন, সুস্থ ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ