ড. মনিরুল ইসলাম: মধুর বাজারে আজ এক মজার বিপদ দেখা দিয়েছে মধু বেশি তরল হলে সন্দেহ, ঘন হলে সন্দেহ, জমে গেলে ‘চিনি’, আর রঙ গাঢ় হলে ‘ভেজাল’; অর্থাৎ বেচারা খাঁটি মধুর যেন নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার কোনো পথই খোলা নেই! অথচ আন্তর্জাতিক Codex Standard for Honey স্পষ্টভাবে বলে, মধুর রঙ প্রায় বর্ণহীন থেকে গাঢ় বাদামি পর্যন্ত হতে পারে এবং এর অবস্থা তরল, আঠালো, আংশিক স্ফটিকায়িত কিংবা সম্পূর্ণ স্ফটিকায়িত সবই স্বাভাবিক হতে পারে।
মধু মূলত ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজসমৃদ্ধ একটি প্রাকৃতিক অতি-উত্তম দ্রবণ; যে মধুতে গ্লুকোজের অনুপাত বেশি এবং ফ্রুক্টোজের অনুপাত তুলনামূলক কম, সেটি দ্রুত স্ফটিকায়িত (জমাট) হয়। এ কারণেই সরিষা জাতীয় ফুলের মধু শীতকালে দ্রুত দানাদার, ক্রিমের মতো কিংবা সাদাটে জমাট হতে পারে এটি চিনি মেশানোর প্রমাণক নয়, বরং তার স্বাভাবিক রসায়ন। আবার কালোজিরা ফুলের মধু উদ্ভিজ্জ উৎস, খনিজ, ফেনলিক ও অন্যান্য প্রাকৃতিক যৌগের কারণে গাঢ় বাদামি হতে পারে। বাংলাদেশি মধু নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় কালজিরা (Nigella sativa) উৎসের নমুনায় উল্লেখযোগ্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যও পাওয়া গেছে। লিচু ফুলের মধুতে তুলনামূলক বেশি ফ্রুক্টোজসমৃদ্ধ হওয়ায় সাধারণত ধীরে স্ফটিকায়িত (জমাট) হয় এবং দীর্ঘ সময় তরল থাকে। তবে কোনো মধুই ‘কখনো জমবে না’ এমন দাবি বিজ্ঞান সম্মত নয়। কাজেই রঙ, ঘনত্ব বা জমাট বাঁধা ভেজাল হিসেবে প্রমানের একটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ হতে পারে, কিন্তু ভেজালের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না।
তবে দুঃখজনকভাবে, কিছু ক্ষেত্রে কেবল চোখে দেখে মধু জমেছে, রঙ কালচে, কিংবা স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন এমন ধারণার ভিত্তিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মধু জব্দ বা দণ্ডমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনটি ঘটলে তা অন্যায় হওয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে এবং ভোক্তা সুরক্ষার মহৎ উদ্দেশ্যকেও দুর্বল করে। কারণ চোখ সন্দেহ করতে পারে, কিন্তু চোখ পরীক্ষাগার নয়; নাক গন্ধ পেতে পারে, কিন্তু নাক ক্রোমাটোগ্রাফ নয়; আর একটি চামচ দিয়ে নাড়াচাড়া করে moisture content, Hydroxymethylfurfural (HMF), acidity, diastase activity, fructose-glucose profile, sucrose, pollen spectrum কিংবা বহিরাগত সিরাপ শনাক্ত করা যায় না।
বাংলাদেশের আইনও মূলত অনুমানের নয়, প্রমাণের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ ভেজাল পণ্য বিক্রি ও নকল পণ্য উৎপাদনের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রেখেছে এটি ভোক্তার নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি; কিন্তু একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর খাদ্য বিশ্লেষণসংক্রান্ত ধারাগুলো খাদ্য বিশ্লেষক নিয়োগ, নমুনা সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে নমুনাকে চার ভাগে বিভক্ত ও সিলগালা করা, পরীক্ষাগারে পাঠানো এবং নির্ধারিত সময়ে বিশ্লেষণ সনদ দেওয়ার সুস্পষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ধারা ৭-ও অভিযোগ জানানো, ব্যাখ্যা শোনা, স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করা এবং অভিযোগ অস্বীকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি উপযুক্ত আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া নির্দেশ করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮ এবং BSTI-এর BDS 1039:2022 Honey (Second Revision) মধুর মান, নমুনা গ্রহণ ও পরীক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়।
সুতরাং আইনগুলোর সম্মিলিত বার্তা হলো প্রকৃত ভেজালকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু খাঁটি মধুর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে অপরাধের প্রমাণ বানানো যাবে না; জব্দের আগে সন্দেহের কারণ নথিবদ্ধ করা, যথাযথ নমুনা সংগ্রহ, chain of custody রক্ষা এবং স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে মোবাইল কোর্ট দুর্বল হবে না; বরং ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্ত আরও শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও আদালতে টেকসই হবে। এ জন্য মাঠপর্যায়ের অভিযানে খাদ্য নিরাপততা কর্মকর্তা, খাদ্যরসায়নবিদ, মৌচাষ বা apiculture বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী BSTI বা অনুমোদিত পরীক্ষাগারের কারিগরি সহায়তা যুক্ত করা যেতে পারে। দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন থাকলে সন্দেহজনক পণ্যের বিক্রি সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে সিলগালা নমুনা জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষাগারে পাঠানো যায়; কিন্তু পরীক্ষার আগেই জনসমক্ষে ‘ভেজাল’ ঘোষণা করলে পরে নমুনা খাঁটি প্রমাণিত হলেও উদ্যোক্তার সুনাম, মূলধন ও বাজার তিনটিই ফেরত পাওয়া কঠিন। একটি ভুল সংবাদ শোধরানো যায়, কিন্তু গ্রাহকের মনে বসে যাওয়া ‘ভেজাল’ নামক শব্দটি অনেক সময় মধুর স্ফটিকের চেয়েও তিক্ত হয়ে উঠে। বিষয়টি শুধু একজন ব্যবসায়ীর ক্ষতি নয়; মৌচাষ ভিত্তিক গ্রামীণ কর্মসংস্থান, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা, দেশীয় মধু উৎপাদন, আমদানি-নির্ভরতা হ্রাস ও কৃষিতে পরাগায়ন এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
মৌমাছি সরিষা, ফল-সবজি ও বহু উচ্চমূল্যের ফসলের পরাগায়নে ভূমিকা রাখে; ফলে অজ্ঞতাজনিত আতঙ্কে মৌচাষ কমে গেলে মধুর বোতল যেমন খালি হবে, তেমনি কৃষকের ক্ষেতেও ফলন কমার ঝুঁকি বাড়বে। সরকার নিরাপদ খাদ্য, ভোক্তার অধিকার এবং উৎপাদনমুখী গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই লক্ষ্য সফল করতে প্রশাসন, গবেষক, পরীক্ষাগার, মৌচাষি, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সেতুবন্ধন জরুরি।
জনসচেতনতায় সহজ করে বলা দরকার সরিষার মধু জমতে পারে, কালোজিরার মধু গাঢ় হতে পারে, লিচুর মধু দীর্ঘদিন তরল থাকতে পারে; কিন্তু কোনটি খাঁটি আর কোনটি ভেজাল, তার উত্তর বোতলের চেহারায় নয়, মানসম্মত পরীক্ষায়। মোবাইল কোর্ট জনস্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ব্যবস্থা; তাই এর মর্যাদা আরও বাড়বে যখন অভিযান হবে দ্রুত কিন্তু তাড়াহুড়োর নয়, কঠোর কিন্তু অনুমাননির্ভর নয়, এবং দৃশ্যমান কিন্তু বিজ্ঞানবিমুখ নয়। শেষ পর্যন্ত মধুর বিচারেও ন্যায়ের সেই পুরোনো নীতিই প্রযোজ্য সন্দেহ তদন্তের দরজা খুলবে, প্রমাণ সিদ্ধান্ত দেবে। তাই আমাদের জাতীয় নীতি হওয়া উচিত: চোখে দেখে জব্দ নয়, নিয়ম মেনে নমুনা; অনুমানে অপবাদ নয়, পরীক্ষাগারে প্রমাণ; প্রকৃত ভেজালকারীর জন্য কঠোর আইন, আর প্রকৃত মৌচাষির জন্য রাষ্ট্রের আস্থা ও সুরক্ষা।
“চোখ সন্দেহ করবে, আইন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে, আর পরীক্ষাগার সিদ্ধান্তের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেবে।”
লেখকঃ উপপরিচালক, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়া
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষজ্ঞ



