যুবসমাজের অস্থিরতা: মূল্যবোধের অবক্ষয়, নাকি সামাজিকীকরণের ব্যর্থতা?

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

মো. ওয়াকিলুর রহমান:মানুষ পৃথিবীতে একবার জন্মগ্রহণ করেএ কথা জৈবিক অর্থে সত্য। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় মানুষ দ্বিতীয়বারও জন্মগ্রহণ করে। প্রথম জন্মটি ঘটে মায়ের গর্ভ থেকে, আর দ্বিতীয় জন্মটি সম্পন্ন হয় পরিবার, প্রতিবেশ, বিদ্যালয়, বন্ধু, সংস্কৃতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত সামাজিকীকরণ (Socialization) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। প্রথম জন্ম মানুষকে জীবিত করে, অন্যদিকে দ্বিতীয় জন্ম তাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। সামাজিক জীব হিসেবে এই দ্বিতীয় জন্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ইমিল দুর্খেইম (Émile Durkheim)-এর মতে, সমাজ টিকে থাকে কেবল আইন বা শাস্তির মাধ্যমে নয়; বরং সমাজের সদস্যদের মধ্যে ভাগাভাগি করা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক চেতনার মাধ্যমে। তিনি এর নাম দিয়েছেন “Collective Conscience” বা সমষ্টিগত বিবেক। এই সমষ্টিগত বিবেক দুর্বল হয়ে পড়লে সমাজে দেখা দেয় বিভ্রান্তি, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা। তাঁর বিখ্যাত Anomie তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে সমাজের নিয়ন্ত্রণক্ষমতার একটি সুস্পষ্ট স্বরূপ পাওয়া যায়। যখন সমাজ মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন ব্যক্তি নিজের ইচ্ছাকেই একমাত্র সত্য বলে মনে করতে শুরু করে—যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই বিশ্লেষণ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

একটি ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। বিচার শেষ হওয়ার আগেই মানুষ বিচারক হয়ে যায়; তথ্য যাচাইয়ের আগেই মতামত চূড়ান্ত হয়ে যায়; যুক্তি শোনার আগেই ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু হয়। আবার অনেকে ভিউ বাড়ানোর জন্য নেতিবাচক মন্তব্য বা উসকানিমূলক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিজেকে উপস্থাপন করেন। মতের ভিন্নতাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার পরিবর্তে অনেকেই সেটিকে ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে বিবেচনা করেন। এই প্রবণতা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ধীরে ধীরে আমাদের বক্তব্য, বিবৃতি, টকশো, সামাজিক আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং নাগরিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের উৎস কোথায়?

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায়। আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী চার্লস হর্টন কুলি (Charles Horton Cooley) তাঁর Looking-Glass Self তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষ তার নিজের পরিচয় গড়ে তোলে অন্য মানুষের প্রতিক্রিয়া ও মূল্যায়নের মাধ্যমে। অন্যদিকে জর্জ হার্বার্ট মিড (George Herbert Mead) বলেছেন, ব্যক্তি সমাজের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিজের Self বা আত্মপরিচয় নির্মাণ করে। অর্থাৎ, আমরা জন্মগতভাবে সহনশীল, অসহিষ্ণু, দায়িত্বশীল কিংবা আক্রমণাত্মক নই। আমাদের সামাজিক পরিবেশই ধীরে ধীরে এসব বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura) আরও এক ধাপ এগিয়ে দেখিয়েছেন, মানুষ মূলত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শেখে, যাকে তিনি Observational Learning বা পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষা বলেছেন। শিশু যখন পরিবারে অপমানজনক ভাষা শুনে, বিদ্যালয়ে বৈষম্য দেখে, সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার প্রত্যক্ষ করে অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও বিদ্বেষকে জনপ্রিয় হতে দেখে, তখন সে বুঝতে শেখে—এটাই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য আচরণ। ফলে পরবর্তী সময়ে সেই আচরণই সে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমাদের সামাজিকীকরণের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো কি তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করছে?
পরিবার, যা একটি শিশুর প্রথম বিদ্যাপীঠ, সেখানে কি আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য ও সংলাপের সংস্কৃতি চর্চা করছি? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি কেবল পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করছে, নাকি দায়িত্বশীল নাগরিকও গড়ে তুলছে? গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি সত্য, যুক্তি ও মানবিকতাকে উৎসাহিত করছে, নাকি উত্তেজনা ও বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে? রাষ্ট্র ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কি তাঁদের কথাবার্তা ও আচরণের মাধ্যমে ইতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করছেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় কোথাও না কোথাও একটু গলদ রয়েছে। এই গলদের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে তরুণদের একটি অংশের আচরণে। অবশ্যই এটি পুরো যুবসমাজের চিত্র নয়। বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ আজও গবেষণা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা হওয়া, সামাজিক সেবা এবং জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি অংশের মধ্যে তাৎক্ষণিক আবেগপ্রবণতা, অসহিষ্ণুতা, অপমানজনক ভাষার ব্যবহার, গুজবনির্ভর প্রতিক্রিয়া এবং ভিন্নমতকে অস্বীকার করার প্রবণতা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতাকে কেবল প্রজন্মের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিকীকরণ ব্যবস্থারই বহিঃপ্রকাশ।

সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায়, সমাজেই ব্যক্তির আচরণকে শাণিত করে। সেই অর্থে আজকের তরুণদের আচরণ কেবল তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং আমাদের পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, গণমাধ্যম এবং ডিজিটাল পরিবেশের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি।

প্রকৃতপক্ষে বর্তমান ডিজিটাল যুগ সামাজিকীকরণের কাঠামোকেও বদলে দিয়েছে। আগে শিশুর প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবা-মা, স্কুল শিক্ষক ও প্রতিবেশী। এখন সেই জায়গায় যুক্ত হয়েছে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং অ্যালগরিদম। অ্যালগরিদম মানুষের পছন্দ অনুযায়ী একই ধরনের বিষয়বস্তু বারবার দেখায়। ফলে মানুষ ভিন্নমতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কম পায়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় Echo Chamber বা প্রতিধ্বনি-কক্ষ বলা হয়, যেখানে মানুষ কেবল নিজের বিশ্বাসের প্রতিধ্বনিই শুনতে থাকে। এর ফলে সহনশীলতা কমে যায়, মেরুকরণ বাড়ে এবং ভিন্নমতকে শত্রু মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। তাহলে কি এ থেকে উত্তরণের পথ নেই? অবশ্যই আছে। আর সেই পথ হলো সঠিক সামাজিকীকরণ অর্থাৎ মানুষের দ্বিতীয় জন্ম।

পরিবারকে আবার মূল্যবোধের সুতিকাগারে পরিণত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখস্থবিদ্যার পাশাপাশি নাগরিক শিক্ষা, সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking), সহমর্মিতা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার চর্চা জোরদার করতে হবে। গণমাধ্যমকে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে নয় বরং দায়িত্বশীলতার ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে—তাঁদের প্রতিটি আচরণই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নীরব পাঠ্যপুস্তক।

আমাদের বুঝতে হবে, মানুষ কেবল উপদেশ শুনে মানুষ হয় না; মানুষ মানুষকে দেখে প্রকৃত মানুষ হয়। শিশু যা দেখে, তরুণ তা-ই অনুকরণ করে; আর সমাজ তার তরুণদের সামনে যা উপস্থাপন করে, ভবিষ্যতে সেই সমাজই তার প্রতিফলন দেখতে পায়।

তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়তে হলে উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত মানুষের সেই ‘দ্বিতীয় জন্মে’—সামাজিকীকরণে। কারণ একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনার দায়িত্ব পরিবার পালন করতে পারে; কিন্তু তাকে নৈতিক, সহনশীল, যুক্তিবাদী ও মানবিক নাগরিকে পরিণত করার দায়িত্ব পুরো সমাজের। আর সমাজ যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার প্রতিফলন একদিন পুরো জাতিকেই বহন করতে হবে। অন্যথায় আমাদের সেই বহুল প্রচলিত প্রবাদটির সত্যতাই নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে-“সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।”

-লেখক:প্রফেসর, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।