সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হাসপাতালকে ১৬-২৪ ঘণ্টার বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবায় রূপান্তর: সময়ের দাবি

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

ডা. শাহাদাত হোসেন পারভেজ সাংগঠনিক সম্পাদক, ভেটেরিনারি ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ভ্যাব
বাংলাদেশে পোষা প্রাণী (Companion Animals) ও শৌখিন পাখি পালনের সংস্কৃতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। একসময় কুকুর বা বিড়াল পালন সীমিত পরিসরে থাকলেও বর্তমানে শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে জেলা শহরগুলোতেও হাজার হাজার পরিবার পোষা প্রাণী পালন করছে।

পোষা প্রাণী এখন শুধু শখের বিষয় নয়; অনেক পরিবারের কাছে তারা পরিবারেরই একজন সদস্য। ফলে তাদের অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে মালিকরা দ্রুত একটি নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্রের সন্ধান করেন।

এই বাস্তবতায় সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হাসপাতাল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ/ বিশেষায়িত সরকারি প্রাণিচিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন শত শত মানুষ তাদের কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং অন্যান্য পোষ্য নিয়ে এখানে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় সাধারণ মানুষের আস্থা যেমন বেশি, তেমনি তুলনামূলক কম ব্যয়ে মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগও রয়েছে।কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজ সামনে এসেছে-একটি জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত ভেটেরিনারি হাসপাতালের সেবা কি শুধুমাত্র অফিস সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

প্রাণী কখন অসুস্থ হবে, দুর্ঘটনায় পড়বে কিংবা সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছাবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। গভীর রাতে সড়ক দুর্ঘটনা, বিষক্রিয়া, শ্বাসকষ্ট, প্রসবজনিত জটিলতা, মূত্রনালির প্রতিবন্ধকতা, খিঁচুনি, রক্তক্ষরণ কিংবা আকস্মিক হৃদ্যন্ত্র বা শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে একটি প্রাণীর জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমানে অফিস সময় শেষ হওয়ার পর সরকারি পর্যায়ে বিশেষায়িত ভেটেরিনারি চিকিৎসাসেবা কার্যত অনুপস্থিত। ফলে অনেক পোষ্য মালিক ব্যয়বহুল বেসরকারি ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় মূল্যবান প্রাণী হারানোর ঘটনাও ঘটে।
অনেকে মনে করেন, ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা চালু করতে হলে আগে পূর্ণাঙ্গ "ইমারজেন্সি সার্ভিস" ঘোষণা করতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ এমন নয়। ইমারজেন্সি সার্ভিস একটি প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কাঠামো, কিন্তু ১৬ বা ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা একটি সেবা ব্যবস্থাপনার বিষয়। যথাযথ পরিকল্পনা, শিফটভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রয়োজনীয় জনবল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইমারজেন্সি ইউনিট ছাড়াও দীর্ঘ সময় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা সম্ভব। 

ধাপে ধাপে বাস্তবায়নই হতে পারে সর্বোত্তম সমাধান: একসঙ্গে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা চালু করা বাস্তবতার কারণে কিছুটা কঠিন হতে পারে। তাই পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের কৌশল গ্রহণ করা উচিত।

প্রথম ধাপে সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১৬ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা চালু করা যেতে পারে। পরবর্তীতে পর্যাপ্ত জনবল, অবকাঠামো ও অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে ৮ ঘণ্টা করে তিনটি শিফটে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব।

জনবল সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান: প্রশ্ন উঠতে পারে-জনবল কোথা থেকে আসবে? নতুন পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সরকারি ভেটেরিনারি হাসপাতাল, জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর, উপজেলা ভেটেরিনারি হাসপাতাল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি সার্জন, ভেটেরিনারি কম্পাউন্ডার/প্যারাভেট, ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্ট এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মচারীদের সংযুক্তি (Attachment) বা প্রেষণে (Deputation) দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে।

এছাড়া ইন্টার্ন ভেটেরিনারিয়ান, পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী ও  আবাসিক/অনাবাসিক চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ক্লিনিক্যাল কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হলে একদিকে যেমন সেবার পরিধি বাড়বে, অন্যদিকে দক্ষ মানবসম্পদও তৈরি হবে।

কেন একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের দীর্ঘ সময় সেবা প্রয়োজন?
বিশেষায়িত হাসপাতালের কাজ শুধু বহির্বিভাগ পরিচালনা নয়। এটি হওয়া উচিত-
•    জাতীয় রেফারেল হাসপাতাল
•    জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার কেন্দ্র;
•    উন্নত সার্জারি ও অ্যানেস্থেসিয়া সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান;
•    ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের কেন্দ্র;স
•    গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র;
•    প্রাণীকল্যাণ ও জনসেবার মডেল প্রতিষ্ঠান।
যদি একটি জাতীয় বিশেষায়িত হাসপাতাল অফিস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।

প্রস্তাবিত রোডম্যাপ: প্রথম ধাপ (০–৩ মাস):
•    সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১৬ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা।
•    শিফটভিত্তিক চিকিৎসক ও সহায়ক জনবলের ডিউটি।
•    সংযুক্তি/প্রেষণে জনবল নিয়োগ।
•    জরুরি ওষুধ, অক্সিজেন, ল্যাব ও প্রাথমিক সার্জিক্যাল সুবিধা নিশ্চিত করা।

দ্বিতীয় ধাপ (৬–১২ মাস):
•    ৮ ঘণ্টা করে তিন শিফট চালু।
•    ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা।
•    ট্রায়াজ (Triage) ও অবজারভেশন সুবিধা চালু।

তৃতীয় ধাপ (১–৩ বছর):
•    পূর্ণাঙ্গ Veterinary Emergency and Critical Care Unit প্রতিষ্ঠা।
•    ICU, আধুনিক ডায়াগনস্টিক ও উন্নত সার্জারি সুবিধা।
•    হাসপাতালকে জাতীয় Companion Animal Referral, Training and Research Centre-এ উন্নীত করা।
•    স্থায়ী জনবল কাঠামো (Organogram) অনুমোদন ও নতুন পদ সৃষ্টি।

প্রত্যাশিত সুফলঃ এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে-
•    পোষা প্রাণী ও পাখির জন্য সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘ সময় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে।
•    জরুরি অবস্থায় প্রাণহানি কমবে।
•    সাধারণ মানুষের ব্যয় কমবে এবং সরকারি সেবার প্রতি আস্থা বাড়বে।
•    নবীন ভেটেরিনারিয়ানদের উন্নত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
•    গবেষণা ও বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটবে।
•    বাংলাদেশে একটি আধুনিক সরকারি Companion Animal Hospital-এর ভিত্তি তৈরি হবে।

নীতিগত সুপারিশ:
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আমার বিনীত প্রস্তাব-
১. অবিলম্বে সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হাসপাতালে ১৬ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা চালু করা।
২. সংযুক্তি (Attachment) বা প্রেষণে (Deputation) ভেটেরিনারি চিকিৎসক, প্যারাভেট, ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও সহায়ক জনবল নিয়োগ করা।
৩. শিফটভিত্তিক ডিউটি রোস্টার প্রণয়ন করা।
৪. পর্যায়ক্রমে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা চালু করা।
৫. পূর্ণাঙ্গ Veterinary Emergency and Critical Care Unit প্রতিষ্ঠা করা।
৬. হাসপাতালের স্থায়ী অর্গানোগ্রাম অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া।

শেষকথা: একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের মূল্যায়ন শুধু তার ভবন, যন্ত্রপাতি বা নাম দিয়ে হয় না; বরং প্রয়োজনের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দিয়েই তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশ যখন প্রাণিসম্পদ খাতের আধুনিকায়ন, প্রাণীকল্যাণ এবং আন্তর্জাতিক মানের ভেটেরিনারি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হাসপাতালকে ধাপে ধাপে ১৬ থেকে ২৪ ঘণ্টার বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় উন্নীত করা সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং জনকল্যাণমূলক একটি উদ্যোগ।

আজ সিদ্ধান্ত নিলে, আগামী দিনের বাংলাদেশ একটি আধুনিক, কার্যকর ও সর্বক্ষণ সেবাপ্রস্তুত সরকারি ভেটেরিনারি হাসপাতাল পাবে-যা হবে দেশের প্রাণিচিকিৎসা ব্যবস্থার নতুন মাইলফলক।