ডা. শাহাদাত হোসেন পারভেজ:বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতের সবচেয়ে সফল ও দ্রুত বিকাশমান উপখাত পোল্ট্রি শিল্প। দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে এ খাতের অবদান অনস্বীকার্য।
বর্তমানে দেশের প্রাণিজ আমিষের একটি বড় অংশ ডিম ও মুরগির মাংস থেকে আসে এবং প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এই বাস্তবতায় সরকার প্রণীত জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬ নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।
নীতিমালায় নিরাপদ ডিম ও মাংস উৎপাদন, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) নিয়ন্ত্রণ, বায়োসিকিউরিটি জোরদার, রোগ নজরদারি, জলবায়ু সহনশীল জাত উন্নয়ন, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে একজন ভেটেরিনারিয়ান হিসেবে আমার মনে হয়, নীতিমালাটি উৎপাদন, বিপণন ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, ভেটেরিনারি সেবা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রোগ নির্ণয় অবকাঠামোর ওপর ততটা গুরুত্ব দেয়নি। অথচ পোল্ট্রি শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য এগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ভেটেরিনারিয়ান ছাড়া নিরাপদ পোল্ট্রি খাত সম্ভব নয়: পোল্ট্রি শিল্প কেবল একটি কৃষিভিত্তিক ব্যবসা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি খাত। খামারে রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান, চিকিৎসা, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপনা, বায়োসিকিউরিটি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং রপ্তানি মান বজায় রাখার প্রতিটি ধাপেই ভেটেরিনারিয়ান অপরিহার্য।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের অধিকাংশ উপজেলায় পোল্ট্রি খাতের আকার ও জনবলের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। অনেক উপজেলায় লক্ষ লক্ষ পোল্ট্রি এবং হাজার হাজার খামার থাকলেও সেখানে একজন বা দুইজন ভেটেরিনারি কর্মকর্তার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে। এটি বাস্তবসম্মত নয়।
জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালায় একটি স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত ছিল-একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক পোল্ট্রি বা নির্দিষ্ট সংখ্যক খামারের জন্য কতজন ভেটেরিনারিয়ান প্রয়োজন হবে। খামারের ঘনত্ব ও পোল্ট্রি জনসংখ্যার ভিত্তিতে উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে ভেটেরিনারি জনবল কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা সময়ের দাবি।
প্রতিটি উপজেলায় বিশেষায়িত পোল্ট্রি ভেটেরিনারি ইউনিট প্রয়োজন:
বর্তমানে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে একই সঙ্গে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগি এবং অন্যান্য প্রাণির সেবা দিতে হয়। কিন্তু বাণিজ্যিক পোল্ট্রি শিল্পের বর্তমান আকার বিবেচনায় প্রতিটি উপজেলায় পৃথক পোল্ট্রি হেলথ অ্যান্ড ডিজিজ ম্যানেজমেন্ট ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন।
এ ধরনের ইউনিট থাকলে রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, খামার পরিদর্শন, বায়োসিকিউরিটি তদারকি এবং খামারিদের কারিগরি সহায়তা অনেক বেশি কার্যকর হবে।
প্রতিটি পৌরসভায় ভেটেরিনারিয়ান নিয়োগ সময়ের দাবি: দেশের পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিম, মাংস এবং অন্যান্য প্রাণিজ খাদ্য বাজারজাত হচ্ছে। কিন্তু এসব এলাকার অধিকাংশ জায়গায় খাদ্য নিরাপত্তা তদারকির জন্য কোনো ভেটেরিনারিয়ান নেই।
একজন ভেটেরিনারিয়ান কেবল প্রাণির চিকিৎসক নন; তিনি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞও। তাই প্রতিটি পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিয়োগ করা প্রয়োজন, যারা বাজার তদারকি, খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, জবাইখানা পরিদর্শন এবং রোগ নজরদারির দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রতিটি বড় বাজারে আধুনিক মুরগি জবাইখানা স্থাপন জরুরি: বাংলাদেশের অধিকাংশ বাজারে এখনো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবন্ত মুরগি জবাই করা হয়। রক্ত, পালক, নাড়িভুঁড়ি ও অন্যান্য বর্জ্য খোলা পরিবেশে ফেলা হয়, যা রোগ বিস্তার ও পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়ায়। জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালায় প্রতিটি পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং বড় বাজারে আধুনিক ভেটেরিনারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পোল্ট্রি স্লটারিং সেন্টার স্থাপনের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা থাকা উচিত ছিল। এটি শুধু জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাই নয়, বরং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ রপ্তানি বাজার তৈরির পূর্বশর্ত।
রোগ নির্ণয় সুবিধা বাড়ানো ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়:
নীতিমালায় রোগ নজরদারির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু রোগ নির্ণয় অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। আজও দেশের অনেক খামারি রোগ নির্ণয়ের জন্য বড় জেলা শহরে নমুনা পাঠাতে বাধ্য হন। এতে সময় নষ্ট হয়, রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং আর্থিক ক্ষতি বাড়ে। প্রতিটি জেলা পর্যায়ে আধুনিক পোল্ট্রি ডায়াগনস্টিক ল্যাব, প্রতিটি বিভাগে রেফারেন্স ল্যাব এবং উপজেলা পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে বার্ড ফ্লু, নিউক্যাসল ডিজিজ, গামবোরো, স্যালমোনেলোসিস এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শুধু কমিটি নয়, প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে বিনিয়োগ:
নীতিমালায় একাধিক জাতীয়, কারিগরি ও মনিটরিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু পোল্ট্রি খাতের উন্নয়ন কেবল কমিটি গঠন করে সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে দক্ষ ভেটেরিনারিয়ান, আধুনিক ল্যাবরেটরি, প্রশিক্ষিত প্যারাভেট, কার্যকর এক্সটেনশন সেবা এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বিনিয়োগ না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা কঠিন হবে।
উপসংহার:
জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬ বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতকে একটি নিরাপদ, আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানি কিংবা বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভেটেরিনারি সেবা, রোগ নির্ণয় অবকাঠামো, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং আধুনিক জবাই ব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ ভেটেরিনারিয়ানবিহীন পোল্ট্রি উন্নয়ন কেবল উৎপাদন বাড়াতে পারে, কিন্তু নিরাপদ খাদ্য, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টেকসই শিল্প গড়ে তুলতে পারে না। জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালার চূড়ান্ত সংস্করণে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হলে তা দেশের খামারি, ভোক্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী হবে।





















