সমীরণ বিশ্বাস:একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার মান, শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ এবং পরিশ্রমের সংস্কৃতির ওপর। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার উপায় নয়; এটি মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, সত্য-মিথ্যা বিচার করার ক্ষমতা দেয়, দায়িত্ববোধ তৈরি করে এবং একটি দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে এমন একটি প্রবণতা চোখে পড়ছে, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন নয়, বরং যেকোনোভাবে পরীক্ষায় পাস করা এবং একটি সনদ অর্জন করা।
বর্তমান প্রজন্মের একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও অসহনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে পারস্পরিক সম্মানবোধ, শালীন ভাষার ব্যবহার, রুচিবোধ এবং সামাজিক আচার-আচরণেও নেতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই মূল্যবোধের অবক্ষয় শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য নয়, একটি দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ সংকেত। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বর্তমান প্রজন্মের একটি অংশ পরিশ্রমের পরিবর্তে সহজ পথ খুঁজছে। তারা কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চায় না, নিয়মিত পড়াশোনায় আগ্রহী নয়, কিন্তু ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করে। কেউ কেউ পরীক্ষায় নকলের সুযোগ খোঁজে, আবার কঠোর নজরদারিকে নিজের অধিকার খর্ব করার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। এই প্রবণতা শুধু শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।
তবে এই বাস্তবতার পাশাপাশি আরেকটি সত্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থীকে একই চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আজও হাজার হাজার শিক্ষার্থী সীমিত সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক সংকট এবং নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও সততার সঙ্গে পড়াশোনা করছে। তারা নিজেদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এই মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরাই আমাদের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।
বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স, বিগ ডাটা, অটোমেশন ও ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে কেবল সনদ দিয়ে চাকরি বা সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়। বর্তমান বিশ্বে প্রয়োজন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সততার সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা। যে শিক্ষার্থী কেবল অটোপাশ বা নকলের ওপর নির্ভর করে বড় হবে, সে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারবে না।
আজকের চাকরির বাজার আগের মতো নেই। সরকারি-বেসরকারি চাকরি, উদ্যোক্তা জীবন কিংবা আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান, সব জায়গাতেই প্রকৃত দক্ষতার মূল্য বাড়ছে। নিয়োগদাতারা এখন শুধু ফলাফল নয়, বাস্তব কাজের সক্ষমতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং শেখার আগ্রহকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে পরীক্ষায় সহজে পাস করলেও বাস্তব জীবনের কঠিন পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
অন্যদিকে, নকল বা অযোগ্যতার সংস্কৃতি সমাজে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যদি একজন অযোগ্য চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা করেন, একজন অদক্ষ প্রকৌশলী সেতু নির্মাণ করেন, একজন দুর্বল শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষা দেন কিংবা একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রশাসক রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাহলে তার ক্ষতির বোঝা পুরো সমাজকে বহন করতে হয়। তাই শিক্ষার মানের সঙ্গে রাষ্ট্রের উন্নয়ন, নাগরিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অটোপাশের বিষয়টি বিশেষ পরিস্থিতিতে কখনো কখনো প্রয়োজন হতে পারে। যেমন, মহামারি, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা এমন কোনো জাতীয় সংকট, যখন স্বাভাবিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয় না। সে ধরনের সিদ্ধান্তকে একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত। কিন্তু যদি এটি নিয়মে পরিণত হয় অথবা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এটিকে অধিকার হিসেবে দাবি করতে শুরু করে, তাহলে শিক্ষার মূল দর্শনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানে পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র, সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারে সন্তানকে শুধু নম্বর পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ঠেলে না দিয়ে শেখার আনন্দ, সততা এবং আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষককে শুধু পাঠদান নয়, নৈতিক নেতৃত্বও দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে নকলের কোনো সুযোগ থাকবে না এবং পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরা যথাযথ সম্মান পাবে।
একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থারও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, কোচিংনির্ভর প্রস্তুতি এবং সৃজনশীল চিন্তার সীমিত সুযোগ অনেক শিক্ষার্থীকে শর্টকাটের দিকে ঠেলে দেয়। তাই শুধু শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা সংস্কার, যেখানে মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বিশ্লেষণী চিন্তা, ব্যবহারিক দক্ষতা, গবেষণামনস্কতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ডিজিটাল যুগে তথ্য পাওয়া সহজ হয়েছে, কিন্তু জ্ঞান অর্জন কঠিন হয়েছে। কয়েক সেকেন্ডে উত্তর পাওয়া গেলেও সেই উত্তরকে বুঝে বাস্তবে প্রয়োগ করার দক্ষতা তৈরি হয় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে মানুষের বিচারবুদ্ধি, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা। এগুলো কোনো শর্টকাটে অর্জন করা সম্ভব নয়।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। সমাজে যখন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষের চেয়ে শর্টকাটে সফল হওয়া মানুষের গল্প বেশি প্রচার পায়, তখন তরুণদের একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়। তাই পরিবার, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে এমন ইতিবাচক উদাহরণ তুলে ধরতে হবে, যেখানে কঠোর পরিশ্রম, সততা ও দক্ষতার মাধ্যমে সফল হওয়া মানুষের গল্প সামনে আসে।
জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা শিক্ষার মান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেছে। তাদের অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল যোগ্য নাগরিক তৈরি করা। বাংলাদেশও যদি একটি জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও উন্নত রাষ্ট্র গড়তে চায়, তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে একই পথে এগোতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কোনো প্রতিযোগিতার নাম নয়; এটি আত্মউন্নয়ন ও জাতি গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। পরীক্ষা তার একটি অংশমাত্র। একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সে কতটা সৎ, দায়িত্বশীল, দক্ষ এবং মানবিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারছে তার ওপর।
সবশেষে আবারও বলা প্রয়োজন, সব শিক্ষার্থীকে এক কাতারে ফেলা অন্যায় হবে। বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণী প্রতিদিন নীরবে সংগ্রাম করছে। কেউ গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে, কেউ নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে, কেউ নানা প্রতিকূলতা জয় করে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের পরিশ্রম, মেধা এবং সততাই বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো তাদের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে পরীক্ষার হলে নকল নয়, মেধার প্রতিযোগিতা হবে; যেখানে অটোপাশ নয়, যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে; যেখানে সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হবে; এবং যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজের পরিশ্রমকে সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করবে।
কারণ অটোপাশ দিয়ে হয়তো একটি সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, কিন্তু যোগ্যতা অর্জন করা যায় না। আর যোগ্যতা ছাড়া ব্যক্তি যেমন এগোতে পারে না, তেমনি কোনো জাতিও টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। তাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে পরিশ্রম হবে গর্বের, সততা হবে শক্তির এবং মেধা হবে সাফল্যের একমাত্র ভিত্তি। সেই সংস্কৃতিই গড়ে তুলবে আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও দায়িত্বশীল একটি নতুন প্রজন্ম, যারা শুধু নিজেদের নয়, পুরো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরও সমৃদ্ধ, শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলবে।
-লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।



