যে জাপানি অধ্যাপক নীরবে গড়ে তুলছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের একটি প্রজন্ম

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

ড. মো. শরীফুল ইসলাম:
একজন শিক্ষক কতটা বড় হতে পারেন?
একজন শিক্ষক কি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৈরি করেন, নাকি তিনি নীরবে একটি দেশের বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে পারেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেলাম জাপানের শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তোশিনোবু টোকুমোতোর গবেষণাগারে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে।

জাপানকে আমরা সাধারণত প্রযুক্তির দেশ, শৃঙ্খলার দেশ কিংবা মাউন্ট ফুজির দেশ হিসেবে চিনি। কিন্তু এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত অন্য কোথাও—মানুষ গড়ে তোলার সংস্কৃতিতে। আর সেই সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক অধ্যাপক টোকুমোতো।

বিশ্বখ্যাত Tokumoto Laboratory-তে প্রবেশ করতেই দেয়ালে চোখে পড়ল একটি বাক্য “Research is my religion.” মাত্র তিনটি শব্দ। কিন্তু এই তিনটি শব্দ যেন পুরো গবেষণাগারের আত্মাকে ধারণ করে। এখানে গবেষণা কোনো চাকরি নয়; এটি এক ধরনের সাধনা।

কয়েক ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে কাটানোর পর আমার মনে হয়েছে, তাঁর জীবনদর্শন যেন আরেকটি অঘোষিত বাক্যে ধরা যায় “Students are my legacy.” কথাটি ল্যাবের দেয়ালে লেখা নেই; এটি তাঁর কাজ, তাঁর শিক্ষার্থীদের প্রতি নিবেদন এবং তাঁদের সাফল্য দেখে আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি।

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী হওয়া কঠিন। কিন্তু বিশ্বখ্যাত হয়েও বিনয়ী থাকা আরও কঠিন। অধ্যাপক টোকুমোতোর মধ্যে আমি সেই বিরল সমন্বয় দেখেছি। আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই, বাংলাদেশের মৎস্য ও জীববিজ্ঞান গবেষণার ইতিহাসে অধ্যাপক টোকুমোতোর নাম এক নীরব অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। গত কয়েক দশকে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ২৫ জনেরও বেশি বাংলাদেশি গবেষক পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে আরও প্রায় ১০ জন বাংলাদেশি গবেষক তাঁর গবেষণাগারে উচ্চতর গবেষণায় নিয়োজিত। আজ তাঁরা বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (BFRI), সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও গবেষণা নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।তাঁদের গবেষণা, তাঁদের শিক্ষার্থীরা, তাঁদের উদ্ভাবন সবকিছুর মধ্যেই কোথাও না কোথাও ছায়ার মতো জড়িয়ে আছে একজন জাপানি শিক্ষকের অবদান। এটাই একজন শিক্ষকের প্রকৃত উত্তরাধিকার।

যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে, তা তাঁর আন্তরিকতা। তিনি শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ করেননি। নিজের ব্যস্ত সময়সূচির মাঝেও দীর্ঘ সময় ধরে নিজেই পুরো গবেষণাগার ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। প্রতিটি গবেষণা কক্ষ, পরীক্ষাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জেব্রাফিশ গবেষণা ব্যবস্থা এবং চলমান গবেষণার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অত্যন্ত ধৈর্য ও আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, কোনো আনুষ্ঠানিক দূরত্ব ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, একজন শিক্ষক তাঁর জ্ঞান অকৃপণভাবে ভাগ করে নিচ্ছেন। একজন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীর কাছ থেকে এতটা সময়, মনোযোগ ও সম্মান পাওয়া আমার জন্য আজীবনের এক অনুপ্রেরণা।

ল্যাবরেটরি ঘুরে আমার উপলব্ধি হয়েছে গবেষণার মান শুধু উন্নত যন্ত্রপাতিতে নয়; কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস, কঠোর পরিশ্রম এবং একজন দূরদর্শী মেন্টরের নেতৃত্বেই একটি গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। Tokumoto Lab-এ বিভিন্ন দেশের গবেষক একই ছাদের নিচে কাজ করছেন; সেখানে জাতীয়তার চেয়ে বড় পরিচয় গবেষক।

বাংলাদেশ আজ মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। কিন্তু উৎপাদনের এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে আমাদের আরও শক্তিশালী হতে হবে গবেষণায়। আমাদের দরকার আন্তর্জাতিক গবেষণা অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা, বিজ্ঞানী বিনিময় এবং তরুণ গবেষকদের জন্য বিশ্বমানের গবেষণাগারে কাজ করার সুযোগ।

এই সফরে অধ্যাপক টোকুমোতোর সঙ্গে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জলজ প্রাণিস্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমি আশাবাদী, বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (BFRI), সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার (SAC) এবং শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর গবেষণা সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় আমার মনে হচ্ছিল একটি গবেষণাগার শুধু গবেষণাপত্র তৈরি করে না; এটি মানুষ তৈরি করে। আর মানুষই একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে। অধ্যাপক টোকুমোতোর গবেষণাগার বছরের পর বছর ধরে সেই কাজটিই নীরবে করে চলেছে।

বাংলাদেশের অসংখ্য গবেষকের সাফল্যের পেছনে হয়তো তাঁর নাম সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। কিন্তু তাঁদের প্রতিটি অর্জনের মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন। কারণ সত্যিকারের একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি স্বপ্ন দেখান, আত্মবিশ্বাস গড়ে দেন এবং একটি প্রজন্ম তৈরি করেন।

বাংলাদেশ ও জাপানের এই জ্ঞানভিত্তিক সম্পর্ক আগামী দিনে আরও গভীর হোক। আরও বেশি বাংলাদেশি তরুণ গবেষক বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ পাক। কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয় তার জ্ঞান, তার গবেষণা এবং সেই আলো ছড়িয়ে দেওয়া মানুষগুলো। অধ্যাপক ড. তোশিনোবু টোকুমোতো তাঁদেরই একজন।

লেখক:সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার (SAC), ঢাকা, বাংলাদেশ. 
বর্তমানে শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান সফররত