সমীরণ বিশ্বাস:২১ জুন, তৃতীয় রবিবার, বিশ্ব বাবা দিবস। এই দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি একজন বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণের দিন। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনে বাবা এমন এক অবলম্বনের নাম, যাঁর অবদান অনেক সময় নীরব, কিন্তু গভীর ও অপরিসীম।
তিনি পরিবারের সেই ছায়াবৃক্ষ, যার ত্যাগ, শ্রম ও ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে একটি সন্তানের স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ। “বাবা মানে সাহস, বাবা মানে ভরসা, বাবা মানে ভালোবাসার অটুট ঠিকানা।”
এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই যেন একজন বাবার সমগ্র সত্তা ফুটে ওঠে। সন্তানের জীবনে প্রথম নিরাপত্তাবোধ, প্রথম শিক্ষা, প্রথম দায়িত্ববোধ এবং প্রথম নৈতিকতার পাঠ আসে বাবার কাছ থেকেই। জীবনের কঠিন পথচলায় তিনি কখনও পথপ্রদর্শক, কখনও অভিভাবক, কখনও বন্ধু, আবার কখনও নীরব প্রহরীর ভূমিকা পালন করেন।
বাবার ভালোবাসা: নীরব অথচ গভীর : মায়ের ভালোবাসা প্রকাশ্য, কোমল ও দৃশ্যমান। কিন্তু বাবার ভালোবাসা অনেক সময় নীরব, সংযত এবং দায়িত্বের আবরণে ঢাকা থাকে। একজন বাবা হয়তো সন্তানের সামনে খুব বেশি আবেগ প্রকাশ করেন না, কিন্তু সন্তানের সামান্য কষ্টেও তাঁর হৃদয় ব্যথিত হয়। তিনি নিজের প্রয়োজন, স্বপ্ন ও সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেন। প্রখর রোদে ঘাম ঝরিয়ে, জীবনের নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ভার কাঁধে নিয়ে একজন বাবা নিরন্তর কাজ করে যান। তাঁর এই সংগ্রামের পেছনে থাকে একটি মাত্র লক্ষ্য, সন্তানের মুখে হাসি ফোটানো এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অনেক সময় সন্তানেরা বাবার কঠোরতা দেখে অভিমান করে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি হয়, সেই কঠোরতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সীমাহীন মমতা ও দায়িত্ববোধ। বাবার প্রতিটি শাসন, প্রতিটি উপদেশ, প্রতিটি নিষেধাজ্ঞার পেছনে ছিল সন্তানের কল্যাণের চিন্তা।
বাবার ত্যাগ: অদৃশ্য এক মহাকাব্য : পৃথিবীর অসংখ্য বাবার জীবনের গল্প আসলে এক একটি নীরব মহাকাব্য। একজন বাবা হয়তো নিজের নতুন পোশাক কেনেন না, কিন্তু সন্তানের জন্য নতুন জামা কিনে আনেন। নিজের ইচ্ছাগুলো গোপন রাখেন, কিন্তু সন্তানের স্বপ্ন পূরণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে রেখে পরিবারের মুখে হাসি ফোটান। অনেক বাবা আছেন, যাঁরা জীবনের অধিকাংশ সময় পরিবার থেকে দূরে কাটান। প্রবাসে, শহরে কিংবা কর্মস্থলে থেকে তাঁরা পরিবারকে ভালো রাখার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। তাঁদের চোখের জল, একাকীত্ব ও কষ্টের গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ তাঁদের এই ত্যাগের কারণেই পরিবারে স্বচ্ছলতা ও নিরাপত্তা আসে। একজন বাবা হয়তো কখনও বলেন না, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” কিন্তু তাঁর প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি শ্রম এবং প্রতিটি উদ্বেগই সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ।
বাবাই প্রথম নায়ক : প্রতিটি সন্তানের জীবনে বাবা হলেন প্রথম নায়ক। ছোটবেলায় সন্তানের কাছে বাবার মতো শক্তিশালী, সাহসী ও নির্ভরযোগ্য মানুষ আর কেউ থাকে না। বাবা হাত ধরে হাঁটতে শেখান, সাইকেল চালাতে শেখান, জীবনের প্রথম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে শেখান। সন্তান যখন ভয় পায়, তখন বাবার উপস্থিতি তাকে সাহস দেয়। যখন ব্যর্থ হয়, তখন বাবার উৎসাহ তাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শেখায়। যখন জীবনের মোড়ে মোড়ে সিদ্ধান্তহীনতা আসে, তখন বাবার অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ হয়ে ওঠে পথের দিশারি। বাবা কেবল একজন অভিভাবক নন; তিনি একজন শিক্ষক, একজন পরামর্শদাতা এবং একজন আদর্শ মানুষ। তাঁর জীবনসংগ্রাম, সততা, দায়িত্ববোধ ও কর্মনিষ্ঠা সন্তানের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আধুনিক সমাজে বাবার ভূমিকা : সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাবার ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটেছে। আজকের বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন; তিনি সন্তানের শিক্ষা, মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক আচরণ গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান যুগে অনেক বাবা সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। তাঁরা সন্তানদের কথা শুনছেন, তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং তাদের মানসিক সুস্থতার প্রতি সচেতন হচ্ছেন। এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন, যা পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করছে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখাও জরুরি। সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা একজন বাবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।
যাঁদের বাবা নেই : বাবা দিবস আনন্দের দিন হলেও অনেকের জন্য এটি স্মৃতিময় ও আবেগঘন একটি দিন। যাঁদের বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের কাছে এই দিনটি গভীর অনুভূতির। বাবার স্মৃতি, তাঁর উপদেশ, তাঁর হাসি এবং তাঁর স্নেহমাখা উপস্থিতি আজও তাঁদের হৃদয়ে জীবন্ত। বাবা হয়তো শারীরিকভাবে আর পাশে নেই, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, আদর্শ এবং ভালোবাসা সন্তানের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পথ দেখায়। তাই বাবা হারানোর বেদনা কখনও পুরোপুরি মুছে যায় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আরও গভীর হয়। এই দিনে আমরা সেসব প্রয়াত বাবার প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানাই, যাঁদের ত্যাগ ও অবদান তাঁদের সন্তানদের জীবনে আজও আলোকবর্তিকার মতো জ্বলছে।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন : আমরা অনেক সময় জীবনের ব্যস্ততায় বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যাই। অথচ তাঁরা আমাদের জন্য কত কিছু করেন, তার হিসাব কখনও করা সম্ভব নয়। বাবা দিবস আমাদের সেই সুযোগ করে দেয়, একটি ফোন কল, একটি আলিঙ্গন, একটি শুভেচ্ছা বার্তা কিংবা কয়েকটি আন্তরিক শব্দের মাধ্যমে বাবাকে জানিয়ে দেওয়া যায় তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার কথা। বাবাকে ভালোবাসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন নেই। তবে এই বিশেষ দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বাবা আমাদের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁর অবদান কতটা অনন্য।
শেষকথা : বাবা এমন এক সম্পর্ক, যার কোনো বিকল্প নেই। তিনি জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম নায়ক, প্রথম বন্ধু এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ ও সংগ্রামের মূল্য কখনও পরিমাপ করা যায় না। পরিবারকে সুখী ও নিরাপদ রাখতে তিনি নিজের সুখ বিসর্জন দেন, নিজের স্বপ্ন গোপন করেন এবং সন্তানের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্নে পরিণত করেন।
এই বাবা দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি পৃথিবীর সকল বাবাকে। সালাম সকল বাবাকে। যে ছায়া সবসময় মাথার ওপর থাকে, যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, যে মানুষটি সন্তানের সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হন এবং সন্তানের কষ্টে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত হন, সেই মহান মানুষটিকেই আমরা বলি বাবা। সকল বাবাকে জানাই অন্তরের অন্তস্থল থেকে শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা। বাবা, তুমি আমার জীবনের প্রথম নায়ক, চিরন্তন পথপ্রদর্শক। তোমার প্রতি রইল অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।
লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।





















