ক্ষুদ্র কৃষকের আয়ের ৮৫ শতাংশই প্রাণিসম্পদ: এখন কি বদলাবে জাতীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার?

তথ্যভিত্তিক ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের নতুন বাস্তবতা ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি একটি জরুরি আহ্বান

ডা. শাহাদাত হোসেন পারভেজঃবাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষি খাত গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় কৃষি বলতে যেখানে প্রধানত ধান, গম, ভুট্টা কিংবা অন্যান্য শস্য উৎপাদনকে বোঝানো হতো, সেখানে আজ গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তবতা ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছে। দেশের ক্ষুদ্র কৃষকের জীবন-জীবিকা, পারিবারিক অর্থনীতি এবং আর্থিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন প্রাণিসম্পদ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের জাতীয় নীতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সরকারি বিনিয়োগে এই বাস্তবতার যথাযথ প্রতিফলন এখনও ঘটেনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) "Survey on Income and Productivity of Small and Large Food Producers 2025" এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনকারীদের ৫৪ শতাংশেরও বেশি ক্ষুদ্র কৃষক। অথচ তাদের গড় বার্ষিক কৃষি আয় মাত্র ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা, যেখানে বৃহৎ কৃষকদের গড় কৃষি আয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা।

তবে এই জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো-একজন ক্ষুদ্র কৃষকের মোট কৃষি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে প্রাণিসম্পদ ও হাঁস-মুরগি পালন থেকে, যার পরিমাণ বছরে গড়ে ২৮ হাজার ৪২১ টাকা। অন্যদিকে অস্থায়ী ফসল যেমন ধান, গম, ভুট্টা, ডাল ও সবজি থেকে আসে মাত্র ৪ হাজার ৫৯১ টাকা। স্থায়ী ফসল যেমন ফলবাগান থেকে আসে ২ হাজার ৩৩১ টাকা। মৎস্য খাত থেকে আয় ১২ হাজার ৬৭০ টাকাএবং বনজ সম্পদ থেকে ১০ হাজার ৮৯২ টাকা।

এই পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে-যখন ক্ষুদ্র কৃষকের প্রধান আয়ের উৎস প্রাণিসম্পদ, তখন এখনও কেন আমাদের কৃষি উন্নয়নের অগ্রাধিকার মূলত শস্য উৎপাদনকে কেন্দ্র করে থাকবে?

বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদকে বহুদিন ধরেই "গরিবের ব্যাংক" বলা হয়। এই অভিধার পেছনে রয়েছে গভীর বাস্তবতা। একজন ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে একটি গাভী, একটি ছাগল কিংবা কয়েকটি হাঁস-মুরগি শুধু উৎপাদনের উপকরণ নয়; এগুলো তার সঞ্চয়, তার বীমা, তার জরুরি তহবিল। সন্তানের লেখাপড়া, পরিবারের চিকিৎসা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো আর্থিক সংকটে প্রথম ভরসা হয়ে ওঠে এই প্রাণিসম্পদই। ফলে প্রাণিসম্পদে বিনিয়োগ মানে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়; এটি গ্রামীণ পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ।

প্রাণিসম্পদ খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস ও মুরগি পালনের প্রধান দায়িত্ব পালন করেন নারীরা। দুগ্ধ উৎপাদন, বাছুর লালন-পালন, ডিম উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র খামার ব্যবস্থাপনায় তাদের অবদান অপরিসীম। তাই প্রাণিসম্পদে প্রতিটি বিনিয়োগ সরাসরি নারীর আয় বৃদ্ধি, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা শক্তিশালী করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।

জাতীয় অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রাণিসম্পদ খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ৪৬৪৬.২৫ লাখ গবাদিপশু ও পোলট্রি রয়েছে। এর মধ্যে ২৫১.৭১ লাখ গরু, ১৫.৩২ লাখ মহিষ, ৩৯.৮১ লাখ ভেড়া, ২৭২.৯১ লাখ ছাগল, ৩৩৬০.৭০ লাখ মুরগি এবং ৭০৫.৮২ লাখ হাঁস রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ খাত বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) ১.৮১ শতাংশ অবদান রাখছে। কৃষি জিডিপিতে এর অংশ ১৬.৫৪ শতাংশ, খাতটির প্রবৃদ্ধি ৩.১৯ শতাংশ এবং চলতি মূল্যে এর অর্থনৈতিক মূল্য ৯১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের ২০ শতাংশ মানুষের প্রত্যক্ষ এবং ৫০ শতাংশ মানুষের আংশিক কর্মসংস্থান এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আজ একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১৫৫.৩৮ লাখ মেট্রিক টন দুধ, ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন মাংস এবং ২,৪৪০.৬৫ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে মাথাপিছু দৈনিক ২৩৯.২৯ মিলিলিটার দুধ, ১৩৭.৯০ গ্রাম মাংস এবং বছরে ১৩৭টি ডিম প্রাপ্যতা রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ জাতীয় চাহিদা অতিক্রম করেছে এবং দুধ উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

এই সাফল্যগুলো প্রমাণ করে যে প্রাণিসম্পদ খাত শুধু কৃষির একটি উপখাত নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো-যে খাত ক্ষুদ্র কৃষকের আয়ের প্রধান উৎস, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ভিত্তি এবং জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, সেই খাত কি তার অবদানের অনুপাতে সরকারি বিনিয়োগ, গবেষণা, জনবল ও নীতিগত অগ্রাধিকার পাচ্ছে?

উত্তরটি অত্যন্ত স্পষ্ট-না।

লেখক: ভেটেরিনারিয়ান,| সাংগঠনিক সম্পাদক, ভেটেরিনারি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (VAB)